গান, কবিতা, গল্প, ছড়া, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য-সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় কাজী নজরুল ইসলাম স্বতঃস্ফূর্ত, স্বচ্ছন্দ, নিজস্ব প্রতিভায় ভাস্বর। তবে নজরুলের প্রবন্ধ গল্প বা অন্যান্য কথাসাহিত্যে কাব্যভাব প্রবলরূপে লক্ষনীয়। ব্যতিক্রম দেখা যায় তার শিশুসাহিত্যে। ছোটদের জন্য লেখা নজরুলের ছড়া-কবিতায় প্রথাগত কাব্যবৈশিষ্ট্যের নজরুলের প্রভাব দেখা যায় না। শিশু সাহিত্যেও বৈচিত্র্যময় ও বিরল প্রতিভার অধিকারী কাজী নজরুল ইসলামের নজরুলের অবদান ব্যাপক।
শিশুরা খেয়ালি ও কল্পনাপ্রিয়। শিশু মনকে একান্তভাবে অনুভব করতে না পারলে প্রকৃত শিশুসাহিত্য রচনা সম্ভব নয়, সেই শিশুসাহিত্য শিশুদের আলোড়িতও করতে পারে না। সেসব বিবেচনায় নজরুলের শিশুসাহিত্য এক উজ্জ্বল ব্যক্তিক্রম। নজরুলের শিশুসাহিত্য বাংলা সাহিত্যের এক দুর্লভ সম্পদ। শিশুমনের ভাব ও ভাষা, কল্পনা ও ইচ্ছার প্রতিচ্ছবি মূর্ত হয়ে উঠেছে শিশুসাহিত্যের কোনো কোনো জায়গায় তিনি প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
ঝিঙে ফুল বইয়ে মোট কবিতার সংখ্যা ১৪। ঝিঙে ফুল, খুকি ও কাঠবেরালি, খোকার খুশি, খাঁদু-দাদু, দিদির বে’তে খোকা, মা, খোকার বুদ্ধি, খোকার গপ্্প বলা, চিঠি, প্রভাতী, লিচুচোর, হোঁদল-কুঁৎকুতের বিজ্ঞাপন, ঠ্যাং-ফুলী এবং পিলে-পটকা। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি কবিতা বিভিন্ন সময়ে পাঠ্যবইয়ের অন্তর্ভুক্ত থাকায় অনেকের কাছেই ভীষণ পরিচিত, আদৃত। এসব কবিতায় তিনি শিশুর চোখ দিয়ে দেখেছেন প্রকৃতি, মানুষ, গৃহআশ্রিত পশুপাখি। শিশুর চোখে দেখা সেই প্রকৃতি চমৎকারভাবে বর্ণনা করেছেন প্রভাতী কবিতায়।
‘ভোর হলো দোর খোলো খুকুমণি ওঠরে!
ঐ ডাকে যুঁই শাখে ফুল-খুকী ছোটরে।’
‘ঝিঙে ফুল’ কাব্যগ্রন্থের নামকবিতা কবিতাটিও মিষ্টি একটি কবিতা-
‘ঝিঙে ফুল ঝিঙে ফুল
সবুজপাতার দেশে ফিরোজিয়া
ঝিঙে ফুল ঝিঙে ফুল!’
‘খোকা বুদ্ধি’ কবিতায় তিনি তুলে এনেছেন খোকার অভিমান।
চুন করে মুখ প্রাচীর ’পরে বসে শ্রীযুত খোকা,
কেননা তার মা বলেছেন সে এক নিরেট বোকা।
‘খুকি ও কাঠর্বোলি’ কবিতাটি আমরা সকলেই ছোটবেলায় পড়েছি। এ কবিতায় খুকুর উক্তির মধ্যে শিশু হৃদয়ের কল্পনাবিলাস ও জীবজন্তুর জীবন সম্পর্কে তার অসীম কৌতূহল ও আত্মীয়তাবোধ প্রকাশিত হয়েছে। কবিতার ভাষা ও ছন্দে শিশুসুলভ চপলতা লক্ষণীয়-
‘কাঠবেড়ালি! কাঠবেড়ালি! পেয়ারা তুমি খাও?
গুড়-মুড়ি খাও? দুধ-ভাত খাও?
বাতাবি-নেবু? লাউ?
বেড়াল-বাচ্চা কুকুর ছানা? তাও?’
ঝিঙে ফুল কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি কবিতাই শিশুমনের অনুভূতিকে এভাবেই তুলে ধরে। প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকও শিশুমনের মায়াময় প্রকাশে অভিভূত ও আনন্দিত না হয়ে পারবেন না। সে কারণেই কাব্যগ্রন্থটি ছট-বড় সকলের দারুণ প্রিয়। বইটি যদি তোমার পড়া না থাকে তাহলে আর দেরি করো না, পড়ে ফেলো তোমাদের জন্য লেখা নজরুলের এই অসাধারণ বইটি।
মুহাইমিনুল হক