‘ছায়া মন্ত্রণালয়’ হিসেবে আখ্যায়িত হলেও সংসদীয় কমিটির সুপারিশের তেমন গুরুত্ব নেই। বৈঠকের পর বৈঠক হয়, মন্ত্রণালয়কে জনগুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ইস্যুতে সুপারিশ করা হয়, কিন্তু সেসবের বাস্তবায়ন খুব কম। একাদশ জাতীয় সংসদের চার বছরে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর সুপারিশের প্রায় ৯০ ভাগের বাস্তবায়ন নেই। দশম জাতীয় সংসদ এবং নবম জাতীয় সংসদের সংসদীয় কমিটিগুলোর সুপারিশের বাস্তবায়নের হার ৯০ শতাংশের নিচে।
সংসদ সচিবালয় ও বিভিন্ন সংসদীয় কমিটি সূত্র থেকে জানা গেছে, একাদশ জাতীয় সংসদে গত চার বছরে প্রায় ১ হাজার ৪০০ সুপারিশ করা হয়েছে বিভিন্ন ইস্যুতে। বাস্তবায়ন হয়েছে ১০ শতাংশেরও কম। ফলে সংসদীয় কমিটির বৈঠক নিয়মরক্ষার বৈঠকে পরিণত হয়েছে।
বিভিন্ন মহল থেকে এমন অভিযোগও রয়েছে, দেশে বর্তমানে অর্থনৈতিক সংকট প্রকট। রিজার্ভ কমে যাওয়া, আমদানি ব্যয় বাড়া, নিত্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতি থাকলেও গত মাসে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে ১০ সদস্যের কেউ এ বিষয়ে কথা বলেনি। তেমনি দ্রব্যমূল্য নিয়ে নিশ্চুপ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
কমিটির সূত্র থেকে জানা গেছে, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সর্বশেষ বৈঠকেও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো নিয়ে কোনো আলোচনা করেননি সদস্যরা। একইভাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র, কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রণালয় বৈঠক করলেও চলমান খাদ্যসংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বা অনেক দিন ধরে চলমান রোহিঙ্গা বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।
সংসদীয় কমিটিগুলোর বৈঠক খাতে প্রতি বছর ব্যয় হয় ৫ কোটি টাকারও বেশি। কমিটির সদস্যদের উপস্থিতি ভাতা, যাতায়াত ও আপ্যায়নভাতা সংসদীয় কমিটিগুলোর বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন বাবদ ব্যয় প্রভৃতি। আরও রয়েছে অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য বিদেশ সফরের ব্যয়।
সংসদীয় কমিটির সভাপতি ও সংসদ সদস্যরা মনে করেন, সংসদীয় কমিটির ক্ষমতা না থাকার কারণে মন্ত্রণালয় কমিটির সুপারিশকে আমলে নিচ্ছে না। তারা মনে করেন, মন্ত্রণালয়কে জবাবদিহির মধ্যে আনতে পারে এ সংসদীয় কমিটি। কিন্তু প্রশাসনের আগ্রহ না থাকায় কমিটির ক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে না।
একাদশ সংসদের সংসদীয় কমিটির অন্তত ১০ জন সভাপতি ও সংসদ সদস্যরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, সংসদীয় কমিটি হলো নখদন্তহীন। বৈঠকেই আলোচনা ও সুপারিশ, বাস্তবায়নের ক্ষমতা নেই।
একাধিক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, অনেক সময় এমপিরা মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নিয়ে সমালোচনা করে বিপাকে পড়েছেন। সরকারবিরোধী তকমা দেওয়া হয় তাদের। নানাদিক বিবেচনায় অনেকেই এখন আর কথাও বলতে চান না।
সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইনগত এবং সাংবিধানিক বাধ্যবাধ্যকতা না থাকায় সংসদীয় কমিটির সুপারিশগুলো আলোর মুখ দেখছে না। সংসদীয় কমিটি যতই বৈঠক করুক আর আলোচনা সমালোচনা করুক, এটি আসলে কাগুজে বাঘ। সংসদীয় কমিটির ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব আমি নিজেও দিয়েছিলাম। এটা খুব জরুরি।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা জানি যে স্থায়ী কমিটিগুলোকে বলা হয়ে থাকে ছায়া মন্ত্রিসভা বা ছায়া মন্ত্রণালয়। সংসদীয় কমিটির দায়িত্ব হলো মন্ত্রণালয় তার কাজ সঠিকভাবে করছে কি না তা দেখা। কিন্তু সংসদীয় কমিটির এখতিয়ার এতটাই সীমাবদ্ধ যে, তারা মন্ত্রণালয়ের কাজ না দেখে অন্য কাজে ব্যস্ত। মূল্যবৃদ্ধি, দেশের অর্থনীতির অবস্থা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি কোনো একটা জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংসদীয় কমিটিতে জোরালো আলোচনা হয়েছে শুনিনি। সংসদ যেমন অকার্যকর তেমনি সংসদীয় কমিটিগুলোও অকার্যকর। আমি দেখছি কমিটির সদস্যরা ব্যস্ত তদবিরবাণিজ্য আর বিদেশ ভ্রমণ প্রভৃতি কাজে। রাষ্ট্রের অর্থ অপচয় ছাড়া আর কিছুই হচ্ছে না। এটাও রাষ্ট্রের অর্থের এক ধরনের অপচয়।’
কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী সংসদীয় কমিটির প্রধান দায়িত্ব হলো, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাজের পর্যালোচনা, অনিয়ম ও গুরুতর অভিযোগ তদন্ত করা। বিল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ দেওয়া বা সুপারিশ করা।
সংসদীয় কমিটির জন্য ব্যয় : সংসদীয় কমিটির বৈঠক করা সংসদ সদস্যদের নিয়মিত কাজের অংশ। সদস্য (পারিতোষিক ও ভাতাদি) আদেশ ১৯৭৩ অনুযায়ী, সংসদীয় কমিটির বৈঠকের জন্য সদস্যরা ভাতা পেয়ে থাকেন। এ ভাতার মধ্যে রয়েছে যাতায়াত ভাতা, অবস্থানকালীন ভাতা। বৈঠকে অংশ নেওয়ার জন্য নিজের এলাকা থেকে রেল, বিমান, স্টিমার বা লঞ্চের সংক্ষিপ্ত রুটের প্রথম শ্রেণির ভাড়ার দেড়গুণ অর্থ পান সদস্যরা; সড়কপথে যাতায়াত হলে প্রতি কিলোমিটারের জন্য ১০ টাকা হারে মাইলেজ ভাতা পান; এর বাইরে সংসদে একজন সদস্য দায়িত্বরত পালনকালে (ঢাকায় থাকলে) প্রতিদিনের জন্য ৭৫০ টাকা হারে দৈনিক ভাতা এবং ৭৫ টাকা হারে যাতায়াত ভাতা পান। তবে কোনো সংসদ সদস্য সংসদীয় কমিটির বৈঠকে অংশ না নিলে তিনি এসব সুবিধা বা ভাতা পান না।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংসদীয় কমিটিগুলো শক্তিশালী হলে দুর্নীতি কমবে। আমার পরামর্শ হলো, প্রয়োজনে সংবিধান ও সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি সংশোধন করে সংসদীয় কমিটিগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে।’
অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘সুপারিশ করা ছাড়া আমাদের আর কিছু করার ক্ষমতা নেই। সংসদীয় কমিটির ক্ষমতা বাড়াতে হবে।’
তথ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি হাসানুল হক ইনু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সদস্যরা নিয়মিত বৈঠক করেন। এক বছর আগে করোনার কারণে কোনো কমিটির বৈঠক অনিয়মিত হলেও এখন সব কমিটিই নিয়মিত বৈঠক হচ্ছে। এখন বড় বিষয় হলো এখতিয়ার। কমিটির ক্ষমতা না থাকলে আমরা যতই বৈঠকে আলোচনা করি তার ফল সেই রকম হবে না।’ তিনি মনে করেন, সংসদের মতো কমিটির বৈঠক উন্মুক্ত করলে আলোচনা আরও ফলপ্রসূ হবে।