কয়েকশ বছর ধরে বোমা হামলার গভীর ক্ষত বয়ে চলেছে তাইওয়ান। এর উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বন্দর শহর কিলুং যুদ্ধের নির্মমতার বড় শিকার। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের চিহ্ন হিসেবে সেখানে রয়েছে কয়েকশ বাংকার। ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমানে তাইওয়ানে চীনা হামলার আশঙ্কা বেড়েছে কয়েক গুণ। নিজেদের জনগণকে রক্ষায় বাংকারগুলোকে বোমা আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলছে তাইওয়ান। লিখেছেন নাসরিন শওকত
চীন-তাইওয়ান দ্বন্দ্ব
তাইওয়ান প্রণালির পূর্বপ্রান্তে অবস্থিত পূর্ব এশিয়ার দ্বীপ দেশ তাইওয়ান। তবে স্বশাসিত গণতান্ত্রিক তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ মনে করে থাকে চীন। কয়েক মাস ধরে তাইওয়ান উপকূলে ও আকাশে সামরিক মহড়া ও বিমান পাহারা বাড়িয়েছে চীন। দ্বীপ দেশ তাইওয়ানের পরাধীন থাকারও দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, সপ্তদশ শতাব্দী থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত নেদারল্যান্ডস, চীন ও জাপান এই তিন দেশ শাসন করেছে তাইওয়ানকে। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সম্মতিতে তাইওয়ানকে পরিচালনা করে আসছে চীন। চীনে মুক্তিবিপ্লবের নেতা মাও সে তুংয়ের নেতৃত্বে ১৯৪৯ সালে চীনে কমিউনিস্ট পার্টির শাসন শুরু হয়। গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠাতার সে সময় মাওয়ের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট আর্মি দেশটির জাতীয়তাবাদী শাসক চিয়াং কাই-শেককে মূল ভূখণ্ড থেকে বিতাড়িত করে। তখন চিয়াং ও তার সরকার পালিয়ে যায় তাইওয়ানে।
এরপর বহু বছর তারা তাইওয়ানে একনায়কতন্ত্রের শাসন বলবৎ রাখেন। এভাবেই তাইওয়ানের রাজনীতিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখেন চিয়াং কাইরা। পরে ২০০০ সালে তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন চেন শুই-বিয়ান । আর তখন থেকেই গণতান্ত্রিক তাইওয়ানের পথচলা শুরু। তাইওয়ানের গণতন্ত্রে ফেরা চীনকে দুশ্চিন্তায় ফেলে দেয়, যা দেশ দুটির দীর্ঘ শান্তিপূর্ণ সম্পর্কে চির ধরায়। তবে ১৯৮০ সালের শুরুতে চীন ‘এক দেশ, দুই ব্যবস্থা’ নামে এক শাসনকাঠামোর প্রস্তাব করে। প্রস্তাবে বলা হয়, চীনের সঙ্গে যুক্ত হলে স্বায়ত্তশাসনের অধিকার পাবে তাইওয়ান। কিন্তু তখন চীনের ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে তাইওয়ান। ২০১৬ সালে সাই ইং-ওয়েনকে প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হিসেবে পায় তাইওয়ান। যিনি ক্ষমতায় বসার পরপরই চীন থেকে পুরোপুরি স্বাধীন হওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। এরপর থেকেই দুই দেশের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ চলছে। বিশ্বের মাত্র ১৫টি রাষ্ট্রের সঙ্গে তাইওয়ানের কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার ছাড়াও জাতিসংঘেরও সদস্যপদ নেই তাইওয়ানের। প্রেসিডেন্ট শি বরাবর তাইওয়ানকে চীনের অংশ করার বিষয়ে জোর দিয়ে আসছেন। সবশেষ চীনের সংশোধিত সংবিধানের ক্ষমতাবলে, প্রেসিডেন্ট শি চিন পিং তাইওয়ানকে চীনের সঙ্গে একীভূত করার ক্ষেত্রে শক্তি প্রয়োগের অধিকার অর্জন করেছেন।
কিলুংয়ের বোমা আশ্রয়কেন্দ্র
তাইওয়ানের উপকূলীয় পার্বত্য বন্দর শহর কিলুং। এই শহরের আঞ্চলিক নাম জিলং। তাইওয়ানের প্রধান এই বন্দর শহরটি রাজধানী তাইপেইয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ১৯৬৪ সালে এই শহরটি প্রথমবারের মতো ডেনিশ বহিঃশত্রু আক্রমণের শিকার হয়। এরপর থেকেই নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয়েছিল পুরো এ অঞ্চলটিকে ।
কিলুংয়ে রয়েছে সকালের নাশতার একটি রেস্তোরাঁ, যার মালিক শি হুই হোয়া। শির রেস্তোরাঁর সাদা দেয়ালের পেছনের অংশে রয়েছে একটি বোমা আশ্রয়কেন্দ্র। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের সময় বোমা হামলা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য যে বাংকারগুলো তৈরি করা হয়েছিল, এই আশ্রয়কেন্দ্র তারই অংশ। কিংলুয়ের বোমা হামলার সাক্ষী এই বাংকারগুলোর বেশিরভাগই রয়েছে নিচের ভূগর্ভের সুড়ঙ্গে, যা বোমা আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে সংস্কার করা হচ্ছে সম্ভাব্য হামলা থেকে বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয় দিতে। পুরনো এই বোমা আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর কোনো কোনোটি দেয়ালচিত্র ও নানা সাজসজ্জায় হয়ে উঠেছে মন্দির নয়তো রেস্তোরাঁ।
বোমা আশ্রয়কেন্দ্রগুলো সম্পর্কে ৫৩ বছর বয়সী শি বলেন, ‘আমরা যারা কিলুংয়ের বাসিন্দা, তারা এ ধরনের জায়গা সম্পর্কে বেশ ভালোভাবেই জানি। এই স্থান যেমন আপনাকে জীবন দেবে, তেমনি আবার জীবন কেড়েও নেবে।’ শির দোকানের মতো কিলুংয়ের অনেক রাস্তায় এমন অসংখ্য বোমা আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে। বেশির ভাগ রেস্তোরাঁর রান্নাঘরগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে সামনে থেকে হামলা চালানো হলে পেছন দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া যায়। রান্নাঘরগুলোর পেছনের দরজা ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ পথের সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে । বেলেপাথরের তৈরি ওই সুড়ঙ্গ দিয়ে সামনে গেলেই একাধিক গলি পাওয়া যাবে। এর শেষ প্রান্তে দেখা মিলবে গেট। মরিচা পড়া ওই গেটগুলো বহন করছে যুদ্ধের নানা স্মৃতি। আবার কখনো কখনো বাদুড়ের আনাগোনার এই গলিগুলোতেই দেখা যাবে আবর্জনার স্তূপ বা রেস্তোরাঁর খাবারের অবশিষ্টাংশ।
৩ লাখ ৬০ হাজার বাসিন্দার শহর কিলুং। তাইওয়ানের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহরের একটি কিলুং। কমপক্ষে ৭০০টি বোমা আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে এ শহরে। সেজন্য নেতৃস্থানীয় কর্মকর্তারা তাইওয়ানের অন্য যেকোনো সুরক্ষিত স্থানের তুলনায় লুকানোর জন্য নিরাপদ স্থান হিসেবে ঘোষণা করেছেন এই শহরটিকে। তাই স্বাধীনভাবে গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক শহর কিলুংয়ের বোমা আশ্রয়কেন্দ্রগুলো শহরটির পরিকল্পনাবিদ, শিল্পী ও ঐতিহ্যপ্রেমীদের কাছে হয়ে উঠেছে শিল্পীর আঁকা ছবির ক্যানভাস। একই সঙ্গে নাগরিক প্রতিরক্ষা ও সৃজনশীল নগর পুনর্বিন্যাসের মডেলে পরিণত হয়েছে।
কারা নির্মাণ করেছে
কিলুং-এর রেস্তোরাঁ বা মন্দির হয়ে ওঠা আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর ভেতরের কারুকাজ ও অনন্য সৌন্দর্য একে স্বর্গের রুপ এনে দিয়েছে। এরই মধ্যে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোকে সংরক্ষণ করা শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ। ভূগর্ভস্থ এই আশ্রয়কেন্দ্রগুলো স্বশাসিত দ্বীপতাইওয়ানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও। প্রাচীন এই বাংকারগুলোর বেশির ভাগেরই নির্মাণ ও ম্যাপ তৈরি করেছে জাপান। ১৯৮৫ সালে দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধ শেষ হয়েছিল। তখন কিলুং ব্যাপক বোমা হামলার শিকার হয়েছিল। এরপর থেকেই তাইওয়ান এই দ্বীপটি শাসন করে আসছে। কেলিংয়ের আশ্রয়কেন্দ্রগুলো পরিচালনা করা সহজ কাজ নয়। এর নির্মাণ কাজ যেমন জটিল, তেমনি সেখানে প্রবেশ করাও বেশ কঠিন। আশ্রয়কেন্দ্রগুলো সম্পর্কিত কিছু নথি খুঁজে পাওয়া গেছে। যেখানে দেখা গেছে, এই বাংকারগুলোকে ১৯ শতকে নির্মাণ করা হয়েছিল। এর বেশ কিছু সুড়ঙ্গ ও বাংকার তাইওয়ানে কিন সাম্রাজ্যের শাসনকালের শেষ সময়ের বলে জানা গেছে। তখন চীন দুর্ভিক্ষ ও বিক্ষোভের কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। এ অঞ্চলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে রীতিমতো সংগ্রাম করছিল তারা।
শির রেস্তোরাঁর আশপাশের আশ্রয়কেন্দ্রগুলো শহরটির সবচেয়ে পুরনো এলাকা দখল করে আছে। পাহাড়ের ঠিক পাশেই নিচে গা-ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে একটি পার্ক। এই পার্ককে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে যুক্ত করেছে একটি লিফট। পার্কের প্রবেশপথগুলোর একটি থেকে কিছুদূর যাওয়ার পরই পথে পড়বে আর একটি গুহা। ওই গুহার ভেতরে হেঁটে সামনে গেলেই পাওয়া যাবে চারদিকে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি সুড়ঙ্গ। সম্প্রতি এই সুড়ঙ্গগুলোকে তাইওয়ানের অগ্নিনির্বাপণ বিভাগ তাদের গুদামঘর হিসেবে ব্যবহার শুরু করেছে।
ঘুমভাঙা এক সকালে এই সুড়ঙ্গে ঢুকে পড়লে মনে হবে কোনো শিল্পীর হাতে আঁকা ছবির সমৃদ্ধ এক গ্যালারি, নয়তো একে মনে হবে আলো-আঁধারীর রহস্যময় কোনো নৈশক্লাব। শিশির ভেজা দেয়ালের গায়ে আলোর-ছটা সবুজ চারাগাছের ওপরে যেন জ¦লছে। এই দৃশ্য দেখলে মনে হবে যেন ভূগর্ভস্থ এই সুড়ঙ্গগুলোতে আলোর ফুলকি ফুটছে। সিমেন্টের মেঝের একপাশ দিয়ে চলে গেছে নর্দমা। কিলুংয়ের নগর-পরিকল্পনা বিভাগে কাজ করেন হু চিহ চিয়েন। ৩৩ বছর বয়সী এই কর্মকর্তা বলেন, শহরের কর্মকর্তারা প্রথমে একটি রেস্তোরাঁ নির্মাণের কথা ভেবে জায়গাটিকে ঠিকঠাক করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এটি করতে গেলে জায়গাটির মূল ভূ-প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতি হতে পারে। এরপরই তারা রেস্তোরাঁ নির্মাণের চিন্তা থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেয়।
ইতিহাসের সাক্ষী
জানা যায়, ১৮৮৪ সালে ফরাসিরা কিলুংয়ে আগ্রাসন চালিয়েছিল। এরপর এক বছর ধরে শহরটি দখল করে রেখেছিল । পরে তাইওয়ানের ইমপিরিয়াল কমিশনার লুই মিং চুয়ান কিলুং শহর থেকে ফরাসি বাহিনীকে বিতাড়িত করে। কিলুং শহরকে বেশি নিরাপদ করে গড়ে তুলতে তিনি দ্রুত শিহসিউলিং পর্বতের ভেতর দিয়ে প্রথম সুড়ঙ্গ রেলপথ নির্মাণের নির্দেশ দেন। তাইপেই থেকে কিলুংকে চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছে শিহসিউলিং পর্বত। এই সুড়ঙ্গটিকে ১৮৯০ সালে প্রথমবারের মতো চালু করা হয়েছিল। বর্তমানে সুড়ঙ্গটিকে সংস্কার করা হচ্ছে। সংস্কারকাজ শেষ হলে কয়েক মাসের মধ্যে সুড়ঙ্গটি আবার চালু করা হবে।
কিলুংয়ের স্থানীয় সরকারের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিভাগের প্রধান কৌ লি ইয়া। কিছুদিন আগে তিনি সুড়ঙ্গটির নির্মাণকাজ পরিদর্শনে যান। এই পুনরুদ্ধার জটিল প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, সুড়ঙ্গটিকে নতুন রূপে ঢেলে সাজাতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সিলিংয়ের শক্তি পরিমাপের জন্য সুড়ঙ্গের ওপর দিয়ে ছোট ছোট ক্যামেরা বসানো হয়েছে। তিনি প্রত্যাশা করেন, সুড়ঙ্গের ওপর দিয়ে দড়ির সাহায্যে টেনে নিয়ে যাওয়া ওই ক্যামেরাগুলোর সঙ্গে স্থানীয় পাহাড়ি ট্রেইল ও রাস্তার সংযোগ ঘটানো সম্ভব । এই কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘আমরা মানুষকে ইতিহাস জানাতে চাই। আরও জানাতে চাই, এই প্রচেষ্টা কীভাবে কিলুংকে সুরক্ষিত করতে সাহায্য করছে।’ কমলা ও গাঢ় বাদামি রঙের পাথর মিশিয়ে নতুন করে সাজানো হয়েছে। সুড়ঙ্গের ইতিহাস নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কৌ জানান, সুড়ঙ্গটি নতুন কোনো হামলা বা সংঘাত থেকে বাসিন্দাদের সুরক্ষা দিতে পারবে।
বোমা আশ্রয়কেন্দ্রের সংরক্ষণ
কিলুংয়ের রেস্তোরাঁ পাফারফিশ। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের এই বোমা আশ্রয়কেন্দ্রটিকে সংস্কার করে রুপ দেয়া হয়েছে এই গুহা রেস্তোরাঁয় । পাফারফিশের মালিক ৩৪ বছর বয়সী মিয়াও হু চিং। কিলুংয়েই বেড়ে উঠেছেন তিনি। ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে চীন তাইওয়ানে আক্রমণ চলাতে পারেএমন জল্পনা বেশ জোরালো হয়েছে। তাই বেশ উদ্বেগের মধ্যেই দিন কাটে কিলুংয়ের বাসিন্দাদের। সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা সম্পর্কে মিয়াও হু বলেন, ‘অনেক মানুষই আমাকে বলেছে যে, যদি যুদ্ধ শুরু হয় তবে তারা আমার রেস্তোরাঁয় আসবে। তারা এ বিষয়ে নিশ্চিত যে, আমরা এখানেও খাবার সরবরাহ করব।’ মিয়াও হু’র মতে, অনেক পরিত্যক্ত বোমা আশ্রয়কেন্দ্র আবর্জনায় ভরা। অযতেœ পড়ে থাকা এই আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর অবহেলা মিয়াওকে বেশ দুঃখী করে । তাই এই আশ্রয়কেন্দ্রগুলো সুরক্ষায় কাজ করছেন তিনি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কিলুংয়ের শিশুরা ভূত, সৈন্যদের হত্যা ও নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের গল্পগুলো দিয়ে একে অন্যকে ভয় দেখিয়ে আসছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুরোর সুরক্ষার ওপর জোর দিয়ে মিয়াও বলেন, ‘এই আশ্রয়কেন্দ্রগুলোকে সংস্কার করে আশপাশের এলাকাগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত করা জরুরি।’ চিত্রশিল্পী ওয়াং চিহ কিলুংয়ের আরেক বাসিন্দা। মিস্টার মিয়াও এর মতো ৫৩ বছর বয়সী শিল্পী ওয়াংও বোমা আশ্রয়কেন্দ্রগুলো সংস্কারের মিশন নিয়েছেন। কয়েক বছর আগে তিনি স্থানীয় ৪০-৫০ জন বাসিন্দাকে সঙ্গে নিয়ে এই অভিযানে নেমে পড়েন।
কিলুংয়ের অনেক পাহাড় রয়েছে। তখন তারা শেওলাযুক্ত চারটি ব্লাস্টপ্রুফ দেয়াল তৈরি করেছিলেন। এমন এক পাহাড়ের কোলঘেঁষে বোমা আশ্রয়কেন্দ্রের সামনে এমন দেয়াল দেখা যায়। কিলুংয়ের বৃষ্টির আবহাওয়া ও লোকবিশ্বাস শিল্পী ওয়াংকে অনুপ্রাণিত করেছে। এই বিশ^াসে অনুপ্রাণিত হয়ে শহরের বিখ্যাত এক মন্দিরের গায়ে তিনি লতাগাছ দিয়ে পৌরাণিক প্রাণীর চিত্রকর্ম এঁকেছেন। সাদা টাইলসের ওপরে আঁকা এই চিত্রকর্মটি শেষ করতে ওয়াংয়ের সময় লেগেছিল ছয় মাস। ওয়াংয়ের মতো শিল্পীদের আঁকা এই দেয়াল ও বাংকারগুলোই পর্যটকদের মূল আকর্ষণ, যা কিলুং শহরের গর্বেরও অংশ।’
কিলুংয়ের রেস্তোরাঁর মালিক শি নতুন প্রজন্মকে ‘স্ট্রবেরি প্রজন্ম’ হিসেবে আখ্যা দেন। এই নতুন প্রজন্মকে চীনের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা সম্পর্কে আরও মনোযোগী হওয়ার ওপর জোর দিয়ে শি বলেন, ‘এই প্রজন্মকে চীনের আগ্রাসন সম্পর্কে সচেতন করার জন্যই মূলত কিলুংয়ের এই আশ্রয়কেন্দ্রগুলো সংস্কার করা প্রয়োজন। যা তাদের লড়াই করতে নয়তো নিরাপদে লুকাতে সাহস জোগাবে।’ ১৯৪০-এর দশকে মার্কিন বোমা হামলার সাক্ষী ওয়াং হুও-হোসিয়াং। ৯১ বছর বয়সী কিলুংয়ের বাসিন্দা হোসিয়াং বলেন, সুড়ঙ্গের এই আশ্রয়কেন্দ্রগুলোই একমাত্র আমাদের নিরাপদ আশ্রয়।’