গত মাসের শেষে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান আসিম মুনির। সদ্যবিদায়ী সেনাপ্রধান কামার জাভেদ বাজওয়ার উত্তরসূরি আসিম চলমান রাজনৈতিক সংকট বাড়াবেন নাকি কমাবেন, এ নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। কঠোর সেনা কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত আসিমকে অভ্যন্তরীণ সমস্যার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংকটও মোকাবিলা করতে হবে। আসিমের গোয়েন্দাপ্রধান থেকে সেনাপ্রধান হওয়ার যাত্রা নিয়ে লিখেছেন তৃষা বড়ুয়া
নতুন সেনাপ্রধান
টানা কয়েক মাসের জল্পনা-কল্পনা ও অপেক্ষা শেষে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল সৈয়দ আসিম মুনিরকে নতুন সেনাপ্রধান হিসেবে মনোনয়ন দেন। তার এই মনোনয়ন অনুমোদন করেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি। গত নভেম্বরের শেষে আসিমের নিয়োগের মধ্য দিয়ে বিতর্কিত সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া যুগের অবসান হয়। নিয়োগ পাওয়ার পর আসিমকে নিয়ে পত্র-পত্রিকা থেকে শুরু করে সর্বত্র নানা ধরনের বিশ্লেষণ চলছে। পাকিস্তানের কোনো সেনাপ্রধানের নিয়োগ নিয়ে গত তিন দশকে এত আলাপ-আলোচনা হয়নি। এর প্রধান কারণ দেশটিতে চলমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা। এই অস্থিতিশীলতা থেকে মুক্ত নয় পাকিস্তানের সেনাবাহিনীও। দেশটির রাজনীতি সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত এই অভিযোগ বহু পুরনো। তার ওপর কয়েক মাস আগে ইমরান খানের প্রধানমন্ত্রীর পদ হারানো ও পরবর্তী সময়ে তার ওপর হত্যাচেষ্টার ঘটনা পাকিস্তানের প্রভাবশালী সেনাবাহিনীকে ফের আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত করেছে। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্সের (আইএসআই) প্রধান হিসেবে সবচেয়ে কম সময় ছিলেন আসিম। ২০১৮ সালের অক্টোবরে সেনাপ্রধান বাজওয়া তাকে আইএসআই প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন। আট মাস পরেই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের অনুরোধে আসিমকে ওই পদ থেকে সরিয়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল ফাইজ হামিদকে আইএসআই প্রধান করা হয়। ওই ঘটনার কয়েক মাস আগে ইমরান প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় তার অনুরোধ ফেলেনি পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। তবে আসিমকে কেন দায়িত্ব গ্রহণের আট মাস পরেই সরিয়ে দেওয়া হলো এ বিষয়ে পাকিস্তান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। তবে চলতি বছরের শুরুতে এ সংক্রান্ত একটি অডিও ফাঁস হলে সমালোচনার মুখে পড়েন ইমরান খান। ওই অডিওতে ইমরানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) সাবেক নেতা আলিম খান বলেন, ইমরানের স্ত্রী বুশরা বিবির দুর্নীতি আইএসআই প্রধান আসিম প্রকাশ করায় তাকে বরখাস্ত করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন সাবেক ওই প্রধানমন্ত্রী। যাই হোক, পরিস্থিতি বদলাতে খুব বেশি সময় নেয়নি। তিন বছরের মধ্যে পৃষ্ঠপোষক সেনাবাহিনীর সঙ্গে ইমরানের সম্পর্ক চিড় ধরে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে চলতি বছরের এপ্রিলে অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতাকে বিদায় জানাতে বাধ্য হন ইমরান। গদি যাওয়ার পরপরই তিনি যখন দেশের বিভিন্ন প্রদেশে রাজনৈতিক কর্মসূচি ডেকে ক্ষমতায় ফেরার চেষ্টা করছেন, ঠিক সে সময় ইমরানের বিরোধিতা সত্ত্বেও আসিম মুনিরকে সেনাপ্রধানের পদে বসালেন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। আসিমের এই পদ পাকিস্তানের সবচেয়ে শক্তিশালী পদ সেই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। দশকের পর দশক দেশটির রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেন জাদরেল সেনাপ্রধানরা। যে ব্যক্তিকে ২০১৮ সালে আইএসআই প্রধানের পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়, কয়েক বছর পর তাকে দেশের সর্বোচ্চ শক্তিশালী পদে দেখে ইমরান খুশি হবেন না, এটাই স্বাভাবিক। তাই তিনি ও তার দল পিটিআই আসিম যাতে সেনাপ্রধান না হন, সেজন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেন। তাদের চেষ্টায় পানি ঢেলে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ ও তার ভাই সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ বিদায়ী সেনাপ্রধান জেনারেল বাজওয়ার উত্তরসূরি হিসেবে আসিমকে বেছে নেন। আসিম সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তাকে অভিনন্দন না জানিয়ে এক বিবৃতিতে ইমরান বলেন, ‘আমরা আশা করি, পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীর নতুন নেতৃত্ব তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করবেন এবং একই সঙ্গে রাজনীতি থেকে দূরে থাকবেন।’
সেনাপ্রধানের যাত্রা
মংলায় অফিসার্স ট্রেনিং স্কুল প্রোগ্রামের মাধ্যমে প্রথম সেনাবাহিনীতে যোগ দেন আসিম মুনির। সেখানে তিনি সম্মানজনক সোর্ড অব অনার জেতেন। সেরা ক্যাডেটকে এই তলোয়ার দেওয়া হয়। ১৯৮৬ সালে পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল মুহাম্মদ জিয়াউল হকের আমলে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে নিয়োগের মধ্য দিয়ে সামরিক কর্মজীবন শুরু হয় আসিমের। এরপর গত কয়েক দশকে সেনাবাহিনীর বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরসহ দেশটির উত্তরাঞ্চলে জেনারেল বাজওয়ার নেতৃত্বে সেনাদের পরিচালনা করেন ব্রিগেডিয়ার আসিম। ২০১৬ সালের নভেম্বরে বাজওয়া সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর সেনাবাহিনীতে আসিমের উত্থান বেশ দ্রুত ঘটে। ২০১৭ সালে মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের ডিরেক্টর জেনারেল হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় তাকে। পরের বছরের সেপ্টেম্বরে তাকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল করা হয়। একই বছর সেনাপ্রধান জেনারেল বাজওয়া তাকে আইএসআইয়ের ডিরেক্টর জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি দেন। এরপর দুই বছরের জন্য গুজরানওয়ালা কর্পস কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ পান তিনি। জেনারেল বাজওয়ার উত্তরসূরি হিসেবে যেসব সেনা কর্মকর্তার নাম গত কয়েক মাসে শোনা যায়, তাদের মধ্যে ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাহিদ শামশাদ মির্জা, লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজহার আব্বাস, লেফটেন্যান্ট জেনারেল নোমান মেহমুদ, লেফটেন্যান্ট জেনারেল ফাইজ হামিদ ও লেফটেন্যান্ট জেনারেল আসিম মুনির। এদের মধ্যে আসিম সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তা। গত নভেম্বরের ২৭ তারিখে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হিসেবে তার চার বছরের মেয়াদ শেষ হয়। দুদিন পর ২৯ নভেম্বর আসিমকে জেনারেল করে তিন বছরের জন্য সেনাপ্রধান করা হয়। ইমরান ক্ষমতায় থাকলে সাবেক আইএসআই প্রধান ফাইজ হামিদের সেনাপ্রধান হওয়ার সম্ভাবনা ছিল বেশি।
নিবেদিতপ্রাণ কর্মকর্তা
পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম আসিম মুনিরকে সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রের স্বার্থরক্ষায় একজন নিবেদিতপ্রাণ ও বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন সেনা কর্মকর্তা হিসেবে অভিহিত করে। জনগণের সমালোচনা থেকে সেনাবাহিনী ও আইএসআইকে বাঁচাতে মুনির দ্রুত পদক্ষেপ নেন এমন নজির রয়েছে। ২০১৮ সালের জুলাই মাসে হাইকোর্টের বিচারক শওকত আজিজ সিদ্দিকি আইএসআইয়ের সমালোচনা করে বলেন, রায় নিজেদের পক্ষে নিতে বিচার প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করে আইএসআই। এর তিন মাস পর ওই বিচারকের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ এনে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের সুপারিশে তাকে বরখাস্ত করেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি। শওকত আজিজকে বরখাস্ত করার কয়েকদিন আগে আইএসআই প্রধান হয়েছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল আসিম মুনির। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক শুজা নওয়াজ তার দ্য ব্যাটল ফর পাকিস্তান বইয়ে বলেন, বিচারকাজে লেফটেন্যান্ট জেনারেল আসিমের হস্তক্ষেপের উৎকৃষ্ট উদাহরণ সুপ্রিম কোর্টের ওই সুপারিশ। বইটিতে শুজা নওয়াজ আরও বলেন, ইসলামি ভাবধারায় বিশ্বাসী একজন কঠোর সেনা কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিতি আছে আসিমের। এছাড়া তাকে হাফেজে কোরআন নামেও ডাকা হয় কারণ সৌদি আরবে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে কর্মরত অবস্থায় পবিত্র কোরআন মুখস্থ করেছিলেন তিনি।
সেনাপ্রধানের চ্যালেঞ্জ
পাকিস্তানের নতুন সেনাপ্রধান আসিম মুনির বেশ কয়েকটি জটিল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ছয় বছর ধরে তার পূর্বসূরি সাবেক সেনাপ্রধান বাজওয়া দেশটির রাজনীতিতে অতিমাত্রায় নাক গলিয়ে সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি যে পরিমাণ ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন, তা কাটিয়ে ওঠা হবে আসিমের প্রথম কাজ; যদিও তা তার পক্ষে সম্ভব নয় কারণ তিনি সিস্টেমেরই অংশ। সেনাপ্রধান হওয়ার পর বাজওয়ার পরিবার বিপুল সম্পদের মালিক হন এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে বাজওয়াসহ গোটা সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ড নিয়ে গত মাসের শেষে বিদায়ের সময় বাজওয়াকে ‘ভুল’ স্বীকার করতে দেখা যায়। তিনি বলেন, পাকিস্তানের রাজনীতিতে বিভিন্ন সময়ে সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করে এবং স্বাভাবিকভাবেই এ নিয়ে জনগণ বিরূপ মন্তব্য করে। সেনাবাহিনীর এই হস্তক্ষেপ কখনোই সাংবিধানিক ছিল না। তিনি দাবি করেন, গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে অনেক আলাপ-আলোচনার পর সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব সিদ্ধান্ত নেয়, তারা দেশের রাজনৈতিক ইস্যুতে মাথা ঘামাবে না। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই পাকিস্তান সেনাবাহিনী কাজ করে, চাইলে রাজনৈতিক দলগুলো তা পর্যালোচনা করে দেখতে পারে। বিদায়কালে বাজওয়ার ‘ভুল’ স্বীকারে স্বভাবতই খুব কম মানুষই মুগ্ধ হয়। পাকিস্তানের রাজনীতিতে দেশটির সেনাবাহিনী নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করার নীতি নিয়েছে, বাজওয়ার এই দাবি বেশির ভাগ মানুষের কাছে আষাঢ়ে গল্প ছাড়া আর কিছু মনে হয়নি। বাজওয়ার উত্তরসূরিরা রাজনীতি থেকে দূরে থাকবেন, এটি যে পাকিস্তানের প্রেক্ষাপটে সম্ভব নয়, তা কারও অজানা নয়। রাষ্ট্র শাসনব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে ও প্রচুর সুযোগ-সুবিধা পেতে পাকিস্তান আর্মির পক্ষে নিরপেক্ষ থাকা কখনোই সম্ভব নয়।
ইমরান খানকে সামলানো নতুন সেনাপ্রধানের আরেক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। ইমরান খানের ক্ষমতা চলে যাওয়ার পর দেশটির সামরিক ও বেসামরিক মহল ভেবেছিল, তিনি আর রাজনীতির মাঠে থাকতে পারবেন না। কিন্তু আদতে তা ঘটেনি, বরং গদিচ্যুত হওয়ার পর ইমরানের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। ক্ষমতাচ্যুতির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও সেনাবাহিনীকে দায়ী করে ক্ষুব্ধ মানুষের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেন ইমরান। আগাম নির্বাচনের দাবিতে লংমার্চসহ একের পর এক রাজনৈতিক কর্মসূচির ডাক দেন তিনি। গত নভেম্বরের শুরুতে এমনই এক কর্মসূচি চলাকালে তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। প্রতিবাদে পাকিস্তানের বিভিন্ন শহর প্রায় অচল করে দেয় পিটিআইয়ের সমর্থকরা। আন্তর্জাতিক নেতারাও ওই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান। হত্যাচেষ্টার ঘটনা দেশে-বিদেশে ইমরানের জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়ে দেয়। হামলার জন্য সরাসরি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রানা সানাউল্লাহ ও আইএসআইয়ের শীর্ষ পর্যায়ের এক কর্মকর্তাকে দায়ী করেন ইমরান। অবশ্য হামলার কিছুদিন পর যুক্তরাষ্ট্রের বিষয়ে অনড় অবস্থান থেকে তাকে সরে আসতে দেখা যায়। ক্ষমতা হারানোর জন্য কয়েক মাস আগে তিনি মার্কিন প্রশাসনকে দায়ী করলেও হত্যাচেষ্টার পর বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে, তা তিনি আর মনে করেন না। ইমরানের প্রতি সহানুভূতি কেবল সাধারণ জনগণ ও আন্তর্জাতিক মহলে বাড়ছে তা নয়, পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর ভেতরেও তাকে ঘিরে ফের আলোচনা চলছে, যেমনটা ইমরানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে হয়েছিল। এই পরিপ্রেক্ষিতে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব নেওয়ার পর আসিম মুনিরের উচিত হবে ইমরানকে না ঘাঁটানো, কোনো প্রতিশোধ না নেওয়া এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভাষ্য, রাজনীতি থেকে যতটা পারা যায় সেনাবাহিনীকে দূরে রাখা উচিত আসিম মুনিরের। বাজওয়ার পথ অনুসরণ না করে এ মুহূর্তে তিনি কেবল বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সংলাপের আয়োজন করতে পারেন, এর বেশি কিছু নয়। দেশে বিদ্যমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর হাতে ছেড়ে দিয়ে তার উচিত হবে সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে মোক্ষম সময়ের জন্য অপেক্ষা করা।
তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানসহ (টিটিপি) বিভিন্ন সশস্ত্র সংগঠনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডও আসিম মুনিরের দুশ্চিন্তার আরেক কারণ। বেলুচিস্তান ও খাইবার-পাখতুনখোয়ায় তারা তাদের অবস্থান আরও মজুবত করেছে বলে সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়। এসব প্রতিবেদন শুরুতে পাকিস্তান কর্র্তৃপক্ষ অস্বীকার করলেও পরে জনগণের চাপে স্বীকার করতে বাধ্য হয়। এই সমস্যার সহজ সমাধান আসিম মুনিরের হাতে নেই। পাকিস্তান সরকার আশা করেছিল, পার্শ্ববর্তী দেশ আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতা দখল করলে তাদের সুবিধা হবে; কিন্তু তা হয়নি। আফগানিস্তানে অবস্থান করা টিটিপির সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে তলেবান সরকার, বরং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান চায় তারা। এছাড়া আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যকার ২ হাজার ৬৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক স্থল সীমান্ত ডুরান্ড লাইনের স্বীকৃতি দিতেও রাজি নয় তালেবান। ওই সীমান্তে পাকিস্তানের কাঁটাতারের বেড়ার বিরোধিতা করছে সশস্ত্র সংগঠনটি। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক আরও মজবুত করার মতো কঠিন কাজও করতে হবে আসিমকে। তার পূর্বসূরি বাজওয়া সেনাপ্রধান-জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এই সম্পর্ক অটুট রাখেন। ফলে মার্কিন প্রশাসনের কাছে থেকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পায় পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি চীনের সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদার করতে হবে আসিমকে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এই দুই পরাশক্তির সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারসাম্য রাখা সহজ কাজ নয়। ইমরান ভারসাম্য রাখতে পারেননি। চীনের দিকে ঝুঁকে ছিলেন। এ কারণে ক্ষমতার মসনদেও তার বেশিদিন থাকা হয়নি। নতুন সেনাপ্রধানের কাছে অনেক পাকিস্তানি আশা করছেন, তিনি যেন সাবেক সেনাপ্রধান বাজওয়ার মতো বিতর্কিত পদক্ষেপ না নিয়ে সেনাবাহিনীকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখেন। তবে এই আশা পূরণ করা যে পকিস্তানের জেনারেলদের পক্ষে সম্ভব নয়, তা দেশটির ইতিহাসের দিকে তাকালে স্পষ্ট হয়।