শ্রোতারা যেমন ওয়াজ শুনতে চায়

গ্রামাঞ্চল থেকে শুরু করে শহরে-বন্দরে অনুষ্ঠিত ওয়াজ মাহফিলে সন্তানদের যেতে বাবা-মা কিংবা অন্য কোনো মুরব্বির পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞা আসে না, বরং উৎসাহ দেওয়া হয়। এখন ওয়াজ মাহফিলের পরিমাণ বেড়েছে। কিন্তু অতীতে দেখা গেছে, বাড়ির মুরব্বি ও মা-খালারা উৎসাহের সঙ্গে সন্তানদের ওয়াজে পাঠাতেন। ওয়াজ থেকে ফেরার পর মা-খালা-চাচি-মামি-নানি-দাদি সবাইকে শুনাতে হতো কোন বক্তা কী বলেছেন। তাদের কাছে ওয়াজ মাহফিল ছিল ইসলাম শেখার মাধ্যম বিশেষ।

সত্যিকারের ওয়াজের মাধ্যমে এখনো ইসলাম সম্পর্কে জানার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। যদিও অনেক বক্তা লম্বা সময় ধরে ওয়াজ করেন। কিন্তু এই সুদীর্ঘ ওয়াজে না উচ্চারিত হয় কোরআনের কোনো আয়াত, না কোনো হাদিস। তারা পুরো সময়টা নানাবিধ কিস্সা-কাহিনীর পাশাপাশি বিরোধী পক্ষকে ধোলাই করেন। তবে এর ব্যতিক্রমও আছে। অনেক বক্তা ওয়াজকে ক্লাসে পরিণত করেছেন। সুন্দর-সাবলীল বাংলা বলার পাশাপাশি ইংরেজি উপমা, উর্দু-ফারসি, আরবি ও বাংলা কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে ওয়াজকে করেছেন নান্দনিক। ওয়াজে কিছুক্ষণ পর পর শ্রোতাদের কাছ থেকে ‘ফিডব্যাক’ নিয়ে শ্রোতাদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন।

কিছু বক্তা বিষয়বস্তুর সঙ্গে রেফারেন্সসহ হাদিস বলে শ্রোতাদের কাছে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। এর মাধ্যমে বক্তব্যের প্রামাণ্যতা যেমন বেড়েছে, ঘটেছে সর্বসাধারণের সঙ্গে পবিত্র হাদিস শরিফের সংযোগ। ধর্মপ্রাণ মানুষের জন্য বিষয়টির গুরুত্ব অনস্বীকার্য। আবার কোনো কোনো বক্তা সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম ধারায় কথা বলেন। বক্তব্য প্রদান অপেক্ষা প্রশ্নের উত্তর প্রদানে বেশি সময় ব্যয় করেন। এর মাধ্যমে মানুষ প্রভূত উপকৃত হচ্ছে। তবে এক্ষেত্রে অনুরোধ থাকবে, বিতর্কিত মাসয়ালাগুলো এড়িয়ে যাওয়ার, নচেৎ ফিতনা বাড়বে। কিছু বক্তা আছেন, তারা উম্মাহর জন্য জরুরি বিষয়গুলো অত্যন্ত চাঁছাছোলা ভাষায় বলে থাকেন। উচ্চ আওয়াজের দরুণ তারা বেশ পরিচিত। যুবক শ্রোতাদের কাছে তারা দারুণভাবে আদৃত।

প্রযুক্তির কল্যাণে বর্তমানে ওয়াজ শোনা অনেকটা সহজ হয়ে গেছে। ইদানীং এমন কোনো ওয়াজ এদেশে হয় না, যেটা ২-৪ দিন পরে কোনো না কোনো মাধ্যমে ইন্টারনেটে না আসে। ওয়াজের ব্যাপারে ইন্টারনেটের সবচেয়ে বড় অবদান ৩টি। ১. কর্মব্যস্ততার কারণে সশরীরে ওয়াজের মাঠে যাওয়ার সময় বের করা না গেলেও, প্রিয় বক্তার ওয়াজ শোনার জন্য দেড় দু’-ঘণ্টা সময় মানুষ ঠিকই বের করে নেয়। ২. এক সময় ওয়াজ না শুনতে পারার আফসোস করতেন নারীরা। ইন্টারনেটের কল্যাণে এখন আর আফসোস করতে হয় না। তারাও এখন ইচ্ছামতো বয়ান শুনতে পারেন। ৩. ভাষা জানলে ভিনদেশের বক্তাদের ওয়াজও শোনা যায়। এর দ্বারা মনে জানার ক্ষুধা কমে, নতুন নতুন বিষয়ে জ্ঞানার্জনের সুযোগ মেলে।

ওয়াজের মাধ্যমে জ্ঞানার্জন আর জানার ক্ষুধা কমানোর ক্ষেত্রে বর্তমানের বক্তারা কতটুকু ভূমিকা রাখছেন, সেটা তর্ক সাপেক্ষ বিষয়। তবে আলোচনা হতে পারে, বর্তমান যুব সমাজ কেমন ওয়াজ শুনতে চায়, সে বিষয় নিয়ে। মনে হয়, এটাই বেশি কার্যকর বিষয়। কারণ অধিকাংশ বক্তা এ বিষয়ে খুব একটা নজর দেন, সেটা একবাক্যে বলার সুযোগ নেই। সমালোচকরা বলেন, এখনকার বক্তারা শ্রোতাদের রুচি এবং চাহিদার প্রতি খেয়াল করেন না, ফলে তরুণ সমাজ ধীরে ধীরে ওয়াজ মাহফিলবিমুখ

হয়ে যাচ্ছেন।

মনে রাখতে হবে, বর্তমান প্রজন্ম প্রচুর ঘাঁটাঘাঁটি করে, সেটা খেলাধুলা-রাজনীতি-গানবাজনা হোক কিংবা দ্বীনি বিষয় হোক। এর ফলে ওয়াজ শোনার ব্যাপারে তাদের একটা ‘কমন’ রুচি তৈরি হয়ে গেছে। ওই রুচির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো- ১. ওয়াজের নামে তারা বানোয়াট গল্প শুনতে চায় না। ২. তারা জাল হাদিস শুনতে বিন্দুমাত্র পছন্দ করে না। যখন তাদের সামনে কোনো হাদিস বর্ণনা করা হয়, তারা ইন্টারনেটে অনুসন্ধান করে। যদি দেখে হাদিসটি ‘দুর্বল’ তবে বক্তার প্রতি শ্রদ্ধা শেষ হয়ে যায়। আর যদি দেখে, হাদিসটি ‘জাল (মাওযু)’ তবে তো আর কথা নেই। বক্তাকে যতভাবে পচানো যায়, তার সর্বাত্মক চেষ্টা সে করে। ৩. যেকোনো ব্যাপারে ‘কোরআনের সরাসরি ভাষ্য’ শুনতে তারা খুব আগ্রহী। ৪. ভাটিয়ালি সুর এই প্রজন্মের কাছে বিরক্তিকর। ৫. উর্দু-ফার্সি পঙ্ক্তির তুলনায় বাংলা কবিতা এই প্রজন্মের পছন্দ। ৬. কারও বিরুদ্ধে গালিগালাজ বর্তমান প্রজন্মের কাছে ভীষণ অপছন্দনীয়। ৭. ফরজ-ওয়াজিব নিদেনপক্ষে সুন্নতে-মোয়াক্কাদা নয়, এমন সব মাসয়ালা নিয়ে আলোচনা বর্তমান প্রজন্মের কাছে চক্ষুশূল।

বক্তারা যদি বর্তমান যুগের শ্রোতাদের মন-মেধা-মানসিকতাকে ভালোভাবে উপলব্ধি করতে না পারেন, তবে তারা শ্রোতা হারিয়ে স্বাভাবিকভাবেই অপাঙ্ক্তেয় হয়ে পড়বেন। মানুষ ময়দানে হাজির হওয়ার চেয়ে নেটে বিদেশি বক্তাদের শুনতে বেশি আগ্রহবোধ করবে। ফলে ওয়াজ-মাহফিল ক্রমান্বয়ে কমে যাবে। এর ফলে সামাজিক অধঃপতন বাড়তে থাকবে।

আমরা চাই ওয়াজ-মাহফিলের ধারার যুগ যুগ ধরে চালু থাকুক। সমাজ পরিবর্তনের অন্যতম হাতিয়ার ওয়াজ, যদি সেটা উদ্দেশ্যমূলক হয়ে থাকে। হাজারো আইন-আদালত-পুলিশ যে লোকটিকে পরিবর্তন করে না, শুধু একটিমাত্র ওয়াজ দিল দিয়ে শুনার কারণে ওই লোক আপাদমস্তক নিজকে বদলে ফেলেছে।

এমন ঘটনা কেবল একটি বা দুটি নয়, হাজার হাজার। দিলটাকে আখেরাতমুখী করার জন্য দিনান্তের কর্মশেষে কিছুক্ষণ ওয়াজ শ্রবণ করা বাংলাদেশের মুসলমানদের আবহমান কালের চরিত্র। এটা যদি হারিয়ে কিংবা বন্ধ হয়ে যায়, তবে আখেরাতমুখী হওয়ার এই সহজ সুযোগ নষ্ট হয়ে যাবে। আর আখেরাতের সফলতাই একজন মুমিনের জিন্দেগির প্রকৃত সাফল্য।