কিছুদিন আগে দাম বেড়ে বাজার থেকে প্রায় উধাও হয়ে গিয়েছে চিনি। তারপর রাতারাতি খোলা আটার দাম বেড়েছে। এবার সয়াবিন তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি সংকটও দেখা দিয়েছে। এর জন্য খুচরা ব্যবসায়ীরা ডিলারদের দায়ী করছেন। তারা বলছেন, গত এক সপ্তাহ ধরে বাজারে কোনো ধরনের বোতলজাত তেল দিচ্ছেন না ডিলাররা। যা ছিল এর মধ্যে ৫ লিটারের কিছু বোতল ছাড়া বাকি সব বিক্রি হয়ে গেছে। আর ২-৩ দিন বিক্রি করা যাবে এ পরিমাণ তেল তাদের কাছে রয়েছে।
গত ১ নভেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দেয় ভোজ্যতেল পরিশোধন কারখানার মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন।
সংগঠনের চিঠিতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও ডলারের বিপরীতে টাকার অস্বাভাবিক দরপতনের ফলে অ্যাসোসিয়েশনভুক্ত সদস্যরা বোতলজাত প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম ১৯৩ টাকা করার প্রস্তাব করেছে। তাতে বোতলজাত সয়াবিনের বর্তমান বাজারদর ১৭৮ টাকার হিসাবে লিটারপ্রতি দাম বাড়বে ১৫ টাকা। কারখানা মালিকদের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের পর থেকে বাজারে সয়াবিন তেল সরবরাহে ভাটা লক্ষ করা যায়।
গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার দিকে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে গিয়ে অধিকাংশ দোকানে তেল কম দেখা গেছে। অধিকাংশ দোকানেই এক লিটারের বোতল ছিল না। ৫ লিটারের বোতল পাওয়া গেলেও চাহিদার তুলনায় অনেক কম রয়েছে।
কারওয়ান বাজারের খুচরা মুদি দোকানি ইউসুফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, তেলের জন্য ডিলারকে অগ্রিম টাকা দিলেও সরবরাহ করেনি। ডিলারের কাছে জানতে চাইলে তারা বলেন, কোম্পানি তেল দিচ্ছে না আমাদের।
মহাখালী এলাকায়ও একই অবস্থা দেখা গিয়েছে। বোতলজাত ১৭৮ টাকার এক লিটার সয়াবিন তেলের বোতল নেই অধিকাংশ দোকানে। কিছু কিছু দোকানে পাওয়া গেলেও ক্রেতাদের বাড়তি দাম দিয়ে কিনতে হচ্ছে। তবে অধিকাংশ দোকানে ৫ লিটারের বোতল পাওয়া যাচ্ছে।
মহাখালী কাঁচাবাজার এলাকায় নোয়াখালী স্টোরের স্বত্বাধিকারী বেলায়েত দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাজারে ফ্রেশ ও তীর ব্র্যান্ডের ৫ লিটারের কিছু তেলের সরবরাহ থাকলেও এক লিটারের বোতল সরবরাহ বন্ধ রয়েছে গত এক সপ্তাহ ধরে। এক লিটারের বোতল এখনো যারা বিক্রি করছেন সেগুলো তাদের আগের কেনা। আর ৫ লিটারের বোতলজাত তেল যা রয়েছে তা আগামী ২-৩ দিন চলবে।
সয়াবিনের সরবরাহ নিয়ে খুচরা ব্যবসায়ীদের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কারওয়ান বাজারের ফ্রেশ ব্র্যান্ডের ডিলার বিপ্লব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ১ নভেম্বর থেকে সব কোম্পানি তেলের সরবরাহ বন্ধ রেখেছে। অগ্রিম টাকা নিয়ে বসে আছি তাদের থেকে তেল কেনার জন্য, তবে কোম্পানির লোকেরা আমাদের অর্ডার নিচ্ছে না।
এদিকে চিনির বাজারে খবর নিয়ে জানা যায়, এখনো চিনি সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। খোলা চিনি পাওয়া যাচ্ছে। বিক্রি হচ্ছে ১১০ থেকে ১২০ টাকা কেজিদরে। চিনির মতো খোলা আটা পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু দাম বেশি। প্রতি কেজি খোলা আটা বিক্রি হচ্ছে ৬২-৬৫ টাকা করে।
গুলশান-২ এর আনোয়ার স্টোরের স্বত্বাধিকারী রুবেল দেশ রূপান্তরকে বলেন, খোলা চিনি বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না। কিছু প্যাকেটজাত চিনি পাওয়া যেত এখন তাও আর পাওয়া যাচ্ছে না। কিছু বাঁধা কাস্টমারের জন্য অনেক খোঁজাখুঁজি করে মাত্র ৭ কেজি চিনি কিনতে পেরেছি। প্রতি কেজি চিনির দাম পড়েছে ১২৩ টাকা করে।
জনাতে চাইলে টি কে গ্রুপের পরিচালক সাইফুল আতাহার তাসলিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাড়তি দামে অপরিশোধিত সয়াবিন তেল কেনার কারণে আমরা সরকারকে বিষয়টি জানিয়েছি। উনারা বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে দাম নির্ধারণ করবে। তবে ফ্যাক্টরিগুলো গ্যাস ও বিদ্যুৎ ঠিকঠাক না পেলে প্রক্রিয়াজাত করতে কিছুটা সময় লাগবে। এখন দিনের অধিকাংশ সময় ফ্যাক্টরি বন্ধ থাকে। যার ফলে উৎপাদনও অনেক কমেছে। এর একটা প্রভাব বাজারে পড়বে। এর সঙ্গে এলসি না করতে পারারও বড় একটা কারণ রয়েছে। সব মিলিয়ে আটা-চিনি ও তেলের সরবরাহ ঠিক হতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে।
গত রবিবার প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক করেন। তিনি জরুরি পণ্য তথা খাদ্যপণ্য, সার ও জ্বালানি আমদানিতে ঋণপত্র (এলসি) খোলা উন্মুক্ত করার নির্দেশনা দেন। ডলার সংকটের কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা ছাড়া ব্যাংকগুলোকে এলসি খোলা বন্ধ রাখতে বলা হয়েছিল।
এদিকে রাজধানীর বাজারগুলোতে এখনো সবজির দাম কমেনি। আগের মতোই বাড়তি দামে প্রতি কেজি বেগুন বিক্রি হচ্ছে ৫০-৬০ টাকা, টমেটো ১০০-১১০ টাকা, মুলা ৪০ টাকা, লতি ৬০ টাকা, মেটে আলু ৫০-৫৫ টাকা ও করলা ৬০ টাকা দরে।
সবজির দাম অপরিবর্তিত থাকলেও আদা, পেঁয়াজের দাম কিছুটা কমেছে। কেজিপ্রতি ১০ টাকা কমে আদা বিক্রি হচ্ছে ১৮০-১৯০ টাকা ও পেঁয়াজের কেজিতে ২-৩ টাকা কমে ৪৭-৪৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।