বিএনপির সঙ্গে জোটের প্রশ্নই আসে না

দলের চরম অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও সংকটের মধ্যেই দেশে ফিরলেন জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ। গতকাল রবিবার বিমানবন্দরে নেমেই দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের সঙ্গে দ্বন্দ্ব, তার বিরুদ্ধে দল ভাঙার অভিযোগ, জাপার বিএনপি জোটে যোগ দেওয়ার গুঞ্জনসহ দলে চলমান রাজনৈতিক সংকটের ব্যাপারে কথা বলেছেন তিনি।

রওশন এরশাদ সাংবাদিকদের স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তার দল বিএনপির সঙ্গে যাচ্ছে না। তিনি বলেন, জনগণ উন্নতি ও শান্তির জন্য পরিবর্তন চায়। জাতীয় পার্টিই দিতে পারে সেই শান্তি। অবশ্যই তা বিএনপি নয়। বিএনপির সঙ্গে জোটের প্রশ্নই আসে না। চিকিৎসা শেষে পাঁচ মাস পর ব্যাংকক থেকে থাই এয়ারওয়েজের একটি বিমানে গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে দেশে ফেরেন রওশন। বেলা দেড়টায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ দিয়ে বের হয়ে সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন। তার সঙ্গে আসেন তার মুখপাত্র কাজী মামুনূর রশীদ, ছেলে রাহগির আল মাহি সাদ এরশাদ এমপি ও পুত্রবধূ মাহিমা সাদ।

বিএনপির সঙ্গে জোট না করার প্রসঙ্গে লিখিত বক্তব্যে রওশন এরশাদ বলেন, ‘বিএনপির সময়ে জাতীয় পার্টি খুবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমাদের নেতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং আমি, আমার সন্তানসহ দলের হাজার হাজার নেতাকর্মী জেল খেটেছেন। তখন আমাদের জনসভাও করতে দেওয়া হয়নি। ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে অনেক জনসভায় হামলা চালানো হয়। সেই দিনগুলো আমরা ভুলব কী করে? তা ছাড়া আমরা তাদের শাসনামলে হাওয়া ভবনের দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও অপতৎপরতা দেখেছি।’

পাঁচ মাস আগে চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডে যাওয়ার সময় জাপার চেয়ারম্যান ও দেবর জি এম কাদের, মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নুসহ অনেক সিনিয়র নেতা রওশনকে বিমানবন্দরে বিদায় জানাতে গিয়েছিলেন। কিন্তু গতকাল তাদের কেউ স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরে যাননি। তার পরিবর্তে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরে যান জাপা কাদের অংশের কো-চেয়ারম্যান এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার, কাজী ফিরোজ রশীদ এমপি ও সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা।

অবশ্য রওশনপন্থি সব নেতাকেই বিমানবন্দরে দেখা গেছে। এ সময় বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে উপস্থিত থেকে রওশনকে অভ্যর্থনা জানান জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও দল থেকে অব্যাহতি পাওয়া মসিউর রহমান রাঙ্গা, বিরোধীদলীয় নেতার রাজনৈতিক সচিব গোলাম মসীহ, পার্টির বহিষ্কৃত সিনিয়র নেতা অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন খান, এস এম এম আলম, সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য ফখরুজ্জামান জাহাঙ্গীর, সাবেক এমপি ও দলীয় চেয়ারম্যানের সাবেক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট জিয়াউল হক মৃধা প্রমুখ।

বিমানবন্দরে নেমেই দলের ঐক্য বজায় রাখতে জি এম কাদেরের সঙ্গে বসার প্রস্তাব রেখেছেন রওশন এরশাদ। এ ব্যাপারে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে রওশন বলেন, ‘জি এম কাদেরের সঙ্গে বৈঠকে বসব, আমি দলের ঐক্য চাই। দলের ঐক্য বজায় রাখতে জাপাকে বিভক্ত করার কোনো ধরনের ইচ্ছা নেই।’

জি এম কাদেরের সঙ্গে তার কোনো দ্বন্দ্ব নেই এবং আগামীতে একসঙ্গে চলবেন বলেও মন্তব্য করেন রওশন। বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানাতে জি এম কাদেরের না আসা প্রসঙ্গে রওশন এরশাদ বলেন, ‘আসেনি তো কী হয়েছে? ওনার কোনো সমস্যা আছে মনে হয়। এতে আমি কোনো সমস্যা দেখছি না।’

রওশন এরশাদের এমন বক্তব্যের পর দেবর-ভাবির দ্বন্দ্বের মীমাসাংর দায়িত্ব নেওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেন সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাপা থেকে বহিষ্কৃত রাঙ্গা। এ ব্যাপারে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘দল না করার শর্তেও যদি তাদের (রওশন ও জি এম কাদের) মীমাংসা করা দরকার পড়ে, আই উইল ডু ইট। জি এম কাদের ও রওশন এরশাদের মধ্যে মনোমালিন্য আছে। এটা আগেও বলেছি, দুজন একসঙ্গে বসলে এটার সমাধান হয়ে যাবে।’

এ ব্যাপারে লিখিত বক্তব্যে রওশন বলেন, ‘আমি সব সময় জাপার ঐক্য চাই। আমার স্বামী প্রয়াত রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, আমি এবং আমার পরিবারের সদস্যদের কত কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। আমি দেখেছি গত ৩২ বছরে দলের নেতাকর্মীরা কতটা কঠোর পরিশ্রম করেছেন।’

রওশন এরশাদ বলেন, ‘পার্টিকে বিভক্ত করার প্রশ্নই ওঠে না। আমি ঢাকায় ফিরে এসেছি। সব এমপি, প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং অন্যদের সঙ্গে যেকোনো বিভ্রান্তি ও ভুল-বোঝাবুঝি দূর করতে বসব। আমি নিশ্চিত, সেই ভুল-বোঝাবুঝি দূর করে ঐক্যবদ্ধভাবে শিগগিরই রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ফিরতে পারব। পার্টিকে দুর্বল করতে কিছু ষড়যন্ত্র হতে পারে। যেমনটি ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০১৪ সালে দেখেছি।’

নিজের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে রওশন জানান, পায়ে কিছু সমস্যা আছে। সেগুলোর জন্য ফিজিওথেরাপি নিচ্ছেন। এ ছাড়া আর কোনো সমস্যা নেই। 

এ সময় আসন্ন রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে লাঙ্গলের মেয়রপ্রার্থী হিসেবে সাবেক মেয়র মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফার নাম জানান রওশন এরশাদ। এ ব্যাপারে লিখিত বক্তব্যে রওশন বলেন, রংপুর জাতীয় পার্টির প্রাণ। এটা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বাড়ি। তাই আসনটি যেকোনো মূল্যে ধরে রাখতে হবে। জাতীয় পার্টির প্রতীক ‘লাঙ্গল’ নিয়ে নির্বাচনে জয়ী হবে এমন যোগ্য প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হবে। এ জন্য সব নেতাকর্মীকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সরকারের প্রতি আস্থা জানান রওশন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন বজায় রাখতে সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছেন। দুর্নীতি, অর্থনীতিতে অব্যবস্থাপনা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির মতো কিছু ত্রুটি রয়েছে। আমি নিশ্চিত যে প্রধানমন্ত্রী এসব বিষয়ে অবগত আছেন। প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করব, এ বিষয়গুলো আরও ভালোভাবে সমাধান করতে এবং মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের আরও বেশি আন্তরিক ও সক্রিয় হতে হবে।’

এ সময় ইউক্রেনের যুদ্ধের কারণে অর্থনৈতিক সমস্যা কাটাতে সবাইকে আরও সতর্ক ও সরকারকে সহযোগিতা করা উচিত বলে মত দেন রওশন এরশাদ।

রওশনের প্রেস উইং থেকে জানানো হয়, বিমানবন্দর থেকে রওশন এরশাদ গুলশানের একটি হোটেলে উঠেছেন। সেখানে তার এক সপ্তাহ থাকার কথা। পরে মিন্টো রোডের বিরোধীদলীয় নেতার বাসভবন অথবা গুলশান-১-এর ৬৭ নম্বর সড়কের নিজ বাসভবনে উঠবেন।