মিডল অর্ডারদের ভালো করা চাই

বিশ্বকাপ শুরুর আগে দুই দলের ছিল দুই চিত্র। টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশ ওপেনিংয়ে ভালো শুরু পেত কদাচিৎ। মিডল অর্ডারদের কাঁধে ভর করে বোর্ডে কোনো রকমে ১৪০-এর ওপর জমা হতো। স্পিনিং পিচ হলে জয় মিলত অনায়াসে। স্পোর্টিং উইকেটে স্বল্প সংগ্রহের জন্য বৃথা যেত পেসারদের লড়াই। বিপরীতে পাকিস্তান ওপেনারদের ব্যাটেই পেত উড়ন্ত সূচনা। আসত বড় রান, বোলাররাও নির্ভার হয়ে আক্রমণে যেতেন। গত বিশ্বকাপ থেকে পাকিস্তানের অনেক দলের ওপর পরাজয়ের তিলক এঁকে দেন দুই ওপেনার বাবর আজম ও রিজওয়ান। এই বিশ্বকাপ বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের জন্য ব্যাপারটা পাল্টে গেছে।

অন্তত গত দুই ম্যাচে বাংলাদেশের সাফল্যটা এসেছে ওপেন থেকে। জিম্বাবুয়ের সঙ্গে ম্যাচ জেতানো ফিফটি নাজমুল শান্তর। তার ক্যারিয়ার সেরাও। আর ভারতের সঙ্গে রোহিত-কোহলিদের মনে ভয় ধরানোর বিধ্বংসী ব্যাটিং করেন লিটন দাস। ওদিকে পাকিস্তান সবশেষ ম্যাচে দুই মিডল অর্ডারের ব্যাটেই স্বচ্ছন্দ জয় পেয়েছে। তাদের একজন ইফতেখার আহমেদ ভারতের সঙ্গেও কঠিন অবস্থা থেকে দলকে টেনে তোলেন। অথচ সেরা দুই ওপেনার এবার নিশ্চুপ। রিজওয়ান তাও এক ম্যাচে ৪৯ করেছেন, বাবর একেবারেই ফ্লপ। আজ অ্যাডিলেডে দুই দলের গ্রুপ পর্বের শেষ লড়াইয়ে ব্যাটিং অর্ডারের পারফরম্যান্সের এই বৈপরীত্য হার-জিতে বেশ গুরুত্ব রাখবে। যে দল মাঝের ওভার কাজে লাগাবে তারাই জয়ের পথে এগিয়ে থাকবে। তাই ওপেনিংয়ে এগোলেও পাকিস্তানকে হারাতে চাইলে মিডল অর্ডারদের রঙহীন ভাব দূর করতেই হবে বাংলাদেশকে। নয়ত লড়াইয়ে পিছিয়ে যাওয়া নিশ্চিত।

নিউজিল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজে ৪-এ নেমে টানা ফিফটি করেছিলেন সাকিব। ইয়াসির আলি রাব্বি এক ম্যাচে ৪২ করেন ২১ বলে, পাকিস্তানের সঙ্গে ওই ম্যাচে চারে নামা আফিফের থেকেও এসেছিল ২৩ বলে ২৫। ত্রিদেশীয় সিরিজে মিডল অর্ডারে নেমে অন্যান্য ম্যাচে আফিফ ২৬ বলে ২৪, সাকিবের ৪৪ বলে ৭০ ও ৪২ বলে ৬৮ রান দলের স্কোর সমৃদ্ধ করতে দারুণ কাজে দেয়। বিশ্বকাপে নিয়মিত মিডল অর্ডারে নামা ব্যাটারদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো করেছেন আফিফ। চার ম্যাচে তিন ইনিংসে পাঁচে নেমে দুটিতে ৩৭ ও ২৯ এবং একটিতে করেছেন ৩। আর এক ম্যাচে চারে নেমে করেন ৩ রান। তবে সাকিব, রাব্বি ও মোসাদ্দেক ছিলেন ব্যর্থ। সাকিব চার ম্যাচে সর্বোচ্চ করেছেন জিম্বাবুয়ের সঙ্গে ২৩, ভারতের সঙ্গে ১৩ রান বাদে বাকি দুই ম্যাচে ৭ ও ১ রান তার সংগ্রহ। রাব্বি চার ম্যাচের তিনটিতে খেলেছেন। দুই ম্যাচে একটিতে পাঁচে নেমে ১ ও একটিতে ছয়ে নেমে ৩ রান করেন। এক ম্যাচে নেমেছিলেন ৮ নম্বরে। মোসাদ্দেক দুই ম্যাচে ছয়ে নেমে ০ ও ৭ করেন। বাকি দুই ম্যাচে তার দায়িত্ব ছিল লোয়ার অর্ডারে। মিরাজ এক ম্যাচে ছয়ে নেমে করেন ১১।

মিডল অর্ডারদের এমন অবস্থায় শেষ ম্যাচে ভালো করতে একটু ধীরে শুরুর পরামর্শ দিলেন সাবেক ক্রিকেটার আফতাব আহমেদ। ২০০৭ বিশ্বকাপে উইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ জয়ের নায়ক দেশ রূপান্তরকে বলেনÑ ‘দেখেন, কেন উইলিয়ামসন যে আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে ইনিংসটা খেলল, বা আরও যেসব ইনিংস হয়েছে। কেউই প্রথম ১০ বলে বা ১২ বলে ৪০ রান করে নাই। এ রকম খুব কম হয়েছে। বেশিরভাগই শুরু করেছে ১২ বলে ১২, ১৫ বলে ১৮-২০ এ রকম। ২০ বলের পরে গিয়ে দূরত্বটা তৈরি হয়। তখন একটা ব্যাটার সেট হয়, তখন গিয়ে দুটো ছক্কা মারলে দেখেন প্রথম যদি ১৮ বলে ১৮ রানও করেন পরের দুই বলে একটা ৬ ও ৪ মারলে ২০ বলে ২৮ রান হয়ে যায়। তো আপনি যখন সেট হবেন সেটা গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের মিডল অর্ডারদের উচিত হবে ক্রিজে গিয়েই যেন মারতে শুরু না করে। ১৫ বলে ১৫ রান করলেও সেট হয়ে গেলে শেষদিকে ৩০ বলে দেখা যায় ৫০ করে ফেলেছে। তখন ওই রানে দল অনেক উপকার হবে। মিডল অর্ডারে যদি মনে করেন ১০ বলে ২৫ করব এটা শেষ ২-৩ ওভারের কাজ। ফিনিশারদের কাজ। ওটা আমাদের শক্তি না। আমাদের মাঝের ব্যাটারদের একটু সময় নিতে হবে, এরপর ওটা সেট হয়ে কাভার করে দিতে হবে।’

আফতাবের আক্ষেপটা ভারত ম্যাচে হার থেকে। সাবেক এ ক্রিকেটার জানান মিডল অর্ডারে মাত্র একজন ২০ রান করলেই ম্যাচ জেতা যেত, ‘আমি খুব খুশি যে গত ম্যাচে অবশেষে লিটনকে ওপেন করিয়েছে এবং কী দারুণ শুরুটা আমরা পেলাম। এর জন্য কতটা সহজ হয়ে গেছে পরের ব্যাটারদের কাজ। মাত্র একজন দাঁড়িয়ে গেলেই ম্যাচটা জেতা ছিল। চার-পাঁচজন মিডল অর্ডারের একজন যদি ২০-২৫ রান করত তাহলেই টার্গেট কাভার করে ফেলতাম। আমাদের যেহেতু পাওয়ার হিটার নাই এই দিকটা (ইনিংসের শুরু) ব্যবহার করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। লিটনকে গত ম্যাচে ভালো ভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। আশা করি পাকিস্তানের সঙ্গে এই পরিকল্পনা থাকবে।’

টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের মিডল অর্ডার আগেও যে খুব কার্যকর ছিল তা বলা যাবে না। তারা রান করলেও দলীয় স্কোর ১৪০-১৫০ এর ভেতরেই থাকত। তবে শ্রীধরন শ্রীরাম আসার পর ওপেনিংয়ে কিছুটা উন্নতি হয়েছে বাংলাদেশের। এশিয়া কাপ থেকে শুরু করে প্রায় সব ম্যাচেই পাওয়ার প্লেতে ৪০-এর ওপর রান এসেছে। ভারতের সঙ্গে গত ম্যাচে তো বিনা উইকেটে এলো ৬০ রান। ওপেনিংয়ের দুর্বলতা কিছুটা হলেও কেটেছে। এর সঙ্গে মিডল অর্ডারের শক্তি যোগ হলে পাকিস্তান ম্যাচে ভালো কিছু দিয়ে বিশ্বকাপ শেষ করতেই পারে বাংলাদেশ।