পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান তার আন্দোলনকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার নায়ক ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আন্দোলনের সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, পাকিস্তানে এখন ফের ১৯৭১ সালের মতো পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং তার সঙ্গেও বঙ্গবন্ধুর মতোই অন্যায় করা হচ্ছে। আগাম নির্বাচনের দাবিতে রাজধানী ইসলামাবাদ অভিমুখে তার দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) এর লং মার্চের পঞ্চম দিনে গত ১ নভেম্বর পাঞ্জাবের গুজরানওয়ালাতে এক পথসভায় ইমরান খান এ কথা বলেন। নিজের দল পিটিআইকে তৎকালীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে তুলনা করে ইমরান খান বলেন, ‘গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হওয়ার পরও একটি রাজনৈতিক দলকে দেশ শাসনের সুযোগ না দেওয়ায় ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভেঙে গিয়েছিল। সবাই জানে শেখ মুজিবুর রহমান ও তার দল ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করেছিল। কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তর করার পরিবর্তে চতুর রাজনীতিবিদ জুলফিকার আলী ভুট্টো সেনাবাহিনীকে তৎকালীন পাকিস্তানের বৃহত্তম জনপ্রিয় দল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেয় এবং সংঘর্ষের পথে নিয়ে যায়। বর্তমানে নওয়াজ শরিফ এবং আসিফ আলি জারদারিও একই কাজ করছেন। তারাও পিটিআইয়ের ক্ষমতায় যাওয়া ঠেকাতে ষড়যন্ত্র করছেন।’
ওই মন্তব্যের দুদিন পরই (৩ নভেম্বর) ইমরান খানের ওপর বন্দুক হামলার ঘটনা ঘটে। হামলার পরদিন (৪ নভেম্বর) লাহোরের শওকত খানম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ফের বাংলাদেশের প্রসঙ্গ টেনে ইমরান খান বলেন, ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তান (বর্তমান পাকিস্তান) অন্যায়-অবিচার করেছিল। আর এজন্যই পূর্ব পাকিস্তান আলাদা হয়ে গিয়েছিল। তারা আমাদের ছেড়ে যেতে চায়নি, কিন্তু আমরা নৃশংসতা করেছি, যে কারণে তারা আমাদের ঘৃণা করতে বাধ্য হয়েছে। ইমরান বলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানে কী হয়েছিল? যে দল নির্বাচনে জিতেছিল সামরিক বাহিনী তার বিরুদ্ধে চলে গিয়েছিল এবং তাদের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল। আপনারাও (বর্তমান পাকিস্তানি সেনাবাহিনী) এখন একই কাজ করছেন। বৃহত্তম রাজনৈতিক দলকে বশীভূত করার এবং এর নেতাকে হত্যার চেষ্টা করছেন।’
ইমরান খানের এসব কথার মধ্য দিয়ে এই প্রথম পাকিস্তানের কোনো শীর্ষ রাজনীতিবিদ এবং রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা ব্যক্তি পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানিদের অন্যায়-অবিচারের বিষয়টি স্বীকার করে নিলেন। ফলে ইমরান খানের এই কথাগুলোর ঐতিহাসিক মূল্য অনেক। যদিও তিনি রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা অবস্থায় আনুষ্ঠানিকভাবে এসব কথা বলেননি।
যাইহোক, বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধুর প্রসঙ্গ টেনে ইমরান খান মূলত পাকিস্তানে ফের একটি বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছেন। তার মতে, এই রাজনৈতিক পরিবর্তন অনিবার্য, এবার তা শান্তিপূর্ণ উপায়ে হোক বা বিশৃঙ্খলার মাধ্যমেই হোক। ১৯৭৯ সালের ইরানের ইসলামি বিপ্লব এবং চলতি বছরে শ্রীলঙ্কার গণবিক্ষোভের উল্লেখ করেও ইমরান খান সেনাবাহিনীকে বলেন, ‘এই জাগ্রত জনসাধারণের কাছে মাত্র দুটি বিকল্প আছে শান্তিপূর্ণ বা রক্তাক্ত বিপ্লব। তৃতীয় কোনো উপায় নেই। আমি দেখেছি দেশ জেগে উঠেছে। এখন সিদ্ধান্ত নিন যে, আমরা ব্যালট বাক্সের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ উপায়ে পরিবর্তন আনব, নাকি ইরান ও শ্রীলঙ্কার মতো সংঘাতের মাধ্যমে।’
যুক্তরাষ্ট্রের উড্রো উইলসন সেন্টারের এশিয়া প্রোগ্রামের ডেপুটি ডিরেক্টর মাইকেল কুগেলম্যান বলেছেন, ‘পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি গত কয়েক মাস ধরে বারুদের স্তূপের ওপরে দাঁড়িয়ে আছে। ইমরান খানের ওপর বন্দুক হামলার পর তাতে বড় বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।’
ইমরান খান তার ক্ষমতা হারানোর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রকেও দায়ী করেছেন। চলতি বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি ইমরান খান রাশিয়ায় গিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে দেখা করতে। এর একদিন পরই রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা শুরু করেছিল। রাশিয়া সফরের পরই তার দলের কমবেশি ৩০ জন এমপি ইমরান খানের বিরুদ্ধে চলে যায়। এরপর বিরোধী দলগুলো তার বিরুদ্ধে সংসদে অনাস্থা প্রস্তাব আনে। রাশিয়া সফরের পরপরই এমনটা ঘটায় ইমরান খান এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ করেন। তবে, ইমরান খানের ওপর হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের সব পক্ষকে সহিংসতা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু ইতিমধ্যেই ইমরান খানের দলের শীর্ষ নেতাদের ধরপাকড় শুরু হয়ে গিয়েছিল। ইমরান খানের বিরুদ্ধেও বিচারক এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ আনা হয়েছে। এরপর ইমরান খানের ওপর বন্দুক হামলাও হলো। এই হামলার সঙ্গেও সেনাবাহিনীর সংশ্লিষ্টতা আছে বলে অভিযোগ করেছেন ইমরান খান।
ওদিকে, পাকিস্তানের অর্থনীতি চূড়ান্তভাবে বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। দেশটিতে মূল্যস্ফীতি ইতিমধ্যেই অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ২৬ শতাংশে পৌঁছেছে। এর আগে বন্যায় দেশের এক-তৃতীয়াংশ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় প্রায় ২ হাজার মানুষের মৃত্যু এবং ৪০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়। কুগেলম্যান বলেন, ‘আশ্চর্যের বিষয় হলো ভয়াবহ বন্যার পর মানবিক বিপর্যয় এবং অর্থনৈতিক সংকট চরমে ওঠার পরও ক্ষমতাসীনরা প্রতিশোধমূলক রাজনীতি করছে এবং ইমরান খান ও তার সমর্থকদের টার্গেট করা অব্যাহত রেখেছে।’ ফলে পরিস্থিতি আর শান্তিপূর্ণ থাকবে না। কারণ ইমরান খানের জনপ্রিয়তাও বেড়েই চলেছে। বর্তমানে দেশটির মধ্যবিত্তদের ৪৪ শতাংশ মানুষ ইমরান খানের ভক্ত।
অন্যদিকে, সেনাবাহিনীও ঘোষণা দিয়েছে, রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিলে তারা ক্ষমতাসীন সরকারকেই সহায়তা করবে। এখন প্রশ্ন হলো, যদি ইমরান খানের সমর্থকরা সরকারের পতন ঘটাতে রাস্তায় নেমে আসে এবং রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতা শুরু হয় তখন কি সেনাবাহিনী জনগণের ওপর গুলি চালাবে? যদি তেমনটিই ঘটে তাহলে বলা চলে যে, ১৯৭১ সালের চেয়েও ভয়াবহ পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে পাকিস্তানের জন্য।
ইমরান খানের রাজনীতি পাকিস্তানের ব্যর্থ অর্থনীতি এবং বিশৃঙ্খল রাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকে উদ্ভূত সংকটের মোকাবিলা করতে চাইছে এবং বিদ্যমান সমাজের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনতে প্রয়োজনীয় পূর্বশর্তগুলোর জন্মের চিহ্নস্বরূপ। এই পরিস্থিতি খুব সহজেই রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের দিকে মোড় নিতে পারে। সাধারণত, এই ধরনের পরিস্থিতি বিপ্লব বা প্রতিবিপ্লবের পূর্বাভাস, যা বৃহত্তর জনসাধারণের কর্তাসত্তামূলক চেতনার জাগরণের ওপর নির্ভর করে। ইমরান খান সেই চেতনা জাগিয়ে তুলতে পেরেছেন।
পাকিস্তানের ইতিহাসে ইমরান খানের রাজনীতি অনন্য এক ঘটনা। ১৯৯৬ সালে নিজ রাজনৈতিক দল পিটিআই প্রতিষ্ঠা করার সময় ইমরান খান ঘোষণা করেছিলেন, পাকিস্তানের জাতীয় অগ্রগতির পথে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হলো পুরনো প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিবিদ এবং তাদের দলগুলোর প্রশ্রয়প্রাপ্ত দুর্নীতির সংস্কৃতি। তিনি বলেন, আমাদের মধ্যে চোর, লুটেরা, খুনি, ডাকাতের মতো শয়তান রয়েছে। এই শয়তানগুলো ধ্বংস করা গেলে আমাদের দুঃখগুলোও দূর হয়ে যাবে। ইমরান খানের গণস্বার্থমুখী রাজনৈতিক বয়ান অল্প সময়েই তরুণদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। তিনি পাকিস্তানে বিরাজমান দুর্নীতির সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের সমালোচনা অব্যাহত রাখেন। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অভিজাতদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচারণা শুরু করেন। তাদের তিনি পশ্চিমা সংস্কৃতি প্রভাবিত এবং পাকিস্তানের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক রীতিনীতির সঙ্গে বিচ্ছিন্ন বলেও অভিযোগ করেন। অবশ্য, ইমরান খান নিজেও প্রথম জীবনে পশ্চিমা সংস্কৃতি প্রভাবিত ছিলেন। রাজনীতির শুরুতেও তিনি ইউরোপ-আমেরিকার মতোই পাকিস্তানে ন্যায়বিচার এবং ক্ষমতাবান দুর্নীতিবাজদের বিচারের আওতায় আনার কথা বলতেন। কিন্তু পরে তিনি সুফি ইসলামের দিকে ঝুঁকে পড়েন এবং ইসলামি ন্যায়বিচার তথা ইনসাফের মাধ্যমে আর্থ-সামাজিক বৈষম্য দূর করার কথা বলেন। ইমরান খান প্রথম জীবনে পশ্চিমের ‘প্লেবয়’ হতে গিয়েছিলেন, পরে ধনী ব্রিটিশ পরিবারের নারীকেও বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু পশ্চিমারা কখনো তাকে সমান মানবিক মর্যাদা দেয়নি। ইমরান খান নানা সময়ে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সময় এ কথা বলেন। আর এ কারণেই তিনি ইসলামের দিকে ফিরে এসেছেন বলেও জানান।
এভাবে ইনসাফের কথা বলে ২০১২ সালের মধ্যেই ইমরান খান পাকিস্তানের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হন এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে জিতে প্রধানমন্ত্রী হন। তবে, নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও ইমরান খান সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমঝোতা করেই ক্ষমতা পেয়েছিলেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিরোধের কারণে সেনাবাহিনীর সঙ্গে তার সখ্য বেশিদিন টেকেনি। ইমরান খান যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে তালেবান ও আল-কায়েদার বিরুদ্ধে লড়াই করার বিরোধিতা করেন। এছাড়া প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজদের বিচার নিয়েও সেনাবাহিনীর সঙ্গে ইমরানের বিরোধ তৈরি হয়। কারণ সেনাবাহিনী শুধু প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির ফাইল তৈরি করে তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, বিচার করতে আগ্রহী নয়। অবশ্য সেনাবাহিনীতে ইমরান খানের জনপ্রিয়তা বেড়ে চলেছে। কারণ, এখন আর আগের মতো শুধু ধনী ভূস্বামী শ্রেণির সন্তানরাই নয় বরং নতুন মধ্যবিত্তের সন্তানরাও প্রচুর সংখ্যায় সেনা অফিসার হচ্ছেন।
লেখক: সাংবাদিক ও লেখক
jr.tareq@gmail.com