আওয়ামী লীগের ২২তম জাতীয় সম্মেলন আজ

সবার দৃষ্টি সোহরাওয়ার্দীতে

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২২তম জাতীয় সম্মেলনের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন। শনিবার (২৪ ডিসেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টায় ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শান্তির প্রতীক পায়রা উড়িয়ে সম্মেলনের উদ্বোধন করবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এবারের সম্মেলনের স্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে ‘উন্নয়ন অভিযাত্রায় দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের উন্নত, সমৃদ্ধ ও স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়’।

করোনা মহামারি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার কারণে এবারের সম্মেলন অনেকটাই সাদামাটাভাবে আয়োজন করেছে দলটি। তবে সম্মেলন যতই সাদামাটা হোক না কেন, নেতাকর্মীদের মধ্যে বইছে উৎসবের আমেজ।

এবারের সম্মেলনে বিএনপির আন্দোলন ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নেতা নির্বাচনই গুরুত্বপূর্ণ বলে দাবি করছেন আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা। তারা বলছেন, ক্ষমতায় থেকে এর আগের সম্মেলনগুলো একরকম চিন্তা করা হলেও এবার দক্ষ-যোগ্য ও কৌশলী নেতা নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। আন্তর্জাতিক বিশ্বের রাজনীতি-অর্থনীতি সম্পর্কে ধারণা থাকা নেতার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

কেন্দ্রীয় নেতারা বলেন, একদিকে বিশ্বের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, অন্যদিকে কয়েকটি দেশ আওয়ামী লীগ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা নিয়ে বসে আছে। তাদের সঙ্গে টেবিলের আলোচনায় পারদর্শী নেতা নির্বাচন করতে হবে। এসব সাধারণ সম্পাদকের ওপরই বর্তায় বেশি। তাই এ পদটি গুরুত্বপূর্ণ।

তবে আওয়ামী লীগের ওই কেন্দ্রীয় নেতাদের অধিকাংশই দেশ রূপান্তরকে বলেন, সামনে নির্বাচন ও আন্দোলন মাথায় রেখে খুব বেশি পরিবর্তন আশা করছেন না তারা। সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের নিজেই দাবি করেছেন, এবারের সম্মেলনে খুব বড় কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। একই কথা বলেছেন দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খান। তিনি বলেন, নির্বাচন-আন্দোলন ও গত দুই বছরের করোনা পরিস্থিতি মাথায় নিয়ে পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম।

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও এবারের সম্মেলনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, সভাপতি শেখ হাসিনার বাইরে বঙ্গবন্ধু পরিবারের আর কেউ আওয়ামী লীগের এবারের কমিটিতে আসবেন বলে মনে হয় না। সর্বশেষ জাতীয় কমিটির সভায় এ প্রসঙ্গে আমাদের নেতারা সুনির্দিষ্ট করে জানতে চান সভাপতি শেখ হাসিনার কাছে। ওই বৈঠকে কয়েকজন নেতা দাবি করেন, জয় বা পুতুলকে নতুন কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করে রাজনীতির সুযোগ দেওয়া হোক। জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তারা এখন পরিণত বয়সে। তাদের ভালো-মন্দ তারা বুঝতে পারে। সুতরাং এ সিদ্ধান্ত তারাই নেবে।

আওয়ামী লীগ ও অন্য একটি সূত্র জানা গেছে, সাধারণ সম্পাদক পদে ওবায়দুল কাদেরকে প্রথমে রেখে কাজী জাফরউল্যাহ, ড. আবদুর রাজ্জাক, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবউল আলম হানিফসহ কয়েকজনকে নিয়ে তালিকা করা হয়েছে। ৮১ সদস্যের বর্তমান কমিটির অন্তত দুই ডজন নেতা বাদ পড়ার শঙ্কায় রয়েছেন। তাদের মধ্যে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য দুয়েকজন ছাড়া বাকিরা সভাপতিমণ্ডলী ও নির্বাহী সদস্য বলে জানা গেছে।

ওই সূত্র জানায়, অন্তত ১০ জন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা কেন্দ্রীয় কমিটিতে পদ পেতে পারেন। তিন বছর মেয়াদি এ কমিটিতে সুযোগ পেয়েও যারা দুর্নাম কামিয়েছেন, তাদের ব্যাপারে নেতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া নারী নেতার সংখ্যা বাড়বে।

কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, সম্মেলনে তিন ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। ১. কোনো পরিবর্তন আসবে না; ২. সাধারণ সম্পাদকসহ বড় পরিবর্তন হবে ও ৩. নেতৃত্বের বড় একটি অংশ থাকবে না এবার।

তবে এবারের সম্মেলন নিয়ে উৎসাহ-উদ্দীপনা তেমন চোখে পড়েনি। দলটির দুই কার্যালয়ে আগের সম্মেলনে যেভাবে লোক সমাগম হতো এবার অনেক কম উপস্থিতি। কেন্দ্রীয় নেতারাও নিরুত্তাপ, তৃণমূলেও তাপ নেই। আওয়ামী লীগের সম্মেলনে মূল আকর্ষণ থাকে সাধারণ সম্পাদক পদটি নিয়ে। সভাপতি শেখ হাসিনার বাইরে নেতাকর্মীরা কাউকে ভাবতে না পারার কারণে শীর্ষ এ পদ নিয়ে আলোচনা থাকে না। সাধারণ সম্পাদক গতকাল শুক্রবার রাত পর্যন্ত ওবায়দুল কাদেরই থাকছেন এমন গুঞ্জণে এ পদটি নিয়েও আলোচনায় ভাটা পড়েছে। তবে কেউ কেউ বলছেন, শেখ হাসিনা চমক দিতে পারেন। তাই অন্যবারের মতো এবার সবাইকে ‘ক্লু-লেস’ অবস্থায় রেখেছেন দলীয় প্রধান। ঘোষণার আগ পর্যন্ত এটি নিজের মধ্যেই রাখতে চান তিনি। অবশ্য মাসখানেক ধরে ওবায়দুল কাদেরকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা শুনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা তাকেই এগিয়ে রাখছেন।

সম্পাদকমণ্ডলীর গুরুত্বপূর্ণ দুই নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগে যেন এক ধরনের নেতৃত্বশূন্যতা চলছে। কারণ, ওবায়দুল কাদেরকে ছাড়া কেন্দ্রীয় আর কোনো নেতাকে সাধারণ সম্পাদকের যোগ্য মনে করছেন না অনেকেই। এটা দলের জন্য অশনিসংকেত দাবি করেন ওই দুই নেতা। তারা বলেন, শেখ হাসিনার বাইরে এই দলে আর কেউ অপরিহার্য নন। ফলে সাধারণ সম্পাদক পদে যোগ্যতা নেই এটা কেন আলোচনায় আসবে।

আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর আরেক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বৈশ্বিক রাজনীতিও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচনে প্রভাব রাখবে। তাই যিনি আছেন, সবদিক থেকে নিরাপদ থাকা সম্ভব হলে পরিবর্তন না হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন তিনি।

বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার কারণে কিছুটা কৃচ্ছ্রতা সাধনের লক্ষ্যে সম্মেলনে সাদামাটা আয়োজনের জন্য এ বছর বিদেশিদের দাওয়াত করা হয়নি। তবে, সম্মেলনে কেন্দ্রীয় ১৪ দল, জাতীয় পার্টিসহ নিবন্ধিত সব রাজনৈতিক দলকে দাওয়াত করা হয়েছে।

ওবায়দুল কাদের বলেন, আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনের বেশির ভাগই দু’দিনব্যাপী হয়েছে। এবার তা এক দিনে নামিয়ে আনা হয়েছে খরচ কমাতে। ২০১৯ সালে সর্বশেষ সম্মেলন হয়েছিল ২০ ও ২১ ডিসেম্বর। সর্বশেষ সম্মেলনের বাজেট ছিল ৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। এবারের সম্মেলনের জন্য বাজেট ৩ কোটি ১৩ লাখ টাকা অনুমোদন করেছে আওয়ামী লীগের জাতীয় কমিটি।