মানুষের জ্বর হলেই সাধারণ ওষুধের সঙ্গে অ্যান্টিবায়োটিক খাচ্ছে। পরবর্তী সময়ে কোনো মানুষের বড় ধরনের অসুখ হলে অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ করছে না। এটাই সাধারণ মানুষের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্সের জন্য বড় কারণ। এ জন্য নিয়ম করা প্রয়োজন কেউ অ্যান্টিবায়োটিক কিনলে ফুল ডোজ কিনতে হবে, না হয় কিনবে না। অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্সের জন্য খুচরা বিক্রি একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত রবিবার রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলে আয়োজিত ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স সমস্যা প্রতিরোধ গড় সবাই মিলে’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তারা এ সব বলেন।
বক্তারা বলেন, মানুষের সঙ্গে সঙ্গে গবাদিপশুর ওপরেও অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়। এমনকি শাকসবজি, ফল বা মাছেও অ্যান্টিবায়োটিক জাতীয় ওষুধ ব্যবহার হচ্ছে। আমরা প্রতিদিন যেসব খাবার খাচ্ছি যেমন-মুরগির মাংস, গরু বা খাসির মাংস, দুধ ও দুগ্ধ জাতীয় খাবার, মাছ ও শাকসবজি তার অনেকগুলো থেকেই অ্যান্টিবায়োটিক শরীরে প্রবেশ করছে। এতে আমাদের শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট হচ্ছে।
হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মাঝে সংক্রমণ রোধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশিদ আলম বলেন, রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি সঠিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে না। অপারেশনের যন্ত্রপাতি সঠিকভাবে জীবাণু মুক্ত হয় না। এক জিনিস বারবার ব্যবহার করার ফলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়াচ্ছে। অনেক জীবাণু আছে যেটা গরম পান দিয়ে বয়েল করার পরও মারা যায় না। এ জীবাণু ও যাতে না থাকে সেটার জন্য ও ব্যবস্থা নিতে হবে।
তিনি বলেন, আমরা যেই স্ট্যান্ডার্ড মেনে হাসপাতালে রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছি তা সঠিক হচ্ছে কিনা সেটাও একটা বড় ইস্যু। আমরা যদি আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে তুলনা করি প্রধানত আমাদের অপারেশন থিয়েটার কিংবা বেড থেকে সংক্রমণ হওয়ার ই কথা না, এটি আন্তর্জাতিক ভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু সেটা আমাদের এখানে হচ্ছে। আমাদের লোকজন বেশি আমাদের সুযোগ-সুবিধা কম। প্রতিদিন আমাদের অপারেশন থিয়েটার গুলো থেকে জীবাণুর সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। আমরা থিয়েটারের নিয়মকানুন আমরা মানছি না। আমাদের ওয়ার্ড বয়, সিস্টার, লোকজন, রোগী এমনকি চিকিৎসকরাও মানছেন না। লোকজন সরাসরি ঢুকে যাচ্ছে গাউন পরছে না, বাইরের কাপড় নিয়ে ঢুকে যায়। এই বিষয়গুলো সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।
তিনি বলেন, যখন কোনো একটি মেডিকেলে কেন সংক্রমণ কমছে না, তা জানতে সেখান থেকে স্যাম্পল নিলাম। যেমন: হাসপাতালের বেড থেকে, অপারেশন থিয়েটার থেকে, সেখানকার টয়লেট থেকে এবং প্রয়োজনীয় জায়গা থেকে স্যাম্পল নিয়ে দেখা হলো কোন ধরনের ব্যাকটেরিয়াগুলো সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। তখন আমরা বুঝতে পারব এই হাসপাতালে রোগী আসলে আমরা প্রথমে কোন অ্যান্টিবায়োটিক দেব। এটি সব হাসপাতালের জন্য এক ধরনের হবে না। এটি হবে এক হাসপাতালের জন্য এক ধরনের পলিসি।
তিনি আরও বলেন, আমরা ময়লা ফেলার জন্য আলাদা বিন দিয়েছি। যেন সেখানে বর্জ্যগুলো সংগ্রহ করে ময়লাকে নিয়ে সব একই জায়গায় পেলে দেওয়া হয়। এতে সেখান থেকে পরিবেশ, মাটি, পানি এবং শস্য খেতেও জায়গায় জীবাণু সংক্রমিত হচ্ছে। এ ছাড়া হাসপাতালে ভর্তি রোগীরা একই বিছানায় ৩ জন ও থাকছে। এই রোগীরা যে টয়লেট ব্যবহার করছে কিংবা যেখানে থাকছে সেখান থেকে জীবাণুর সংক্রমিত হচ্ছে।
অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে আইন প্রয়োজন, সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী ও প্রয়োজন। এ ছাড়া দেখা যায় ফার্মাসিস্ট কোম্পানিরা ইনসেনটিভ তো ডাক্তারকে দিচ্ছে সঙ্গে কোয়াকদের ও দেওয়া হচ্ছে। আমরা ডাক্তারকে বন্ধ করলেও কোয়াককে তো আইনে আনা যাবে না। ওজন্য শুধু আইন দিয়েও ব্যবস্থা হবে না।
ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক মো. সালাউদ্দিন বলেন, অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সমন্বিত উদ্যোগী প্রয়োজন। সমন্বিত ভাবে কাজ করতে হবে। তবে আশার কথা হলো অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ে আইন হচ্ছে। জানুয়ারিতে পাশ হতে পারে। তখন আমরা এক ধাপ এগিয়ে যাব।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা (সিডিসি), ইউএসএআইডি’র এমট্যাপস প্রোগ্রাম এবং বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরাম যৌথভাবে আয়োজিত আলোচনা সভা আরও বক্তব্য রাখেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবির, বাংলাদেশ মাইক্রোবায়োলজি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এবং সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. সানিয়া তাহমিনা, রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার (সিডিসি) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. নাজমুল ইসলাম, আইইডিসিআরের চিফ সায়েন্টিফিক অফিসার অধ্যাপক ডা. জাকির হোসেন হাবিব, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. মো. আবু সুফিয়ান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক ড. সীতেশ চন্দ্র বাছার, ফ্লেমিং ফান্ড কান্ট্রি গ্র্যান্ট বাংলাদেশ এর টিম লিড অধ্যাপক নীতিশ দেবনাথ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার টেকনিক্যাল অফিসার মোহাম্মাদ রামজি ইসমাইলম, ইউএসএইআইডির এমট্যাপ্স প্রোগ্রামের কান্ট্রি প্রজেক্ট ডিরেক্টর (ভারপ্রাপ্ত) মো. আব্দুল্লাহ, এমট্যাপ্স প্রোগ্রামের টিম লিড ডা. এসএম জাহিদ প্রমুখ।