ভারতে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতকে টুইটার ডিএম (ডিরেক্ট মেসেজ) করে অকথ্য ভাষায় গালি দেওয়ার অভিযোগ উঠল। ‘দ্য কাশ্মীর ফাইলস’ ছবি নিয়ে ইসরায়েলি সিনেমা নির্মাতা নাদাভ ল্যাপিডের বিতর্কিত মন্তব্যের জেরেই সেদেশের রাষ্ট্রদূতকে এই আক্রমণ করা হয়। সেই মেসেজের স্ক্রিনশট তুলে পোস্টও করেছেন ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত নাওর গিলন। যদিও ল্যাপিডের বিতর্কিত মন্তব্যের পর তার সমালোচনা করেছিলেন ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত। তা সত্ত্বেও আক্রমণের শিকার হতে হল গিলনকে। গিলনের অভিযোগ, তাকে পাঠানো বার্তায় ইহুদি বিদ্বেষী মনোভাব ফুটে ওঠে বার্তা প্রেরকের।
স্ক্রিনশট পোস্ট করে গিলন লেখেন, ‘আমি কয়েকটি ডিএম পেয়েছি। তার মধ্যে একটি পোস্ট করতে চেয়েছিলাম। তার (মেসেজ প্রেরক) প্রোফাইল অনুসারে, লোকটির পিএইচডি ডিগ্রি আছে। আমার তার নাম প্রকাশ না করার কোনও কারণ নেই। সে আমার সুরক্ষার যোগ্য নয়। তাও আমি তার ব্যক্তিগত তথ্য মুছে ফেলে মেসেজ পোস্ট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ গিলনকে পাঠানো মেসেজে হিটলারকে ‘মহান’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়। এদিকে সেই মেসেজের স্ক্রিনশট পোস্ট করার পর অনেকেই গিলনকে সমর্থন জানান।
এরপর গিলন অপর এক টুইট বার্তায় লেখেন, ‘আপনাদের সমর্থন আমার হৃদয় স্পর্শ করেছে। উল্লেখিত ডিএম কোনওভাবেই ভারত ও আমাদের বন্ধুত্বের প্রতিফলন নয়। তবে এখও বিশ্বে ইহুদি-বিরোধী মনোভাব রয়েছে। আমাদের সম্মিলিতভাবে এর বিরোধিতা করতে হবে এবং আলোচনার একটি সভ্য স্তর বজায় রাখতে হবে।’
প্রসঙ্গত, ‘দ্য কাশ্মির ফাইলস’ ছবি নিয়ে ইসরায়েলি চলচ্চিত্র পরিচালক নাদাভের ‘ভালগার’ এবং ‘প্রোপাগান্ডা’ মন্তব্যের জেরে বিতর্ক দানা বেঁধেছিল। নাদাভ দাবি করেন ‘দ্যা কাশ্মীর ফাইলস’ ইফির মতো ঐতিহ্যশালী ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে প্রদর্শনের অযোগ্য। নাদাভের বক্তব্যের জেরে পরিস্থিতি এমন জটিল আকার ধারণ করে যে ড্যামেজ কন্ট্রোলে নেমে ভারতবাসীর কাছে ক্ষমা চান ভারতে ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত।
পরে অবশ্য নিজের মন্তব্যের ব্যাখ্যায় নাদাভ বলেছিলেন, ‘ওই ধরনের মন্তব্য করা আমার জন্য সহজ ছিল না। আমি অতিথি ছিলাম। এখানে আমি জুরি প্রধান। আমার সঙ্গে অত্যন্ত ভালো ব্যবহার করা হয়েছে। … আমার মধ্যে একটি শঙ্কা এবং অস্বস্তি কাজ করছিল। এরপর বিষয়টি কোন দিকে এগোবে তা বুঝতে পারিনি। ফলে কিছুটা শঙ্কা নিয়েই আমি মন্তব্য করেছিলাম।’
ওদিকে, বিতর্কের ঝড়ে পড়ে সবাই আঙুল তুললেও ইসরায়েলি পরিচালক নাদাভ লাপিডের পাশে দাঁড়ালেন গোয়া আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের জুরিবোর্ডের তিন সদস্য। জিঙ্কো গোটাহ্, পাস্কাল শ্যাভান্স এবং জেভিয়ার অ্যাঙ্গুলো বারতুরেন টুইটারে এক বিবৃতিতে জানান, জুরিবোর্ডের সদস্যরা সবাই জানতেন। এবং প্রধান হিসাবে নাদাভ ল্যাপিড যা বলেছেন, তার সঙ্গে তারা একমত। এর ফলে দলছুট হয়ে গেলেন সুদীপ্ত সেন, যিনি জুরিবোর্ডে থাকা একমাত্র ভারতীয় পরিচালক। তিনি একাই শুধু এখন নাদাভের বিপক্ষে আছেন। তিনি বলেছিলেন, ‘ল্যাপিড যা বলেছেন, তা সম্পূর্ণ তার নিজস্ব মত।’ প্রসঙ্গত, সুদীপ্ত নিজেও ধর্মান্তরণকে কেন্দ্র করে তোলা ‘দ্য কেরালা স্টোরি’ নামে এক ছবির পরিচালক। সেই ছবিকে নিয়েও বিতর্ক শুরু হয়েছে।
ল্যাপিড অবশ্য পরে জানিয়েছিলেন, কাশ্মীরি পণ্ডিতদের দুর্দশাকে লঘু করা তার উদ্দেশ্য ছিল না। তিনি কেবল, ছবিতে এর উপস্থাপনার দুর্বলতা নিয়ে কথা বলেছিলেন বলে দাবি করেন। তার এই বক্তব্যে আলোকপাত করেই সমর্থন জানান এই তিন জুরি।
তিন জুরির বিবৃতিতে লেখা, ‘উৎসবের সমাপ্তি অনুষ্ঠানে, জুরিবোর্ডের সভাপতি নাদাভ ল্যাপিড, জুরি সদস্যদের পক্ষে একটি বিবৃতি দিয়েছেন, ‘আমরা সবাই ১৫তম প্রদর্শিত ছবি, ‘দ্য কাশ্মীর ফাইলস্’ দেখে বিরক্ত এবং হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। যা আমাদের কাছে একটি অশ্লীল প্রচার বলে মনে হয়েছিল। এমন একটি ছবি মর্যাদাপূর্ণ উৎসবের শৈল্পিক প্রতিযোগিতামূলক বিভাগের জন্য অনুপযুক্ত বলে আমি মনে করি।’ আমরাও তার এই বক্তব্য সমর্থন করছি।’
তিনি জুরি আরও দাবি করেন, ‘আমরা ছবির বিষয়বস্তু ঘিরে রাজনৈতিক অবস্থান নিইনি। আমরা শুধুমাত্র শৈল্পিক বিবৃতি দিয়েছি। বরং আমরা বলব, এ বার উৎসবের মঞ্চকে রাজনীতির জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। নাদাভের উপর ব্যক্তিগত আক্রমণ দেখে আমাদের খুব খারাপ লাগছে। এটি কখনোই উদ্দেশ্য ছিল না জুরির।’
জিনকো অস্কারজয়ী আমেরিকান প্রযোজক। জেভিয়ার তথ্যচিত্র নির্মাতা এবং একইসঙ্গে ফরাসি সাংবাদিক। পাস্কাল একজন ফরাসি ছবি-সম্পাদক।
গত ২০-২৮ নভেম্বর ভারতের গোয়ায় অনুষ্ঠিত এক আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ‘দ্য কাশ্মীর ফাইল্স’ প্রদর্শিত হয়। উৎসবের শেষ দিনে ইন্টারন্যাশানাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল অফ ইন্ডিয়া বা ইফি-র জুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান ল্যাপিড বিবেক অগ্নিহোত্রীর ছবিটির তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি জানান, এই ধরনের ছবি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মঞ্চে স্থান পাওয়ার যোগ্য নয়। ছবিটিকে ‘অশ্লীল’ এবং ‘প্রচারমূলক’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ল্যাপিডের এমন মন্তব্যের পরই বিতর্কের ঝড় ওঠে। ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত তার সমালোচনা করে ক্ষমা চেয়ে নেন। ইফি-র তরফে জানানো হয়, ল্যাপিডের মতামত ব্যক্তিগত। তবে সেই দাবি উড়িয়ে দিয়ে ল্যাপিড জানিয়েছেন, শুধু তিনি একা নন, জুরি বোর্ডের অন্যান্য সদস্যেরও ‘দ্য কাশ্মীর ফাইলস্’ ছবিটি নিয়ে একই কথা মনে হয়েছিল।
ল্যাপিড বলেন, ‘কাশ্মীরের ঘটনায় যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন, তাদের প্রতি আমার বিপুল শ্রদ্ধা রয়েছে। আমি যা বলেছি, তা এই বিষয়ের কথাই নয়। আমি হাজার বার বলতে পারি, আমি কোনও রাজনৈতিক বা ঐতিহাসিক বিষয়ে মন্তব্য করিনি। আমি ছবিটি নিয়ে মন্তব্য করেছিলাম। আমার মতে, এমন গুরুতর একটি বিষয় আরও গুরুগম্ভীর একটি ছবি দাবি করে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি যা বলেছি, তা মোটেই আমার ব্যক্তিগত মতামত ছিল না। আমাদের সকলেরই ছবিটি দেখে মনে হয়েছে, সেখানে ধারাবাহিক ভাবে ঘটনাগুলোকে অতিরঞ্জিত করা হয়েছে, অশ্লীল এবং হিংসাত্মক বিষয় টেনে আনা হয়েছে। কোনও স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে হিংসার বীজ বপন করার উদ্দেশ্যেই এমনটা করা হয়েছে বলে মনে হয়েছে আমাদের সকলের।’