লেফটেন্যান্ট জেনারেল আসিম মুনির নামে দেশটির সেনাবাহিনীর একজন দুই তারকা জেনারেল পাকিস্তানের নতুন সেনাপ্রধান হচ্ছেন। কয়েক সপ্তাহের জল্পনার অবসান ঘটিয়ে তাকে সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দিচ্ছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ।
বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী মরিয়ম অওরঙ্গজেব এই ঘোষণা করে টুইটারে লিখেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে নয়া সেনাপ্রধান নিয়োগের প্রস্তাব সংক্রান্ত নথি প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভির দফতরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।’
আগামী ২৯ নভেম্বর বিদায়ী সেনাপ্রধান কামার জাভেদ বাজওয়ার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তার স্থলাভিষিক্ত হবেন তারই ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সেনা কর্মকর্তা আসিম মুনির। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের ভাই নওয়াজ শরিফ প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন ২০১৬ সালের নভেম্বরে পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের দায়িত্ব নিয়েছিলেন বাজওয়া। আরও এক মেয়াদ দায়িত্ব পালনের সুযোগ থাকলেও এবারই অবসর নেওয়ার ঘোষণা দেন বাজওয়া। সেনাপ্রধান হিসেবে ছয় বছর দায়িত্বপালন করেছেন তিনি।
আসিম মুনির বর্তমানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল পদে রয়েছেন। ২০১৮-র অক্টোবর থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের ডিজি পদে ছিলেন তিনি।
পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম দ্য ডনের প্রতিবেদনে লেফটেন্যান্ট জেনারেল আসিম মুনিরকে একজন অসাধারণ সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তবে প্রযুক্তিগত বিষয়ে জড়িত থাকার কারণে আগেই মনে করা হয়েছিল, লেফটেন্যান্ট জেনারেল আসিম নতুন সেনাপ্রধান হওয়ার দৌড়ে ডার্ক হর্স হতে পারেন।
২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে আসিম মুনির দুই তারকা জেনারেলের পদে উন্নীত হন। কিন্তু তিনি দুই মাস পরে সেই দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একইভাবে সামরিক বাহিনীর লেফটেন্যান্ট জেনারেল হিসাবে তার চার বছরের মেয়াদ আগামী ২৭ নভেম্বর শেষ হবে। বর্তমানে তিনি কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল পদে রয়েছেন।
লেফটেন্যান্ট জেনারেল মুনির পাকিস্তানের মংলায় অফিসার্স ট্রেনিং স্কুল প্রোগ্রামের মাধ্যমে চাকরিতে প্রবেশ করেন এবং ফ্রন্টিয়ার ফোর্স রেজিমেন্টে কমিশন লাভ করেন। তিনি বিদায়ী সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়ার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন।
এছাড়া বিদায়ী সেনাপ্রধানের অধীনে একজন ব্রিগেডিয়ার হিসেবে ফোর্স কমান্ড নর্দার্ন এরিয়াতে সৈন্যদের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আসিম মুনির।
দ্য ডন বলছে, লেফটেন্যান্ট জেনারেল মুনির পরবর্তীতে ২০১৭ সালের শুরুতে পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা মহাপরিচালক নিযুক্ত হন এবং পরের বছর অক্টোবরে তাকে আন্তঃবাহিনী গোয়েন্দা প্রধান হিসেবে নিযুক্ত করা হয়।
শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা হিসাবে আসিম মুনিরের কার্যকাল সর্বকালের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত হিসেবে রয়ে গেছে। মূলত এই পদে আসার আট মাসের মাথায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের চাপে তাকে শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং লেফটেন্যান্ট জেনারেল ফয়েজ হামিদকে সেই দায়িত্ব দেওয়া হয়।
পরে তাকে গুজরানওয়ালা কর্পস কমান্ডার হিসাবে নিয়োগ করা হয়। এই পদে তিনি দুই বছর ধরে অধিষ্ঠিত ছিলেন। এরপর পাকিস্তানের সেনা সদর দপ্তরে কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল হিসাবে স্থানান্তরিত হন লেফটেন্যান্ট জেনারেল আসিম মুনির।
পাকিস্তানের পরবর্তী সেনাপ্রধান হওয়ার দৌড়ে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের ঘনিষ্ঠ প্রাক্তন আইএসআই প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ফয়েজ হামিদ-সহ আরও পাঁচ জনের নাম ছিল আলোচনায়। সেই তালিকার আর এক সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল শাহির শামসাদ মির্জাকে সেনাবাহিনীর জয়েন্ট চিফ অফ স্টাফস কমিটির পরবর্তী চেয়ারম্যান মনোনীত করেছে শাহবাজ সরকার। বর্তমান চেয়ারম্যান জেনারেল নাদিম রাজাও সেনাপ্রধান বাজওয়ার সঙ্গে অবসরে যাবেন।
পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মধ্যে চলা বিতর্কের মধ্যেই সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ পেলেন মুনির। চলতি বছরের প্রথমদিকে তার ক্ষমতাচ্যুতিতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ ইমরানের।
পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শুরু থেকেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে দেশটির সেনাবাহিনী।
মুনিরের নিয়োগ পাকিস্তানের ভঙ্গুর গণতন্ত্রের ওপর, দেশটির সঙ্গে প্রতিবেশী ভারত ও আফগানিস্তানের সম্পর্কের ওপর এবং দেশ হিসেবে পাকিস্তান চীন না যুক্তরাষ্ট্রমুখি হবে তার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন...
৬ বছরে হাজার কোটি টাকার মালিক সেনাপ্রধানের পরিবার! পাকিস্তানে তোলপাড়