ইয়ারবা মেট খেয়েই কি বদলে যায় টিম আর্জেন্টিনা?

সৌদি আরবের কাছে ২-১ গোলে হার দিয়ে শুরু হয়েছিল আর্জেন্টিনার এবারের বিশ্বকাপ। কিন্তু এরপরই যেন রাতারাতি পাল্টে যায় মেসিবাহিনী। একের পর এক জয় তুলে নিয়ে ফাইনাল নিশ্চিত করে। এবার তাদের মধ্যে দেখা যায় এক নজিরবিহীন টিম স্পিরিট!

কিন্তু আর্জেন্টিনার এমন রাতারাতি বদলে যাওয়ার পেছনে কী রহস্য রয়েছে? নিউইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে সেই রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা করা হয়েছে। আর্জেন্টিনার এমন বদলে যাওয়ার পেছনে ভেষজ পানীয়ের ভূমিকা থাকতে পারে বলে ওই রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে। ওই ভেষজ পানীয়ের নাম ইয়ারবা মেট।

দক্ষিণ আমেরিকার একটি বিশেষ গাছ থেকে সংগ্রহ করা হয় ঝাঁঝালো এবং তোতো স্বাদের ওই ভেষজ। প্যারাগুয়ে, উরুগুয়ে, ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনায় খুবই জনপ্রিয় এই ইয়ারবা মেট। এই অঞ্চলের বিশ্বমানের বেশ কিছু খেলোয়াড় এই পানীয় পান করেন। তাদের মাধ্যমে এটি বিশ্বজুড়েও ছড়িয়ে পড়েছে।

কাতারে ২৬ পাউন্ড ইয়ারবা মেট নিয়ে এসেছিল ব্রাজিল। উরুগুয়ে নিয়ে এসেছিল প্রায় ৫৩০ পাউন্ড ইয়ারবা মেট। কিন্তু আর্জেন্টিনা তাদের প্রায় ৭৫ জন খেলোয়াড়, কোচ, ট্রেইনার ও অন্যদের জন্য ১ হাজার ১০০ পাউন্ড ইয়ারবা মেট নিয়ে এসেছে।

আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার আলেক্সিস ম্যাক আলিস্টার বলেন, এই পানীয়তে ক্যাফেইন রয়েছে। এই পানীয়কে স্ট্রং গ্রিন চায়ের সঙ্গে তুলনা করে কেউ কেউ। তবে আলিস্টারের ভাষায়, সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করতেই অন্য যেকোনো পানীয়ের চেয়ে এটি বেশি পান করেন তিনি।

আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের একজন মুখপাত্র নিকোলাস নোভেল্লো বলেছেন, খেলোয়াড়দের রুচির সঙ্গে তাল মেলাতে ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের ইয়ারবা মেট নিয়ে এসেছেন তারা। পর্যবেক্ষকরা বলছে, দলের প্রায় সবাই, এমনকি আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসিও এই ইয়ারবা মেট পান করছেন।

আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ের টিমে এই পানীয় পানের দৃশ্য হরহামেশাই দেখা যায়। এমনকি চলতি ফুটবল বিশ্বকাপে উরুগুয়ে জাতীয় দলের অফিসিয়াল মাস্কট ছিল এই পানীয়, যা স্প্যানিশ ভাষায় বোটিজা। মাস্কটের একটি বড় আউটফিটও কাতারে দেখা যায়।

মেজর লিগ সকারে অস্টিন এফসি’র হয়ে খেলা সেবাস্টিয়ান দ্রুইসসি বলেন, যখন আমি আর্জেন্টিনায় খেলেছি, তখন একজন পুষ্টিবিদ আমাকে বলেছেন ইয়ারবা মেট আমাকে সতেজ রাখবে। যুব পর্যায়ে আর্জেন্টিনার হয়ে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন দ্রুইসসি। খেলেছেন আর্জেন্টিনার জনপ্রিয় ক্লাব রিভার প্লেটের হয়েও। তিনি বলেন, আমি জানি না, কিন্তু এটা আমাদের জন্য পানির মতো। খেলার আগে লকার রুমে সবাই, সবসময় এটি পান করে। এটি পানের জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। আর্জেন্টিনায় আমরা বলি, এই পানীয় বন্ধুত্ব বাড়াতে সাহায্য করে।

আর্জেন্টিনার ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব ইয়ারবা মেটের প্রেসিডেন্ট হুয়ান হোসে এসজিকোস্কি গণমাধ্যমকে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, আপনি একবার এই পানীয় পান করা শুরু করলে আর থামবেন না। এটি প্রথার চেয়ে বেশি। যখন কেউ আমাদের বাসায় আসে, আমরা তাদের বলি, ‘আপনার মেট পান করা উচিৎ’। এটি সামাজিক রীতি এবং আপনার স্বাস্থ্যের জন্যও ভালো।

এসজিকোস্কি বলেন, আগে এই অঞ্চলের আদিবাসীরা ইয়ারবা মেট পান করত। তবে জেসুইট মিশনারীরা এটির ব্যাপক প্রচলন করে। তিনি দাবি করেন, কিছু গবেষণায় দেখা গেছে এই পানীয় স্বাস্থ্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। দক্ষিণ আমেরিকার খেলোয়াড় যেমন- আর্জেন্টিনার মেসি, উরুগুয়ের লুইস সুয়ারেজ ও ব্রাজিলের নেইমার, ক্লাব পর্যায়ে খেলতে গিয়ে অন্যদের এই পানীয় পানের ব্যাপারে আগ্রহী করে তুলেছেন।

ফ্রান্সের জাতীয় দলের অন্যতম খেলোয়াড় অ্যান্তোনি গ্রিজম্যানও এই পানীয় পানের অভ্যাস গড়ে তুলেছেন। অ্যাতলেতিকো মাদ্রিদের হয়ে খেলতে গিয়ে উরুগুয়ের খেলোয়াড় ক্রিস্টিয়ান রদ্রিগুয়েজ ও হোসে মারিয়া গিমেনেজের সঙ্গে বন্ধুত্বের কারণেই ইয়ারবা মেট পান শুরু করেন গ্রিজম্যান। ২০১৮ সালে আরেক ফ্রেঞ্চ স্টার পল পগবা বলেছিলেন, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে তার আর্জেন্টাইন টিমমেট মারকোস রোহো তাকে ইয়ারবা মেট দিয়েছিল। এরপর তিনি ইয়ারবা মেট পান শুরু করেন।

আর্জেন্টিনার একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে তিনি বলেছিলেন, এটি দারুণ। আমার খুব পছন্দ হয়েছে। এসজিকোস্কি বলেছেন, ফুটবল খেলোয়াড়রাই বিশ্বে ইয়ারবা মেটকে পরিচিত করেছেন। পোপ ফ্রান্সিস, যিনি একজন আর্জেন্টাইন, তিনিও ইয়ারবা মেট পান করেন বলে জানান এসজিকোস্কি।

তবে সবাই কিন্তু এই পানীয় পছন্দ করেন না। এটিকে কেউ কেউ তেতো স্বাদের বলেও মন্তব্য করেছেন। তাই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হচ্ছে, শুরুতে কিছুটা মিষ্টি জাতীয় ইয়ারবা মেট পান করা উচিৎ। যুক্তরাষ্ট্র ফুটবল টিমের একজন ডিফেন্ডার ওয়াকার জিমারম্যান বলেছেন, এফসি ডালাসে খেলতে গিয়ে আমার দুই আর্জেন্টাইন টিমমেট ম্যাক্সিমিলিয়ানো উরুত্তি ও মাউরো দিয়াজের মাধ্যমে ইয়ারবা মেটের স্বাদ পেয়েছিলাম। কিন্তু আমার মনে হয় না, আমি কখনও এটি পান করব।

আর্জেন্টিনা দলের সাবেক একজন ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো লোপেজ বলেন, আমি পর্তুগালে খেলার সময় স্ট্র দিয়ে ইয়ারবা মেট পানের বিষয়টি অনেকেই সহজভাবে নিতে পারেননি। তিনি বলেন, অনেক বার এমন হয়েছে। আমি চার বছর লিসবনে ছিলাম। আমি একটি প্লাজায় গিয়েছিলাম মেট পান করতে এবং মানুষজন আমার দিকে অদ্ভুতভাবে তাকিয়েছে, যেন আমি মাদক বা অন্য কিছু গ্রহণ করছি।

মেক্সিকোর সাবেক স্ট্রাইকার লুইস হার্নান্দেজ বলেছেন, আমি আর্জেন্টিনার বোকা জুনিয়র্সে এক সিজন কাটিয়েছি। কিন্তু এই পানীয়তে আমি অভ্যস্ত হতে পারিনি। টিমের অন্য সদস্যরা এই পানীয় পান করলেও আমিই কেবল ব্যতিক্রম ছিলাম।

তিনি বলেন, আমি এক কাপ মেটের চেয়ে কফি পান করাটাই বেশি পছন্দ করি। তারা বলে এই পানীয় তাদের সাহায্য করে? কিন্তু মেট আপনাকে গোল করতে সাহায্য করবে না।