অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতার অধিকারী শি জিনপিং, কী প্রভাব পড়বে বিশ্বে

চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ২০তম কংগ্রেস শেষে গত ২৩ অক্টোবর শি জিনপিং যখন দলটির সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে তার তৃতীয় মেয়াদের যাত্রা শুরু করার জন্য লাল-গালিচা মঞ্চে উঠেছিলেন তখন তাকে একজন নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী সম্রাটের মতো মনে হচ্ছিল। নিয়ম ভেঙ্গে শি জিনপিং তৃতীয় মেয়াদের জন্য চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সর্বোচ্চ নেতা এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট হলেন। তার বয়সসীমাও পার হয়ে গিয়েছিল। তার জন্য দল এবং রাষ্ট্রের সংবিধানও সংশোধন করা হয়েছে। দলের শীর্ষ সবগুলো পদেই তার কট্টর সমর্থকদের নির্বাচিত করা হয়েছে। ফলে আগের তুলনায় তিনি প্রায় অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতা নিয়ে আবির্ভূত হয়েছেন। এতে চীনের ভবিষ্যতও এখন পুরোপুরি তার হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। মাও সে তুং এর পর তিনি চীনের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নেতা হলেন।

শির দৃষ্টিতে চীন তার ‘জাতীয় পুনরুজ্জীবনের’ স্বপ্ন অর্জন এবং বিশ্বে তার সঠিক স্থান পুনরুদ্ধারের কাছাকাছি চলে এসেছে। তবে সামনের পথটি অনেক চ্যালেঞ্জে পরিপূর্ণ এবং বিপদসংকুল বলেও সতর্ক করেছেন তিনি। সপ্তাহব্যাপী কংগ্রেসের শুরু এবং শেষ উভয় সময়েই তিনি গভীর সতর্কবার্তা দিয়েছেন।

কংগ্রেসে উপস্থাপিত শির ওয়ার্কিং রিপোর্টে বলা হয়েছে, ক্রমবর্ধমান এই চ্যালেঞ্জগুলো এক ‘ভয়ানক এবং জটিল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি’ থেকে উদ্ভূত হয়েছে, যার সঙ্গে রয়েছে ‘চীনকে দমিয়ে রাখার এবং গতিরোধ করার বহিরাগত প্রচেষ্টা’; যা ‘যেকোন সময় তুঙ্গে’ উঠতে পারে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, শির মতে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলার উপায় হল সমস্ত সম্ভাব্য হুমকির বিরুদ্ধে তীব্রভাবে চীনের জাতীয় স্বার্থের প্রতিরক্ষা এবং নিরাপত্তা জোরদার করা।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস) চায়না পাওয়ার প্রজেক্টের পরিচালক বনি লিন বলেছেন, ‘শি সম্ভবত সবকিছু কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন এবং সমস্ত প্রধান পররাষ্ট্র নীতির সিদ্ধান্তে নিজে ব্যক্তিগতভাবে জড়িত থাকবেন। শীর্ষ পদগুলোতে তার অনুগতদের নিয়োগ দেওয়ার ফলে তিনি আরও ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ এবং প্রভাব বিস্তার করার সুযোগও পাবেন’।

সামনের দিনগুলোতে তিনি যা কিছু সিদ্ধান্ত নেবেন এবং যেভাবে নেবেন, তা পুরো বিশ্বের ওপরই গভীর প্রভাব ফেলবে।

 

চীন ও পশ্চিমা বিশ্ব

শি তার আগের দুই মেয়াদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে ভিন্ন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে ক্ষমতায় তার পরবর্তী যুগে পা রাখছেন। যুক্তরাষ্টের সঙ্গে বাণিজ্য ও প্রযুক্তিগত যুদ্ধ, তাইওয়ান নিয়ে বিরোধ, বেইজিংয়ের মানবাধিকার লঙ্ঘনের রেকর্ড এবং ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার নিন্দা না করায় চীন ও পশ্চিমের সম্পর্ক নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে।

শির ওয়ার্কিং রিপোর্টে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ‘আমূল বদলে’ যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া ‘চীনকে ব্ল্যাকমেইল, গতিরোধ, অবরোধ এবং সর্বাধিক চাপ প্রয়োগ করার বহিরাগত প্রচেষ্টা’ সহ এমন সব শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যেসব শব্দ চীনা কূটনীতিকরা প্রায়শই মার্কিন কর্মের নিন্দা করতে ব্যবহার করে থাকেন। ওই ওয়ার্কিং রিপোর্ট মূলত শির পরবর্তী পাঁচ বছরের কর্ম পরিকল্পনা।

‘নো লিমিটস: দ্য ইনসাইড স্টোরি অফ চায়না’স ওয়ার উইথ দ্য ওয়েস্ট’ এর লেখক অ্যান্ড্রু স্মল বলেছেন, ‘শি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন যে, মূলত চীন সুযোগ-সুবিধার সময়কালের পরিবর্তে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এক সংগ্রামের কালে প্রবেশ করেছে’। স্মল জার্মান মার্শাল ফান্ড থিঙ্ক ট্যাঙ্কের একজন সিনিয়র ট্রান্সআটলান্টিক ফেলোও।

স্মল আরও বলেন, সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে এমন এক সময়ে ‘যখন চীন আরও দৃঢ়তা, আরও স্পষ্ট মতাদর্শগত বিরোধ, নিজস্ব পাল্টা জোট গঠন এবং উন্নয়নশীল বিশ্বে চীনের অবস্থানকে সমুন্নত করতে জোরদার প্রচেষ্টা সহ পশ্চিমের সাথে আরও অনেক বেশি খোলাখুলিভাবে পদ্ধতিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হয়েছে’।

এই পরিস্থিতি রাশিয়ার সাথে চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধে নিরপেক্ষ অবস্থান নিলেও রাশিয়ার আগ্রাসনের নিন্দা করেনি চীন এবং যুদ্ধের জন্য পশ্চিমকেই দায়ী করেছে। চীনের এই অবস্থানে পরিবর্তনের সম্ভাবনাও কম।

স্মল বলেন, ‘শি হয়তো ইতিমধ্যেই পশ্চিমের সাথে এবং বিশেষ করে ইউরোপের সাথে চীনের সম্পর্কের আরও অবনতি হলে কী মূল্য দিতে হবে তার হিসাবও করে ফেলেছেন’।

 

তাইওয়ানের জন্য হুমকি

১৬ অক্টোবর কংগ্রেসের উদ্বোধনের দিনই শি তাইওয়ানকে চীনের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে ‘পুনরায় একত্রিত করার’ প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। শি বলেন, চীন ‘শান্তিপূর্ণ পুনঃএকত্রীকরণের জন্য চেষ্টা করবে’। তবে এরপরই বলেন, বেইজিং ‘কখনও শক্তির ব্যবহার ত্যাগ করার প্রতিশ্রুতিও দেবে না।’

শি আরও বলেন, ‘ইতিহাসের চাকা চীনের পুনর্মিলন এবং চীনা জাতির পুনরুজ্জীবনের দিকেই ঘুরছে। আমাদের দেশের সম্পূর্ণ পুনর্মিলন অবশ্যই হতে হবে’। তার এই কথার পর বজ্র করতালিতে ফেটে পড়ে কংগ্রেসে উপস্থিত নেতৃবৃন্দ।

শির আমলে বেইজিং তাইওয়ানের উপর সামরিক চাপ বাড়িয়েছে, যুদ্ধবিমান পাঠিয়েছে এবং দ্বীপের কাছে সামরিক মহড়া পরিচালনা করেছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের প্রতি চীনের স্পষ্ট সমর্থনের পরে তাইওয়ানের জন্য বেইজিংয়ের পরিকল্পনা নিয়েও উদ্বেগ বেড়েছে।

সিএসআইএস-এর বনি লিন বলেছেন, শির ওয়ার্কিং রিপোর্টে তাইওয়ানের প্রতি বেইজিংয়ের নীতিতে কোনও বড় পরিবর্তন দেখা যায়নি। তবে চীনা সেনাবাহিনীতে নেতৃত্বের যে রদবদল করেছেন শি, তা থেকে বোঝা যায় যে, তিনি তাইওয়ানকে চীনের সঙ্গে একীভুত করতে বদ্ধ পরিকর।

তাইওয়ান প্রণালিতে নজরদারির দায়িত্বে থাকা পিপলস লিবারেশন আর্মির ইস্টার্ন থিয়েটার কমান্ডের প্রাক্তন কমান্ডার হি ওয়েইডংকে অপ্রত্যাশিতভাবে সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। অথচ তিনি এর আগে কখনো সেখানে কোনো দায়িত্ব পালন করেননি।

লিন বলেন, ‘এ থেকে বোঝা যায় যে, শি সামরিক সংকট বা সংঘাতের সম্ভাবনাকে খুব গুরুত্ব সহকারে নিচ্ছেন এবং তার সেনাবাহিনী প্রস্তুত কিনা তা নিশ্চিত করতে চান। আমি বিশ্বাস করি না যে, শি এখনই তাইওয়ানের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য শক্তি প্রয়োগ করতে প্রস্তুত, তবে তিনি তা করতে প্রস্তুতির জন্য নানা পদক্ষেপ নিচ্ছেন।’

শির ওয়ার্কিং রিপোর্টে চীনের সেনাবাহিনীকে ‘স্থানীয় যুদ্ধে জয়’ লাভ করতে সক্ষম করে গড়ে তোলার জন্যও একটি রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। যেখানে কীভাবে আরও পারদর্শীতার সঙ্গে নিয়মিত এবং বৈচিত্র্যময় উপায়ে চীনা সামরিক বাহিনীকে মোতায়েন করা যায় সে ব্যাপারে বলা হয়েছে।

অ্যান্ড্রু স্মল বলেন, ‘শি স্পষ্টতই চান যে, চীনের সেনাবাহিনী তাইওয়ানের নিয়ন্ত্রণ দখল করার জন্য যুদ্ধে জয়ী হতে সক্ষম হোক। তাইওয়ানে আক্রমণের ঝুঁকি নেওয়ার মতো কিনা সে ব্যাপারে তার সিদ্ধান্ত যাই হোক না কেন, সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানো সর্বদাই তার শীর্ষ অগ্রাধিকার।’

২০২৪ সালে তাইওয়ানের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সহ আগামী বছরগুলোতে তাইওয়ান প্রণালীতে উত্তেজনা বাড়তে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। তবে ‘এটাও সত্য যে, চীনের সেনাবাহিনী গত কয়েক দশক ধরে গুরুতরভাবে যুদ্ধের ময়দানে পরীক্ষিত হয়নি, এবং তারা কার্যকরভাবে এর জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে পারবে কিনা তা সামনের দিনে একটি ইস্যু হয়ে দাঁড়াবে।’

 

অর্থনীতি

২৩ অক্টোবর তার পার্টির পলিটব্যুরোর স্থায়ী কমিটি ঘোষণা করার পরে এক টেলিভিশন ভাষণে শি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বিশ্বের কাছে চীনের দরজা ‘শুধুমাত্র আরও উম্মুক্ত হবে’ এবং চীনের উন্নয়ন নিজেই ‘বিশ্বের জন্য আরও সুযোগ তৈরি করবে।’

শি বলেন, ‘চীন বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্নভাবে বিকশিত হতে পারবে না এবং বিশ্বেরও তার উন্নয়নের জন্য চীনকে প্রয়োজন।’ অথচ বাস্তবে চীন গত কয়েক দশকের তুলনায় বিশ্ব থেকে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অর্থনৈতিকভাবে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরও শি এখনো জিরো-কোভিড নীতি অব্যাহত রেখেছেন। দেশের সীমান্তগুলো প্রায় বন্ধ এবং শহরগুলোকে নিয়মিতভাবে লকডাউনে রাখা হচ্ছে। তার এই শূন্য কোভিড নীতির কারণে চীনা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা নেমে এসেছে।

শির নানা প্রতিশ্রুতিও বিনিয়োগকারীদের সামান্যতম আশ্বস্ত করতে পেরেছে বলে মনে হয় না। ২৪ অক্টোবর হংকং স্টক মার্কেটে ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর থেকে সবচেয়ে খারাপ দিন ছিল, যেখানে চীনের অনেক বড় বড় কোম্পানি তালিকাভুক্ত রয়েছে। চীনের দুটি শীর্ষস্থানীয় টেক জায়ান্ট আলিবাবা এবং টেনসেন্ট উভয়ের শেয়ারের ১১%-রও বেশি দরপতন হয়েছে। এতে তাদের এক লহমায় ৫৪ বিলিয়ন ডলার লোকসান হয়েছে।

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি কীভাবে এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করে, বিশেষ করে এমন এক মুহুর্তে যখন বিশ্বব্যাপী ব্যাপক অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তার ওপর অনেক কিছুই নির্ভর করছে।

ক্যালিফোর্নিয়া, সান দিয়েগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজাত চীনা রাজনীতি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ভিক্টর শিহ এর মতে, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংহত করার বিষয়ে শি জিনপিংয়ের আপাত আগ্রহ ‘বিদেশি কোম্পানির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার মতো নীতিতে রুপান্তরিত হতে পারে এবং চীনা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগের ওপর নিয়ন্ত্রণের খড়গ নেমে আসতে পারে।’

শি বলেছেন, চীনের ‘আন্তর্জাতিক অবস্থান এবং প্রভাবকে’ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং বৈশ্বিক উন্নয়নে সহায়ক হওয়ার মতো বিষয়গুলোও তার আগামী পাঁচ বছরের প্রধান উদ্দেশ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে। কিন্তু বিশ্ব যেভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ছে তাতে চীন বিশ্বের সঙ্গে তার চলমান মাত্রার অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততার ওপর নির্ভর করে তা করতে পারবে বলে মনে হয় না। এক্ষেত্রে চীনকে আরও উদার হতে হবে। অথচ শি জিনপিং চীনকে দিন দিন আরও বিচ্ছিন্ন করে ফেলছেন।