সংস্কৃতি ও রাজনীতির নতুন নির্মাণ

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে তৈরি হওয়া চেতনার হাত ধরেই সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতা লাভ করেছে। সে হিসেবে ৫১ বছর অতিক্রম করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫২-তে পা দেওয়ার ঘটনাটির বহুমাত্রিক তাৎপর্য রয়েছে। বিজয় দিবসের এই উদযাপন গৌরবের ও আনন্দের। এখন বর্তমানকে মূল্যায়ন করে সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ার শপথ নেওয়ার সময়। এজন্য ইতিহাসের দিকে ফিরে দেখা দরকার। বিস্মৃতির বিরুদ্ধে স্মৃতিকে জাগরূক রাখার লড়াই করতে হয়। কেননা, অতীত আর বর্তমানের মূল্যায়ন ছাড়া সামনে এগোনো যায় না। স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে রুখে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। দীর্ঘ সামরিক শাসনের জোয়াল চাপিয়ে দিয়ে বাংলাদেশকে স্বাধীনতার মূল নীতি থেকে বিচ্যুত করা হয়েছিল। জনগণের লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলেও তা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে বারবার। এ পরিস্থিতিতে ভাষা আন্দোলন জারিত যে চেতনা মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল তার খোঁজ নেওয়াটা এখন জরুরি।

বিজয়ের ৫১ বছর পাড়ি দিয়ে আজকের বাংলাদেশকে মূল্যায়ন করতে হবে বহুমাত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে। সদ্যস্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ আর আজকের বাংলাদেশের মধ্যে যোজন যোজন ফারাক।  যুদ্ধবিধ্বস্ত ‘তলাবিহীন ঝুড়ির’ দেশ থেকে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ প্রবৃদ্ধির অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি শিল্পায়ন, গৃহায়ন, নগরায়ণ, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, দারিদ্র্যবিমোচন, বিদ্যুতায়ন, গ্রামীণ অবকাঠামো প্রভৃতি ক্ষেত্রে যেমন বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে তেমনি শিক্ষা, শিশুমৃত্যু, মাতৃমৃত্যু, গড় আয়ু, ইপিআই, নারীর স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ নারীর ক্ষমতায়নে অগ্রগতির কথা এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে অগ্রগতি অভাবনীয়। বিগত দশকগুলোতে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক নানা টানাপড়েন সত্ত্বেও দেশের অর্থনীতি লাগাতার সমৃদ্ধির পথে এগিয়েছে। যমুনা সেতু, হাইওয়ে, ফ্লাইওভার, মেট্রো রেল এবং সর্বশেষ পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেল, গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নতির অগ্রগতি দৃশ্যমান। যদিও লাগামহীন দুর্নীতি, লুটপাট ও ঋণখেলাপিদের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। করোনা মহামারীকালে দেশের স্বাস্থ্য খাতের করুণ দশা প্রকট ভাবে ধরা দেয়। মনে রাখতে হবে জাতি গঠনে স্থাস্থ্য খাতের গুরুত্ব অপরিসীম। একদিকে শতভাগ স্বাক্ষরতার দাবি, অন্যদিকে শিক্ষার নিম্নমুখী মান। এটা মনে রাখা জরুরি যে, অর্থনীতি মূল চালিকাশক্তি হলেও, উন্নয়ন টেকসই করতে হলে মানবিক প্রগতি অর্জনের কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে কাক্সিক্ষত মান অর্জন করা ছাড়া যেমন সামাজিক অগ্রগতি ও মানবিক প্রগতি অর্জন করা সম্ভব নয়, তেমনি সমাজ ও রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতিষ্ঠা ছাড়াও সেটা সম্ভব নয়। আজকের তরুণ প্রজন্ম যদি একটা অবরুদ্ধ সমাজে বেড়ে ওঠে, স্বাধীন মতপ্রকাশ, ভোটাধিকার ও সৃষ্টিশীল চিন্তাচেতনার বিকাশ ঘটিয়ে নিজেদের মেধা ও সৃজনশীলতাকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ না পায় তাহলে তারা আগামীর বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য যোগ্য উত্তরসূরি হয়ে উঠতে পারবে না। সমাজ-সংস্কৃতির অঙ্গন থেকে শুরু করে রাজনীতির মাঠ পর্যন্ত সর্বত্রই যথাযথ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এমন মানবিক প্রগতি অর্জনের অত্যাবশ্যকীয় পূর্বশর্ত।

রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পুরো চর্চায় ফিরিয়ে আনতে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি রাজনীতির মাঠে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। পরমতসহিষ্ণুতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশ ছাড়া সমাজের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক মান সামনে এগোয় না। সাংস্কৃতিক জাগরণের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক চৈতন্যের বিকাশের পথ ধরেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা এসেছে। আজ আবার ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সত্যিকার বাস্তবায়ন তাই খুব জরুরি। আমাদের ভাবতে হবে যে, আগামী বিশ্বে বাংলাদেশের পরিচয় কী হবে? প্রাচীন সভ্যতায় মসলিন ও রেশমি বস্ত্রের জন্য বাংলা বিশ্বে এক শিল্পসমৃদ্ধ জাতি হিসেবে পরিচিত ছিল। মধ্যযুগের বাংলা ছিল হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম সাধকদের মানবিক আধ্যাত্মিকতা বিকাশের তীর্থস্থান। আধুনিকতার সূচনালগ্নেই বাংলা হয়ে উঠেছিল জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং শিল্প-সাহিত্যে ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে অগ্রণী। উপনিবেশবিরোধী লড়াই থেকে ভাষা আন্দোলন এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালি যেমন তার আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছে, তেমনি তার ওপর অনেক দায়িত্বও বর্তেছে। বাংলাদেশ ও বাঙালিকে এখন আগামীর দায়িত্ব পালনের জন্য প্রস্তুত হতে হবে। সাংস্কৃতিক নবজাগরণের মধ্য দিয়ে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের সংকট থেকে মুক্ত হয়ে জাতি-ধর্ম-বর্ণ পরিচয়ের ঊর্ধ্বে ওঠার নতুন রাজনীতির পথে হাঁটতে হবে। একুশ শতকের এই দ্রুত পরিবর্তনশীল যুগে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে তাল মেলাতে হলে চলমান রাজনীতির নতুন বিনির্মাণ ছাড়া সামনে এগুনোর পথ নেই। বিশে^র সব মানুষকে বাংলাদেশের বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা।