নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বল নজরদারির সুযোগে একের পর এক আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটছে। বিভিন্ন ব্যাংকে ঋণ অনিয়মের পর এবার এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) অপব্যবহারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের প্রতিষ্ঠান শার্প নিটিং অ্যান্ড ডাইং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের বিরুদ্ধে। বন্ড সুবিধায় আনা প্রায় ১৫৯ কোটি ডলার বা প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের পণ্য রপ্তানি না করে তা লোপাট করেছে ওই প্রতিষ্ঠানটি। এতে করে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারিয়েছে।
একটি ব্যাংকের সাহায্যে ছয় বছর ধরে রপ্তানির নামে বিদেশ থেকে বন্ড বা শুল্ক সুবিধায় কাঁচামাল এনে তা স্থানীয় বাজারে বিক্রির মাধ্যমে কয়েক হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে শার্প নিটিং অ্যান্ড ডাইং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির মালিকানায় ছিলেন কর্নেল (অব.) আনোয়ারুল আজিম, যিনি বিএনপিদলীয় সাবেক সংসদ সদস্য। তবে আনোয়ারুল আজিম দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, তিনি ২০১৪ সালে বাবর সিদ্দিকী নামে এক ব্যবসায়ীর কাছে প্রতিষ্ঠানটি বিক্রি করে দিয়েছেন।
বাবর সিদ্দিকীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দেশ রূপান্তরের কাছে ১৫৯ কোটি ডলারের এলসির তথ্য মিথ্যে বলে দাবি করেন। প্রথমে তিনি জানান, বিভিন্ন সময়ে লোকাল এলসি খুলে তা স্থানীয়ভাবে রপ্তানি করা হয়েছে। তবে এর পরিমাণও অনেক কম। পরে জানান, পণ্য বিদেশে রপ্তানি হয়েছে এবং রপ্তানির অর্থ ফেরত আসেনি। তা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। কতদিন ধরে রপ্তানির অর্থ আসেনি এমন প্রশ্নের উত্তর বাবর দিতে পারেননি। শার্প নিটিং অ্যান্ড ডাইং ইন্ডাস্ট্রিজের মালিকানায় বাবরসহ ৯ জন রয়েছেন। এলসিসংক্রান্ত বিষয়টি নিয়ে ব্যাংকের সঙ্গে ফয়সালার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন বাবর সিদ্দিকী।
নিটিং কারখানাগুলো সাধারণত সুতা, কাপড় ও যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানি করে থাকে। শুল্ক রেয়াতি সুবিধাভভুক্ত ব্যাক টু ব্যাক এলসির ক্ষেত্রে পণ্য রপ্তানির বাধ্যবাধকতা থাকলেও শার্প নিটিং অ্যান্ড ডাইং ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে কোনো পণ্যই রপ্তানি হয়নি বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে উঠে এসেছে। এমনকি গ্রাহকের কারখানায় আমদানিকৃত কাঁচামাল কিংবা তা থেকে প্রস্তুতকৃত পণ্যের মজুদও খুঁজে পায়নি বাংলাদেশ ব্যাংক। এ অবস্থায় চলমান তদন্তের পাশাপাশি কাস্টমস গোয়েন্দা বিভাগকেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে চিঠি দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সূত্র জানায়, একটি ব্যাংকের বনানী শাখা কোনো নিয়মের তোয়াক্কা না করে গাজীপুর সিটির অন্তর্ভুক্ত টঙ্গীর পাগার এলাকায় (হোল্ডিং নম্বর ১২৩) অবস্থিত শার্প নিটিং অ্যান্ড ডাইং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের অনুকূলে শুল্ক রেয়াতি সুবিধায় আমদানির জন্য এলসি ইস্যু করেছে। প্রতিষ্ঠানটির নামে ২০১৫ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ৮৮৯টি ব্যাক টু ব্যাক এলসি ইস্যু করা হয়েছে। যার মোট পরিমাণ ১৫৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৬ হাজার ৫৬৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বন্ডেড ওয়্যারহাউজ লাইসেন্সিং বিধিমালা অনুযায়ী, শতভাগ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে লাইসেন্সের মেয়াদ দুই বছর এবং ৫ হাজার টাকা ফি দিয়ে প্রতি দুই বছর পরপর তা নবায়ন করতে হয়। আর পণ্য প্রস্তুতের পর ২৪ মাস এবং বিশেষ পণ্যের ক্ষেত্রে প্রয়োজনে আরও বেশি তা ওয়্যারহাউজে রাখার বিধান রয়েছে। কিন্তু ২০০৩ সালের এপ্রিল মাসে শার্প নিটিং অ্যান্ড ডাইং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের নামে বন্ডেড ওয়্যারহাউজের লাইসেন্স ইস্যু করার পর থেকে একবারও নবায়ন করা হয়নি। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স সম্পূর্ণ মেয়াদোত্তীর্ণ এবং বন্ডের অধীন শুল্কমুক্ত সুবিধার আওতায় পড়ে না। কিন্তু ওই ব্যাংকটি কোনো যাচাই-বাছাই না করেই এমন একটি প্রতিষ্ঠানকে শুল্কমুক্ত সুবিধায় এলসি ইস্যু করেছে।
গত বৃহস্পতিবার গাজীপুরের টঙ্গীর পাগার এলাকায় (হোল্ডিং নম্বর ১২৩) শার্প নিটিং অ্যান্ড ডাইং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডে সরেজমিনে গিয়ে কারখানাটি বন্ধ পাওয়া গেছে। সেখানে কর্তব্যরত নিরাপত্তা প্রহরীরা জানিয়েছেন, কারখানাটি প্রায় তিন মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। একসময় কয়েকশ শ্রমিক ছিল। নিরাপত্তারক্ষীরা জানান, তারা শুনেছেন যে প্রতিষ্ঠানটির নামে প্রচুর টাকা ঋণ রয়েছে। মাঝেমধ্যে ব্যাংকের লোক আসে। আর যারা কারখানায় আসেন তারা ব্যাংকের পরিচয় দেন। মালিকপক্ষ কারখানাটি সচল করতে চায় জানালেও কবে তা খোলা হবে সে বিষয়ে কিছু বলতে পারেননি নিরাপত্তা প্রহরীরা।
এ বিষয়ে বাবর সিদ্দিকী জানিয়েছেন, কারখানাটিতে সংস্কার কার্যক্রম চলছে। তবে কবে নাগাদ তা চালু হবে, তা জানাতে পারেননি তিনি।
এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান ড. আবদুল মজিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ব্যাংক এলসির মাধ্যমে আমদানির দায়িত্ব নিয়ে থাকে। তবে এ জন্য আইন ও শর্ত মানতে হয়। ব্যাংকের প্রথম ও মৌলিক দায়িত্ব হলো কোনো প্রতিষ্ঠানের এলসি খোলার আগে তার লাইসেন্স নবায়ন ও মেয়াদের হালনাগাদ অবস্থা ইত্যাদি যাচাই করা। সেই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কর, ভ্যাট ও ব্যবসা সনদ সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য জেনে নেওয়া। আর বন্ডেড ওয়্যারহাউজ হলে সেই সংক্রান্ত সনদ ও মেয়াদ, কারখানার অবস্থানের খোঁজ নেওয়া ও উৎপাদিত পণ্য নিয়মিত তদারকি করা।’ তিনি বলেন, ‘ব্যাংকের অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে এলসির পণ্য দেশে আসছে কি না। নাকি শুধু টাকা বিদেশে যাচ্ছে অথচ কোনো পণ্য আসছে না। আর ব্যাংক টাকা দেয় বলে সেটা দেখার দায়িত্ব ব্যাংকের।’
আবদুল মজিদ আরও বলেন, ‘এলসিতে অনিয়ম হলে বা পাচারের মাধ্যমে টাকা বিদেশে গেলে সেই দায় ব্যাংক এড়াতে পারে না। এর পরের দায়িত্ব হলো লাইসেন্সদাতা প্রতিষ্ঠান এনবিআরের। তাদের দায়িত্ব কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স নিয়ে কী করছে, তা তদারকি করা। এ জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাও রয়েছেন। কেউ অভিযোগ না করলেও লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের খোঁজ নেওয়া উচিত। বার্ষিক প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নিয়মও রয়েছে। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। কারণ ব্যাংকগুলো তো এলসির যাবতীয় তথ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দেয়।’
এদিকে গাজীপুরে অবস্থিত বড় ভবানীপুরের গোবিন্দবাড়ি এলাকায় ব্লাইথ ফ্যাশনেও একই ধরনের অনিয়ম হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বন্ডেড ওয়্যারহাউজ লাইসেন্স না থাকলেও ২০১৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৮ সালের ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উল্লিখিত গ্রাহকের অনুকূলে একই ব্যাংকের মিরপুর শাখা থেকে শুল্ক রেয়াতি সুবিধার আওতায় ১২৩টি ব্যাক টু ব্যাক মাস্টার এলসির মাধ্যমে ৬৭ লাখ ৪০ হাজার ৪১৬ ডলারের পণ্য আমদানি করা হয়। কিন্তু ৮ লাখ ৪২ হাজার ৬৬৩ ডলারের রপ্তানি হয়নি। আর একই সময়ে ওই গ্রাহকের অনুকূলে ৩৫০টি ব্যাক টু ব্যাক এলসি ইস্যু হয়েছে। যার পরিমাণ ৫৫ লাখ ৭ হাজার ৬৮৯ ডলার। এখানে দুই দফার হিসাব একসঙ্গে করে দেখা গেছে, বাধ্যবাধকতা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৬৩ লাখ ৫০ হাজার ৩৫৩ ডলার বা ৬৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকার পণ্য রপ্তানি হয়নি। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শনে কারখানাটি বন্ধ উল্লেখ করা হয়েছে। বন্ধ হওয়া কারখানায় আমদানিকৃত পণ্যের কাঁচামাল এবং তা থেকে প্রস্তুতকৃত পণ্যের মজুদ পাওয়া যায়নি। চলমান তদন্তের পাশাপাশি কাস্টমস গোয়েন্দা বিভাগকেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে চিঠি দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানেও কাশিমপুরের গোবিন্দবাড়ি এলাকায় ব্লাইথ ফ্যাশনের কারখানা বন্ধ পাওয়া যায়। সেখানে যমুনা সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিটি সার্ভিসেসের (জেএসএসএস) দুজন প্রহরী কারখানাটি পাহারায় নিযুক্ত। তারা জানান, কারখানাটি ২০১৮ সাল থেকে বন্ধ রয়েছে। এর প্রধান মালিকের বাড়ি সিরাজগঞ্জ এবং তিনি যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী। কবির নামে তার এক ভাই এটা দেখাশোনা করেন। ঋণের বকেয়ার দায়ে মালিকপক্ষের কাছ থেকে কারখানাটির কর্তৃত্ব ব্যাংক নিয়েছে। মালিকপক্ষের সহযোগিতায় ব্যাংক প্রতিষ্ঠানটি বিক্রির চেষ্টা করছে। ক্রেতারা এর সমুদয় সম্পদের দাম হাঁকছেন ১০ থেকে ১১ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে ব্লাইথ ফ্যাশনের তত্ত্বাবধায়ক কবির হোসেন বলেন, ‘তিন ভাইয়ের মধ্যে বড় ভাই এম সামসুল আরেফিন ও ছোট ভাই শাহরিয়ার পারভেজ এটার প্রকৃত মালিক। ব্যবস্থাপনা পরিচালক পারভেজ। তারা বিদেশে থাকেন। আর ব্যাংকের কাছে এক বছর আগে দেনা ছিল সাড়ে ১০ কোটি টাকা। এটা বিক্রি হলে ঋণ সমন্বয় করা হবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ব্যাংকের ঋণ বিতরণ ও এলসি খোলার আগে সবকিছু যাচাই করা উচিত ছিল। তা না হলে বিতরণ করা ঋণ ফিরে পাওয়া কঠিন। ঋণ দেওয়ার পরেই তা কী কাজে ব্যবহার হচ্ছে তা খতিয়ে দেখা উচিত। বড় অনিয়ম হলে তা কোনোভাবেই বরদাশত করা ঠিক হবে না। আর ব্যাংকের দুর্বলতা ধরা পড়লে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।’