এশিয়ার চমকের পর চমক

কাতারে প্রথম বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপেও প্রথমবার কাতার। সেটা আয়োজক হওয়ার সুবাদেই। তবে মাঠের প্রথমটা রাঙাতে পারেনি আয়োজকরা। ইকুয়েডরের কাছে হেরে শুরু হয়েছে তাদের অভিযান। না জিতলেও এশিয়ার শুরুটা প্রথম দিনেই হয়েছে কাতারের মাধ্যমে। তবে পরের দিনটাও হারের হতাশায় ডুবতে হয়েছে এশিয়াকে। ইংল্যান্ডের কাছে ইরান হেরেছে ৬-২ গোলের বিশাল ব্যবধানে। এমন নড়বড়ে শুরুর পর এশিয়া যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে তা রীতিমতো অবিশ্বাস্য। ২২ নভেম্বর লুসাইল আইকনিক স্টেডিয়ামে ইতিহাসের সেরা অঘটনের জন্ম দিয়ে সৌদি আরব হট ফেভারিট আর্জেন্টিনাকে হারায় ২-১ গোলে। সেদিন অবশ্য ফ্রান্সের কাছে ৪-১ গোলে হেরে যায় এশিয়া অঞ্চলের হয়ে খেলা অস্ট্রেলিয়া। আর পরের দিন চারবারের বিশ্বসেরা জার্মানিকে একই ব্যবধানে হারিয়ে আরেক অঘটনের জন্ম দেয় জাপান।

গতকালও আলো ছড়িয়েছে এশিয়া। বিশ্বকাপের এই মহাদেশের সবচেয়ে ধারাবাহিক দল দক্ষিণ কোরিয়া রুখে দিয়েছে শক্তিশালী উরুগুয়েকে। এশিয়ার ফুটবলও যে এগিয়ে যাচ্ছে, তার প্রমাণ তো বিশ্বকাপের শুরুতেই মিলল।

সচরাচর বিশ্বকাপে এশিয়ার দেশগুলো কখনই আলোচনায় থাকে না। এবারও এর ব্যতিক্রম নেই। ব্যতিক্রম শুধু একটাই; এবার এশিয়ার দলসংখ্যা বেড়ে হয়েছে ছয় (এএফসির অধীনে খেলা অস্ট্রেলিয়াকে ধরে)। দ্বিতীয়বারের মতো এশিয়ায় বিশ্বকাপ বলেই এশিয়ার দৌড় কদ্দুর তা জানার আগ্রহী সংখ্যা একেবারে কম নয়।

পুরো কুড়ি বছর পর বিশ্বকাপ ফিরেছে এশিয়ায়। ২০০২ সালে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের যৌথ আয়োজন বিস্মিত করেছিল ফুটবল বিশ্বকে। কেবল আয়োজনে নতুনত্ব এনেই নয় সেবার সেমিফাইনালে উঠে রীতিমতো হইচই ফেলে দিয়েছিল দক্ষিণ কোরিয়া। আগের ২১টি আসরে এশিয়া মহাদেশের ১২টি দেশ ৩৯বার অংশ নিয়েছে। শুনলে অবাক হবেন, এশিয়া থেকে বৈশ্বিক আসরে প্রথম প্রতিনিধিত্বকারী দলটির নাম ইন্দোনেশিয়া! ১৯৩৮ সালে দ্বিতীয় বিশ্বকাপে খেলা দেশটি এরপর আর কখনো সুযোগ পায়নি। ইন্দোনেশিয়া যদি প্রথম হয়, এশিয়ার শেষ প্রতিনিধি কাতার।

বিশ্বকাপে এশিয়ার সাফল্য বলতে সবার আগে আসবে ২০০২ আসরে দক্ষিণ কোরিয়ার সেমিফাইনালে নাম লিখানো। দ্বিতীয়বারের মতো যখন এশিয়ায় বিশ্বকাপ ফিরল, তখন থেকেই প্রশ্ন উঠেছিল কাতার কি পারবে কোরিয়াকে ছুঁতে? হারে শুরুর পর তাদের দ্বিতীয়পর্বই এখন প্রশ্নের মুখে। আজ সেনেগালকে হারালে অবশ্য একটা সম্ভাবনা বেঁচে থাকবে স্বাগতিকদের। তবে খুব বেশি প্রত্যাশা নেই দলটির কাছে। অনেকের মনের কোনে উঁকি ভাবী শঙ্কা, ‘কাতারের এবারই প্রথম, এবারই কি শেষ?’

সৌদি আরব, জাপান, ইরান ও অস্ট্রেলিয়ার চাওয়াটা নিশ্চয় ২০ বছর আগের গাস হিডিঙ্ক নামক এক জাদুকরের ছোঁয়ায় বদলে যাওয়া কোরিয়াকে ছাড়িয়ে যাওয়া। এর মধ্যেই সৌদি আরব ও জাপান নিজেদের প্রমাণ করেছে দুই ফেভারিটকে হারিয়ে। সৌদি আরবের মেসির আর্জেন্টিনার বিপক্ষে জয়টা যেন রূপকথার গল্পকেও হার মানায়। অবিশ্বাস্য ভালো ফুটবলে আর্জেন্টিনাকে থমকে দেওয়া গ্রিন ফ্যালকনরা ষষ্ঠ বিশ্বকাপে এসে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে দ্বিতীয়বারের মতো দ্বিতীয়পর্বে যাওয়ার। শনিবার পোল্যান্ডকে হারালেই সি গ্রুপ থেকে তারা চলে যাবে সেরা আটে। একই জায়গায় দাঁড়িয়ে জাপান। রবিবার কোস্টারিকার বিপক্ষে জয়ে ব্লু সামুরাইরা পৌঁছে যাবে পরের ধাপে।

আর কোরিয়া তো সবসময়ই এশিয়ার আশার প্রতীক হয়ে অংশ নেয় বিশ্বকাপে। ঘরের মাঠের বিশ্বকাপে খুব মনে পড়ে পর্তুগাল, ইতালি, স্পেনের মতো দলগুলোকে কাঁদিয়ে তারা পৌঁছে গিয়েছিল সেমিতে! এ নিয়ে ১১তম বারের মতো বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে দক্ষিণ কোরিয়া। গতকাল প্রথম ম্যাচে তারা দুবারের বিশ্বসেরা উরুগুয়েকে রুখে দিয়েছে ০-০ গোলে। যা তাদের ২০ বছর পর দেখাচ্ছে দ্বিতীয়পর্বের স্বপ্ন। জার্মানদের লজ্জা দেওয়া জাপানের এটা সপ্তম বিশ্বকাপ। আগের ছ’বারে তিনবার তারা পৌঁছেছিল দ্বিতীয়পর্বে। প্রথম ম্যাচ জিতলেও তাদের সামনে আছে স্পেন ও কোস্টারিকা। সময়ই বলে দেবে কী আছে দলটির ভাগ্যে।

নারীদের হিজাব ইস্যুতে উত্তাল ইরান শিবিরের অবস্থা দেশের মতোই টালমাটাল। টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের শুরুতেই মাথা হেট হয়েছে তাদের ইংল্যান্ডের কাছে বড় ব্যবধানে হেরে। অভিজ্ঞ কোচ কার্লোস কুইরোজকে তাই খুঁজতে হচ্ছে হতাশা ভুলে সামনে এগুনোর পথ। গেল সেপ্টেম্বরে তাকে দায়িত্বে ফিরিয়ে ইরান চেয়েছিল সাফল্য পেতে। শুরুর হারে এখন তাদের পিঠ ঠেকে গেছে দেয়ালে। আজ তাদের পেরুতে হবে গ্যারেথ বেলের ওয়েলস ওয়াল। অস্ট্রেলিয়ার ষষ্ঠবারের মতো বিশ্বকাপে আসাটা প্লে-অফে পেরুকে হারিয়ে।

তবে ২০১৫ এশিয়ান কাপ চ্যাম্পিয়নরা বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সের সামনে কোনো প্রতিরোধই গড়তে পারেনি প্রথম ম্যাচে। দ্বিতীয়পর্বে যেতে পরের দুই ম্যাচে তাদের হারাতে হবে তিউনিসিয়া ও ডেনমার্ককে।