স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের জাতীয় পুষ্টি সেবা (এনএনএস) এবং আইসিডিডিআর,বি যৌথভাবে আজ দ্বিতীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট জরিপ ২০১৯-২০ এর ফলাফল শীর্ষক এক সেমিনার আয়োজন করেছে। ঢাকার গুলশানের লেকশোর হোটেলে আয়োজিত এই সেমিনারে আইসিডিডিআর,বি'র বিজ্ঞানী ড. আলিয়া নাহিদ এই গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন।
মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট বা অনুপুষ্টিকণা হলো ভিটামিন এবং খনিজ উপাদান যেগুলো আমাদের শরীরে স্বল্প মাত্রায় প্রয়োজন হয়। যদিও স্বল্প মাত্রায় প্রয়োজন হয় তথাপি এ অনুপুষ্টিকণাগুলো শরীর গঠনে এবং সুস্থতার ক্ষেত্রে অপরিহার্য উপাদান। অতি ক্ষুদ্র এই ভিটামিন ও খনিজ উপাদানগুলো আমাদের শরীরে প্রয়োজনীয় এনজাইম, হরমোনসহ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপাদানগুলো উৎপাদনে সহায়তা করে থাকে। মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের ঘাটতির কারণে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে বিভিন্ন রকমের পুষ্টির অসামঞ্জস্যতা দেখা যায়। ৫ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশু এবং ১৫-৪৯ বছর বয়সী গর্ভবতী নন অথবা যারা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না এরকম মহিলাদের (নন প্রেগন্যান্ট ও নন ল্যাকটেটিং-এনপিএনএল) ভিটামিন এ, ভিটামিন ডি, জিংক, ফেরিটিন, আয়োডিন এবং অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতা জানার জন্য বাংলাদেশে দ্বিতীয় বারের মতো জাতীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সার্ভে ২০১৯-২০২০ পরিচালনা করা হয়। এ ছাড়াও, এই মহিলাদের ভিটামিন বি১২ এবং ফোলেট ও পরিমাপ করা হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর দৈব চয়নের ভিত্তিতে প্রদত্ত ৮টি বিভাগের ২৫০টি উপজেলায় এই জরিপটি পরিচালনা করে আইসিডিডিআর,বি।
গবেষণার সারসংক্ষেপ
গবেষণায় দেখা গেছে যে, বাংলাদেশে ৫ বছরের কম বয়সী শিশু, গর্ভবতী নন অথবা যারা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না এমন মহিলাদের এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের অভাব রয়েছে।
অনূর্ধ্ব ৫ বছর বয়সী শিশুদের খনিজ পদার্থের ঘাটতির মধ্যে জিংক ৩১%, আয়োডিন ২০% এবং আয়রন ১৫%। আবার ভিটামিনের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, শিশুদের মধ্যে ২২% ভিটামিন ডি এবং ৭% শিশুর মাঝারি মাত্রার ভিটামিন এ এর ঘাটতি ছিল। প্রথম জাতীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সার্ভে ২০১১-১২ এর ফলাফলের সাথে তুলনা করে দেখা যায় যে, শিশুদের তিনটি সূচকের (ভিটামিন এ, ভিটামিন ডি এবং জিংক) জন্য মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের ঘাটতির অবস্থা উন্নত হয়েছে। কিন্তু আয়রনের ঘাটতির মাত্রা পূর্বের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। এই জরিপে প্রথমবারের মতো ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে আয়োডিনের বিষয়টি গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, এতে দেখা গেছে ২০% শিশুদের মধ্যে আয়োডিনের ঘাটতি ছিল।
মহিলাদের (গর্ভবতী নন অথবা যারা বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না) মধ্যে জিংকের ঘাটতির পরিমাণ ৪৩%, ৩০% আয়োডিনের, ২৯% ফোলেটের এবং ১৪% আয়রনের। উদ্বেগজনক বিষয় হলো ৭০% মহিলাদের মধ্যে ভিটামিন ডি এর ঘাটতি পাওয়া গেছে এছাড়া ২০% মহিলার ভিটামিন বি১২ এর অভাব ছিল এবং শুধুমাত্র ৭% মহিলার স্বল্প মাত্রায় ভিটামিন এ এর ঘাটতি পাওয়া যায়। ২০১১-১২ সালে পরিচালিত প্রথম মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট জরিপের সাথে তুলনা করলে দেখা যায় যে, মহিলাদের মধ্যে মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের ঘাটতির অবস্থা তিনটি সূচকে (জিংক, আয়োডিন এবং ভিটামিন এ) উন্নতি হয়েছে, দুইটি সূচকে (আয়রন, ফোলেট) আরো অবনতি হয়েছে এবং দুটি সূচকে (ভিটামিন ডি এবং ভিটামিন বি১২) প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে।
উপরন্তু, বর্তমান জরিপ অনুযায়ী ২১% শিশু এবং ২৯% মহিলাদের (গর্ভবতী নন এবং যারা শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না) বিভিন্ন মাত্রার রক্তস্বল্পতা ছিল।
ডা. মুস্তাফিজুর রহমান, লাইন ডিরেক্টর, জাতীয় পুষ্টি সেবা, সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য রাখেন এবং কভিড-১৯ মহামারির মধ্যে জরিপটি সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য আইসিডিডিআর,বি-র প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি আরো বলেন, মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টে এর ঘাটতির এই ফলাফল শিশু এবং মহিলাদের জন্য জাতীয় পুষ্টি সেবা কর্তৃক পরিচালিত সম্পূরক কর্মসূচি বাস্তবায়নে সহায়তা করবে।
গবেষণার প্রাধান গবেষক ড. আলিয়া নাহিদ বলেন, কভিড-১৯ মহামারির অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট জরিপে আইসিডিডিআর,বি-কে একটি উচ্চমানের পুষ্টি গবেষণা পরিচালনায় সহযোগিতা করে জাতীয় পুষ্টি সেবা একটি প্রশংসনীয় কাজ করেছে। এই গবেষণায় নতুনভাবে বের হয়ে এসেছে যে, বাংলাদেশে শিশু ও মহিলাদের কোন ভিটামিন এবং খনিজগুলো গুরুতর অভাব রয়েছে যা বাংলাদেশে পরবর্তী পঞ্চম হেলথ সেক্টর প্রোগ্রামসহ অন্যান্য পুষ্টি কর্মসূচিগুলো প্রণয়ন করার জন্য নীতিনির্ধারকদের নতুন দিকনির্দেশনা দিবে। তবে, পুষ্টি কর্মসূচি কার্যক্রম অগ্রগতি জানার জন্য গবেষণার মাধ্যমে নিয়মিত মূল্যায়ন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আইসিডিডিআর,বি গবেষণার অবকাঠামো বাংলাদেশের মানুষের সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত প্রমাণ (ইভিডেন্স) তৈরি করার জন্য একটি চমৎকার সুযোগ তৈরি করেছে যা জাতীয় পুষ্টি সেবাকে প্রয়োজনীয় গবেষণার কাজে সহায়তা করবে।
সেমিনারে আইসিডিডিআর,বি-র নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ সরকারের সিদ্ধান্ত এবং সমীক্ষা চালানোর প্রতিশ্রুতির প্রশংসা করেন এবং বলেন, আমি আশাবাদী যে এই সমীক্ষার ফলাফল খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তাহীনতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় কৌশল প্রণয়নে এবং কার্যক্রম গ্রহণে সহায়তা করবে।
সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জনাব সৈয়দ মজিবুল হক, অতিরিক্ত সচিব (জনস্বাস্থ্য উইং), স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। এই গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল বের করার জন্য তিনি জাতীয় পুষ্টি সেবা এবং আইসিডিডিআর,বি-র প্রশংসা করেন। তিনি এই প্রমাণগুলোকে কাজে লাগিয়ে শিশু ও মহিলাদের মধ্যে ভিটামিন এবং খনিজের ঘাটতিগুলো সমাধান করার জন্য বাস্তবভিত্তিক কর্মসূচি নেওয়ার ওপর জোর দেন।
সেমিনারে প্রশ্নোত্তর পর্ব সঞ্চালনা করেন অধ্যাপক ড. শাহ মনির হোসেন, সাবেক মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
অন্যান্যদের মধ্যে জসিম উদ্দিন খান, উপসচিব (জনস্বাস্থ্য), স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়; ড. হাসান শাহরিয়ার কবির, মহাপরিচালক, বাংলাদেশ জাতীয় পুষ্টি কাউন্সিল; অধ্যাপক তাহমিনা বেগম, সভাপতি, বাংলাদেশ নিওনেটাল ফোরাম; অধ্যাপক ড. খালেদা ইসলাম, ডিরেক্টর, ইনস্টিটিউট অব নিউট্রিশন অ্যান্ড ফুড সায়েন্স (আইএনএফএস), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; প্রফেসর ড. এস কে রায়, বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশন, ড. মলয় কান্তি মৃধা, ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়; শাইখা সিরাজ, নিউট্রিশন ইন্টারন্যাশনাল, ডা. ফেরদৌসি বেগম, আইসিএমএইচ মাতুয়াইল; রুদাবা খন্দকার, গেইন ইন্টারন্যাশনাল; ফারিয়া শবনম, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা; আইরীন আক্তার, ইউনিসেফ প্রমুখ সেমিনারে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন।
সেমিনারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা, গবেষক, এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। জাতীয় পুষ্টি সেবার সাথে এই সেমিনারের সহ-আয়োজক ছিল দ্য গ্লোবাল হেলথ নেটওয়ার্ক-এশিয়া।