আইএমএফের ঋণ অনেকটা সময় কেনার মতো

ড. জাহিদ হোসেন বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ। তিনি দীর্ঘদিন সাউথ এশিয়া ফাইনান্স অ্যান্ড পোভার্টি গ্রুপের মুখ্য অর্থনীতিবিদ হিসেবে কাজ করেন। তিনি প্রায় ১৪ বছর বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় নিয়োজিত ছিলেন। ডলার সংকট, মূল্যস্ফীতি ও অর্থনীতির চাপ সামলাতে আইএমএফ থেকে বাংলাদেশের ঋণ নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন এই অর্থনীতিবিদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সাঈদ জুবেরী

দেশ রূপান্তর : আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সাড়ে তিন বছরে বাংলাদেশকে শর্তসাপেক্ষে ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ দেবে। আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

ড. জাহিদ হোসেন : বর্তমানে আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতি একটা চাপের মধ্যে আছে। চাপটা দুটো জায়গায় বেশি। একটা হলো বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, মানে ডলারের অভাব। বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে, চলতি খাতের অ্যাকাউন্ট ব্যাল্যান্স অব পেমেন্ট ডেফিসিট বেড়ে গিয়েছে। আরেকটা হলো মূল্যস্ফীতি, যদিও গত দু’মাসে সামান্য কমেছে, তারপরেও এটা অনেক বেশি। এই ধরনের চাপের মধ্যে আইএমএফের দ্বারস্থ হওয়া। আমরা যে শ্রীলঙ্কার মতো অবস্থায় পড়েছি, তা না। আমরা খাদে পড়ার আগে, শ্রীলঙ্কা তো খাদের ভেতর থেকে গেছে। তো খাদে পড়ার আগে সংস্কার কর্মসূচির ভিত্তিতে যারা ম্যাক্রো ব্যবস্থাপনায় আর্থিক সহায়তা প্রদান করে থাকে, সেটা আইএমএফ। কাজেই তাদের সঙ্গে ৪২ মাস মেয়াদি একটা কর্মসূচির দিকে যাওয়া, এটা ম্যাক্রো ম্যানেজমেন্টের জন্য সহায়ক হবে বলে আশা করা যায়। আগামী ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে; প্রতি বছরে যদি অন্তত দুটো কিস্তি পাওয়া যায়, তাহলে প্রতি বছর ১০০ কোটি ডলারের মতো একটা অর্থের জোগানের জায়গা এখান থেকে তৈরি হচ্ছে। যদিও আমাদের সার্বিক ব্যালান্স অব পেমেন্টের ঘাটতি অনেক বেশি, সে তুলনায় এটা মোটা কোনো অঙ্ক না। তবে শূন্যের চেয়ে তো ভালো। সেদিক থেকে একটা স্বস্তির জায়গা তৈরি হচ্ছে। 

দেশ রূপান্তর : শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে দেখলাম যে বিভিন্ন ঋণদাতার কিস্তির অর্থ পাওয়া নিয়ে শর্তপূরণ হাওয়া-না হওয়ার কারণে একটা টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছিল। যা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে। সেখানে আমরাও আইএমএফের কিস্তির টাকা পেতে একই সমস্যায় পড়তে পারি কিনা?

ড. জাহিদ হোসেন : শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে চায়না, জাপান থেকে ঋণ পাওয়া নিয়ে এ সমস্যা হয়েছিল। বন্ডেজ ঋণের ক্ষেত্রে হয়েছিল। তো আমাদের ক্ষেত্রে আইএমফের শর্তটা হলো সংস্কারের। এক্ষেত্রে আপনার সমস্যার গোড়ার কারণটা অ্যাড্রেস করতে হবে। আপনি আইএমএফ থেকে যে অর্থটা পাবেন সেটা সাময়িক ক্রাইসিস মোকাবিলা করার জন্য। এটা অনেকটা সময় কেনার মতো। মানে ওই সময়ের মধ্যে আমি গোড়ার সমস্যাগুলোর সমাধান করব, সংস্কারের মাধ্যমে। আমি ধরে নিচ্ছি তর্কের খাতিরে আইএমএফের শর্তগুলো গোড়ার সমস্যাগুলোর সমাধানযোগ্য শর্ত। এটাকেই সংস্কার বলা হচ্ছে। তো এটা যদি আপনি না করেন, তাহলে তো আপনি আসল সমস্যাকে অ্যাড্রেস করলেন না। মানে যে ওষুধটা আপনার খাওয়া দরকার সেটা যদি আপনি না খেয়ে কেবল প্যারাসিটামল খান তাহলে জ¦র কমলেও অসুখ তো সারবে না।

দেশ রূপান্তর : সংস্থাটি জানিয়েছে, কর্মসূচির উদ্দেশ্য বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার এবং দেশের সংহতি, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়নে সহায়তা করা। এ জন্য কাঠামোগত পরিবর্তনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্যে কী কী পড়ছে?

ড. জাহিদ হোসেন : এইখানেই হলো তথ্যের ঘাটতি। কারণ, আমরা জানি না আসলে আইএমএফের এই কর্মসূচিতে কী ধরনের সুনির্দিষ্ট সংস্কারকাজ করতে হবে। এখানে কিছু এরিয়া তারা চিহ্নিত করেছে। প্রেস রিলিজে যেমন বলেছে, রাজস্ব আদায়ে উন্নতি করতে হবে, সরকারি ব্যয় যৌক্তিকরণ করতে হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, মুদ্রানীতি আধুনিকায়ন করতে হবে। অর্থনীতির নাজুক পরিস্থিতি কমাতে আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগ যাতে আসতে পারে সেজন্য পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তারপর জলবায়ু সহিষ্ণুতা আরও বৃদ্ধি করতে হবে। এখন এগুলো সবই তো আকাক্সক্ষা।

দেশ রূপান্তর : এগুলো তো অর্থনীতি সংশ্লিষ্টরা আগে থেকেই বলছেন। বাস্তবায়ন তো দেখা যায়নি।

ড. জাহিদ হোসেন : আইএমএফের কর্মসূচিতে আসলে কী আছে, সেটা পরিষ্কার না। আইএমএফ এসে এনবিআরের সঙ্গে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে মিটিং করেছে। তাদের সঙ্গে সমস্যাগুলো নিয়ে আলাপই হয়েছে, সেখানে তারা পরামর্শও দিয়ে গেছে। কিন্তু পরামর্শগুলোর মধ্যে কী এবং কোনগুলো তাদের তিন বছরের কর্মসূচিতে বাস্তবায়িত হবে, সেটা তো আমরা জানি না। আমরা কেবল জেনারেল কিছু আকাক্সক্ষার কথা জানি। সংবাদ সম্মেলনে যেটা বলেছে, গত চার বছরে বাজেটে অর্থমন্ত্রী যেসব সংস্কারের কথা বলেছেন ওইখান থেকে একটা মানদ- তৈরি করে আইএমএফের কর্মসূচির জন্য আমরা একটা রিফর্ম প্যাকেজ তৈরি করব।  আইএমএফের প্রেস রিলিজে যেসব আকাক্সক্ষার কথা বলা হয়েছে তার সবই প্রতি বছরের বাজেট বক্তৃতায় পাবেন। ওখানেও তো সুর্নিদিষ্ট করে কিছু বলা নেই। প্রতিটি বাজেট বক্তৃতায় সুশাসন এবং সংস্কার বলে একটা চ্যাপ্টার থাকে। ব্যাংকিং সেক্টরে, এনার্জি খাতে, এনবিআরের জন্য, জলবায়ুর জন্য এই এই করব। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ভর্তুকি, সামাজিক সুরক্ষা... মানে অনেক কিছু বলা থাকে; এখানে এটা নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা কী? একটা উদাহরণ দিই, আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করার কথা বলছে। তার মানে কী? মন্দ ঋণের স্বীকৃতির জন্য এখন ১৮০ দিন অপেক্ষা করে। আগে তো এটা ৯০ দিন ছিল, আন্তর্জাতিক মানদ-ও ৯০ দিনের। একটা সুপারিশ ছিল যে এটাকে ১৮০ দিনের পরিবর্তে ৯০ দিনে নিয়ে আসা হোক। এটা তো একটা সুর্নিদিষ্ট পদক্ষেপ। তো এটা কি আইএমএফের সংস্কার কর্মসূচিতে আছে? সেটা তো জানি না। এরকম সুর্নিদিষ্ট কথা না জানলে আপনি, আমি কীভাবে বলব কোনটা ভালো, কোনটা খারাপ বা কোনটা সম্ভব হবে, কোনটা অসম্ভব।

দেশ রূপান্তর : রাজস্ব আয় বাড়ানোর জন্য আইএমএফ পরামর্শ দিয়েছে। সাধারণ ভোক্তাদের ওপর চাপ না দিয়ে রাজস্ব বাড়াতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে?

ড. জাহিদ হোসেন : এখানে তো অনেক লম্বা এজেন্ডা। পলিসির ব্যাপার আছে, অ্যাডমিনিস্ট্রিশনের ব্যাপার আছে। তারপরে সুশাসনের বিষয় আছে। পলিসির ক্ষেত্রে আইএমএফ ৬ মাস আগে নিয়মিত ভিজিটে দুই পৃষ্ঠার একটা নোট দিয়ে গিয়েছিল। সেখানে করের ক্ষেত্রে তারা ভ্যাট রেইটের কথা বলেছিল। বর্তমানে ভ্যাটের চারটা রেইট আছে। তারা বলেছিল এটাকে সরলীকরণ করে একটা রেইটের দিকে যেতে। এখনই যে করতে হবে তা না, কিন্তু সেদিকে যাওয়ার পরিকল্পনা করতে বলেছে। কাস্টমসে, ইনকাম ট্যাক্সে, করপোরেট ট্যাক্সে সব ক্ষেত্রেই তো পলিসি রিফর্মেও প্রয়োজন আছে। আইএমএফের কর্মসূচিতে ট্যাক্স কালেকশন বাড়াতে কোন পলিসি তারা নিচ্ছে, যেটা আগামী ৩ বছরের মধ্যে করা সম্ভব, এটা হয়তো আমরা ফেব্রুয়ারিতে জানতে পারব।  

দেশ রূপান্তর : রিজার্ভের কথা সরকার যেটা বলত, জানা গেল আইএমএফের হিসাবে সেটা অনেক কম। এতে একটা আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

ড. জাহিদ হোসেন : এখানে প্রথম কথা হলো সাদাকে সাদা বলা, কালোকে কালো। ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ কত আছে, হিসাবটা তো আপনাকে ঠিক মতো করতে হবে। এটা তো কারোর ব্যক্তিগত সম্পদ না। এটার প্রকাশটাও স্বচ্ছতার সঙ্গে করতে হবে। আমরা যদি বলি আমার ৩৪ বিলিয়ন ডলার আছে, কিন্তু আসলে তো সেটা নেই। আইএমএফ বলার পর জানা গেল ২৬ বিলিয়ন। সঠিক হিসাব জানা সরকারের উচ্চপর্যায়ের নীতি নির্ধারকদেরও দরকার। খাদ্যমন্ত্রী যদি ভাবেন যে আমার তো ৩৬ বিলিয়ন রিজার্ভ আছে, কাজেই খাদ্য আমদানিতে সমস্যা হবে না। কিন্তু রিজার্ভ তো আছে ২৬ বিলিয়ন। যে টাকা আপনার ক্যাশ ফর্মে নেই, সেটা আপনি কেন বলবেন যে আছে। আপনার এক লাখ টাকা আছে, আমাকে ১০ হাজার দিলেন ধার। এখন যদি জানতে চাই আপনার হাতে কত টাকা আছে, আপনি কি বলবেন যে আপনার কাছে এক লাখ আছে, আপনার কাছে তো আছে ৯০ হাজার। শ্রীলঙ্কাকে ২০ কোটি ডলার ধার দিয়ে সেটাও হিসাবে দেখাচ্ছে যে তার আছে, এটা বলতে পারেন, কিন্তু সেটা তো সঠিক না।

দেশ রূপান্তর : অনেকে বলছেন ব্যাংকে টাকা রাখলে তা ফেরত পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ রয়েছে। পরিস্থিতি কি এতটাই খারাপ? ‘ব্যাংক রান’-এর সম্ভাবনা দেখছেন কি?

ড. জাহিদ হোসেন : বাংলাদেশের অবস্থা ওই পর্যায়ে গেছে বা যেতে পারে বলে আমার মনে হয় না। তার মানে এই না যে আপনার সমস্যা নেই। আসলে ব্যাংকের ব্যালেন্স শিটের দুর্বলতার মাত্রা কতটুকু সেটা জানার জন্য আপনার দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদের হিসাবটা ঠিক মতো করতে হবে। ছয় মাস আগের আইএমএফের যে ভিজিটের কথা বললাম, তখন তারা এটাও বলেছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক ফাইনান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটির যে রিপোর্ট করে সেটাতে আগে দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদের একটা সংখ্যা দিত। ২০১৮ সালের পর থেকে এটা আর দেওয়া হয় না। তাদের পরামর্শ ছিল, এই সংখ্যাটা সঠিকভাবে ক্যালকুলেট করা হোক এবং রিপোর্টে সেটা উল্লেখ করা হোক। তাহলেই তো আপনি যে প্রশ্নটা করেছেন, যে কোন ব্যাংকে টাকা রাখলে সেটা পেতে সমস্যা হবে জানা যেত। সব ব্যাংক তো খারাপ না। তথ্যের অস্বচ্ছতা থাকলে, বিভ্রান্তিমূলক তথ্য থাকলে গুজবের জায়গা তৈরি হবে। স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশ করা হলে গুজবের সুযোগ থাকবে না।

দেশ রূপান্তর : দেশের ব্যাংক খাতে সুশাসনের অভাবে বিশেষ সুবিধায় অনেকেই ঋণ নিয়ে ফেরত দিচ্ছেন না। পর্ষদ সদস্যরা প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন সময় ঋণ অনুমোদন করাচ্ছেন। সমঝোতার ভিত্তিতে এক ব্যাংকের পরিচালক অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছেন। ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদের সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছে আইএমএফ। আপনার অভিমত কী?

ড. জাহিদ হোসেন : ব্যাংকের বোর্ডে যে পরিচালক নিয়োগ করা হয় সেখানে আমাদের ব্যাংকিং কোম্পানি আইনেই একটা প্রপার ক্রাইটেরিয়া বলে দেওয়া আছে। কোন ধরনের লোক, কোন ধরনের অভিজ্ঞতা, অ্যাকাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড, তার ব্যবসায়িক সম্পর্ক বিবেচনায় এনেই তো আপনাকে নিয়োগ দিতে হবে। যাতে স্বার্থের সংঘাত তৈরি না হয়। অযোগ্য লোক যেন ওখানে না বসে। এটা রাষ্ট্রায়ত্ত এবং প্রাইভেট সব ব্যাংকের জন্য একটা কনসার্ন। এখানে আইএমএফ সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছে। আমরা মনে করি এই পরামর্শ বা প্রস্তাব আমাদের আর্থিক খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, এটা কর্মসূচিতে আছে কি না সেটা দেখতে হবে। আপনি একজন ঋণদাতা, এখন আপনি আমাকে বললেন আপনার পর্ষদটা ঠিক করেন, কিন্তু আপনাকে আমি ঋণ যে কোনো অবস্থাতেই দেব, পর্ষদ ঠিক করেন বা না করেন। আমি কী করব? আপনি ঋণটা নিলেন কিন্তু পর্ষদ ঠিক করলেন না, তাহলে কী হবে? এখানে আইএমএফের সিরিয়াসনেসটা আরও বিশ^াসযোগ্য হবে যদি পরামর্শ ও প্রস্তাবগুলো কর্মসূচির ভেতরে থাকে।