চলতি মাসে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৭ খুন, গুলিবিদ্ধ ৫

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রায় ১২ লাখের কাছাকাছি রোহিঙ্গাদের বসতি। হঠাৎ করে এসব ক্যাম্পে অস্থিরতা বিরাজ করছে। প্রতিদিন কোনো না কোনো রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গুলিবিদ্ধ ঘটনা ঘটছে। এতে টার্গেট হচ্ছে রোহিঙ্গা নেতা ও সাধারণ রোহিঙ্গা। রোহিঙ্গারা বলেছেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বানচাল করতে প্রতিদিন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে খুন  হচ্ছে। যার কারণে সাধারণ রোহিঙ্গারা ভয়ে মুখ খুলতে পারছে না। এসব রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের ধরতে চিরুনি অভিযান চালানোর দাবি করেন সাধারণ রোহিঙ্গারা। 

স্থানীয়রা বলছেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রাতের অন্ধকারে কি পরিমাণ অস্ত্র ঢুকছে বোঝা মুশকিল। তা ছাড়া কয়দিন পর পর ক্যাম্পে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। চলিত বছরের চার মাসে রোহিঙ্গা শিবির গুলোতে ১৫ জনের অধিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। নিহতদের বেশির ভাগ মাঝি (নেতা) ও স্বেচ্ছাসেবক। পুরো কক্সবাজারের স্থানীয় বাসিন্দারাও চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। 

উখিয়া ও টেকনাফের ৩২টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তিনটি আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) নিরাপত্তায় নিয়োজিত রয়েছে। তবে স্বল্প সংখ্যক সদস্য নিয়ে ক্যাম্পের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা।

চলিত মাসে পাঁচটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। নিহতরা হলেন- উখিয়ার তাজনিমার খোলা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইয়াসিনের শিশু তাসপ্রিয়া আক্তার (১২), একই ক্যাম্পের মৃত নুর মোহাম্মদের ছেলে রোহিঙ্গা নেতা আনোয়ার (৩৮), সাব মাঝি মৌলভী সৈয়দ কাসিমের ছেলে মো. ইউনুস (২৮), উখিয়ার ১৯ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মৃত জমিল হোসেনের ছেলে সৈয়দ হোসেন (২৩), উখিয়ার বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা মৃত আব্দুল গফুরের ছেলে জসিম উদ্দিন (২৫), উখিয়ার ১৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মোহাম্মদ কাছিমের ছেলে ইয়াছিন (৩৫) ও কেফায়েত উল্লাহর ছেলে আয়াত উল্লাহ (৩০)। 
 
জানা যায়, প্রত্যাবাসন যত বিলম্বিত হচ্ছে, ততই অস্থির হয়ে উঠছে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরগুলো। ক্যাম্প কেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ, মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেও খুনের ঘটনা ঘটছে। রাত নামলেই ভীতিকর পরিবেশ বিরাজ করছে আশ্রয় শিবিরগুলোতে। 

গত বছরের অক্টোবর থেকে চালু হয়েছিল স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে ক্যাম্পে পাহারার ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থাকে অকার্যকর করতে সংশ্লিষ্ট রোহিঙ্গা নেতা ও স্বেচ্ছাসেবীদের টার্গেট করে হামলার ঘটনা ঘটছে বলে মনে করা হচ্ছে। গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর কুতুপালংয়ের পাইন্নাশিয়া শিবিরে খুন হন রোহিঙ্গাদের অন্যতম শীর্ষ নেতা মহিবুল্লাহ। তিনি রোহিঙ্গাদের দেশে প্রত্যাবাসনের পক্ষে জোরালো ভূমিকা রাখছিলেন। 

এরপর ২১ অক্টোবর বালুখালীর ১৮ নম্বর শিবিরের একটি মাদ্রাসায় গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয় ছয়জনকে। এরপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেখানে তৎপরতা বাড়ায়। এসব কারণে গত বছরের অক্টোবর থেকে ক্যাম্পে চালু হয় স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে পাহারার ব্যবস্থা। গত পাঁচ বছরে রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরগুলোতে খুন হয়েছেন অন্তত ১১৯ জন। এই সময়ে খুনসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে প্রায় আড়াই হাজার মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামি হয়েছে ৫ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা। উখিয়ার লম্বাশিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা আবদুর রহিম বলেন ক্যাম্পে রাত হলে ভয় লাগে। সন্ধ্যা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়িতে ঢুকে যায়।

একই ক্যাম্পের স্কুল মাস্টার আয়াস উদ্দিন বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বানচাল করতে এ হত্যাকাণ্ড চালায়। এরা মিয়ানমার সরকার থেকে মাসিক টাকা নেয় বলে জনশ্রুতি আছে। 

এ ব্যাপারে উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, নিজে শঙ্কিত। কখন রোহিঙ্গারা আমাদের ওপর আক্রমণ করে।।

রোহিঙ্গা শিবিরে দায়িত্বপ্রাপ্ত আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ফারুক আহমেদ জানান, অবৈধভাবে টাকা আয়ের জন্য মাদক ব্যবসা, অপহরণ ও আধিপত্য বিস্তারসহ নানা কারণে দুষ্কৃতকারীরা রোহিঙ্গাদের খুন করছে। এ নিয়ে পুলিশ কঠোর রয়েছে এবং নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। এসব অভিযানে বেশ কিছু দুষ্কৃতকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। 

সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে পাঁচ বছরে হত্যা, অপহরণ, মাদক কারবারসহ নানা অপরাধে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ২ হাজার ৪৩৮টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে ৫ হাজার ২২৬ জনকে। 

কক্সবাজার জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের ৩৪টি আশ্রয় শিবিরে বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার বসবাস। সেখানে তাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা ও আধিপত্য নিয়ে খুনের ঘটনা ঘটছে। গত পাঁচ মাসে এখানে ১৯টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এখানকার প্রতিটি হত্যাকাণ্ড খুব গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। ক্যাম্পের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা।