আজ কাল আগামীর গল্প

লেখক দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় বৈজ্ঞানিক দৃৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে রেখে সহজ সরল কথায় গল্পের ছলে মানুষের বিবর্তনের পথপরিক্রমার কথা বলেছেন তার ‘যে গল্পের শেষ নেই’ বইয়ে। এখানে সহজ সুন্দর সাবলীল বর্ণনায় উঠে এসেছে ধর্ম, দর্শন, রাজনীতি, সমাজ পরিবর্তনের নানা দিক। এ বইটিতে লেখক এমন অনেক তত্ত্ব, তথ্য এবং উপাত্ত দিয়েছেন যা যেমন চমকপ্রদ তেমনি ভালোলাগায় পরিপূর্ণ। এই বইয়ে প্রথম দিকে মানুষের নিজের সঙ্গে নিজের লড়াই, ক্রমে পৃথিবী, প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই, পরে মানুষে-মানুষে লড়াই দেখা যায়। একটি অল্প বয়সী কিশোরী রুণুর (লেখকের ভাইঝি যে সব কিশোর-কিশোরীর প্রতিনিধিরূপে উপস্থিত হয়েছে) সঙ্গে লেখকের কথোপকথনের মাধ্যমে পৃথিবীর ৪৫০ কোটি বছর আগে শূন্যে গ্রহ, নক্ষত্রের সৃষ্টি, পৃথিবীর শুরুর অবস্থা, পর্যায়ক্রমে ১০০ বছর পর প্রাণের অস্তিত্ব, ক্ষুদ্র জীব থেকে বৃহৎ ডাইনোসরের সৃষ্টি ও বিলোপ, জলের মাছ থেকে গাছের প্রাণী হওয়া, তারপর মাটিতে অবতরণ, নিজের প্রয়োজনে হাতের ব্যবহার শুরু এবং প্রাণিজগতে শ্রেষ্ঠরূপে আবির্ভূত হওয়া সবই উঠে এসেছে। হাত মানুষকে মানুষ হতে সহায়তা করেছে এবং আত্মরক্ষা করতে সাহায্য করেছে অন্য প্রাণী থেকে। হাতই হাতিয়ার আর হাতিয়ারই মানুষের বুদ্ধির সঙ্গে যুক্ত হয়ে মানুষকে করেছে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ প্রাণী।

এরপরে দেখানো হয়েছে মানুষের পৃথিবীকে জয় করার অভিযান। মানুষ কীভাবে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে আবার বিজয়ী অভিযাত্রীর মতো নিজেকে জয় করে ফিরছে। এ জয়ের পরিক্রমায় মানুষ নিজেকে ছেলেমানুষ থেকে পরিপূর্ণ মানুষ রূপ দিচ্ছে। যা মানুষের মানুষ হয়ে ওঠার গল্প।

শেষ দিকের গল্প সভ্যতার গল্প। পরিপূর্ণ মানুষের ভাঙাগড়ার গল্প। মানুষ মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে মানুষের,  এই অবস্থান তাকে অন্য জটিলতায় পৌঁছে দিয়েছে। মানুষই এখন মানুষের প্রতিবন্ধক আরও উন্নত মানুষ হওয়ার অভিযাত্রায়। এ পর্যায়ে ধর্ম, রাজনীতি, ব্যবসা, সম্পদ মানুষের সামনে বড় হয়ে ওঠে। এসব কিছু কীভাবে সৃষ্টি হলো ও কীভাবে মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তার লাভ করতে থাকে তা সহজ উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়েছেন লেখক।

সভ্যতা বদলাতে থাকে মানুষের কর্তৃত্বে ভর করে মিসর থেকে ব্যাবিলন, সিন্ধু, চীন, গ্রিস হয়ে এখনকার মারণাস্ত্রের সভ্যতায়। এই যাত্রা কি মানুষকে নিয়ে চলেছে বিলুপ্তির পথে? সেটাই আজ বড় প্রশ্ন! মানুষই আজ কি মানুষের শত্রু! মানুষ-মানুষকে শোষণ করছে, করছে নির্যাতন, করছেন শ্রেণীবিভেদ যা মর্মাহত করে আমাদের মনকে, বিবেককে। ‘যে গল্পের শেষ নেই’ বইটি গল্প বলার ছলে সৃষ্টির শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত চলমান ঘটনার সরলতম ব্যাখ্যা হাজির করেছে আমাদের সামনে। তুমি যদি মানুষকে, সময়কে, পৃথিবীকে এবং এ পরিক্রমার ইতিহাসকে জানতে চাও তাহলে এই বইটি অবশ্যই পড়া উচিত তোমার।