দেশে বছরজুড়ে করোনা নিয়ন্ত্রণেই ছিল। বছরের শেষের দিকে সংক্রমণ সর্বনিম্নে এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ভারত ও চীনে করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট রোগটি নিয়ে দেশে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি গতকাল আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন ভ্যারিয়েন্ট ঠেকাতে আবার নতুন সতর্কতা দিয়েছে।
চলতি বছর ডেঙ্গুর সর্বোচ্চ প্রাদুর্ভাব দেখেছে মানুষ। ডেঙ্গুতে ২২ বছরের ইতিহাসে এ বছরই সর্বোচ্চসংখ্যক মানুষ মারা গেছে। নতুন রোগ মাঙ্কিপক্স নিয়ে বেশ আতঙ্কে ছিল মানুষ। ডেঙ্গুও ভুগিয়েছে বেশ। সে হিসেবে এ বছর রোগ-শোক নিয়েই দিন কেটেছে মানুষের। স্বাস্থ্য বিভাগও ব্যস্ত ছিল এসব রোগ প্রতিরোধে, চিকিৎসাসেবায়।
অবশ্য স্বাস্থ্য খাতে বছরের বড় সাফল্য ছিল করোনার টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে। গত বছরের শেষের দিকে শুরু হওয়া করোনা টিকার বুস্টার বা তৃতীয় ডোজ কর্মসূচি এ বছর আরও গতি পায়। নতুন করে শুরু হয় ১২-১৭ বছর ও ৫-১১ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ টিকাদান কর্মসূচি।
চলতি বছর স্বাস্থ্য খাতে নতুন কোনো পরিবর্তন আসেনি বলে মনে করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জনস্বাস্থ্য পরামর্শক কমিটির সদস্য ও জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. আবু জামিল ফয়সাল। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতে একটা জিনিস পরিলক্ষিত হয়েছে যে আমরা সব সময় রি-অ্যাকটিভ, কোনো সময় প্রো-অ্যাকটিভ হতে পারলাম না; অর্থাৎ আমরা বুঝতে পারি সমস্যা আসছে, কিন্তু সমাধানে আগেভাগেই কোনো কাজ করতে পারি না। যখন সমস্যা আসে, তখন খুব প্রো-অ্যাকটিভ হই, হুড়োহুড়ি শুরু করি। ফলে শুরুর দিকে বেশ দুর্ভোগে পড়তে হয় মানুষকে, অনেক ক্ষতি হয়ে যায়।’
এই জনস্বাস্থ্যবিদ চলতি বছর স্বাস্থ্য খাতে দুটি সাফল্যের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা কভিডকে ভালোভাবে মোকাবিলা করতে পেরেছি। আমাদের মৃত্যুর সংখ্যা ও গুরুতর অসুস্থতা কম হয়েছে। দ্বিতীয় সাফল্য টিকা। কভিড টিকার সাফল্য অনেক বেশি। তবে এই সফলতার মধ্যেও অনেক ব্যর্থতা আছে। তৃতীয় ডোজ ঠিকমতো দিতে পারছি না। এখন চতুর্থ ডোজের লোকই পাওয়া যাচ্ছে না।’
বছর শেষে করোনায় নতুন উদ্বেগ : ২০২০ সালের ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হয়। এরপর এর প্রকোপ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। ২০২২ সালের শুরুর দিক থেকে কমে আসে সংক্রমণ। তবে দফায় দফায় সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি ভীতির সৃষ্টি করে জনমনে। এ বছর জুন-জুলাইয়ে করোনার প্রাদুর্ভাব বাড়লে চতুর্থ ঢেউয়ের আশঙ্কা করেন বিশেষজ্ঞরা। প্রতিবেশী দেশ ভারত, চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নতুন করে সংক্রমণ বৃদ্ধিতে সে শঙ্কা আরও প্রবল হয়। বছরের শেষ দিকে এসে করোনা সংক্রমণের ধারা নিম্নমুখী হয়। কিন্তু এ মাসের শুরু থেকেই করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট নতুন করে উদ্বেগে ফেলেছে বাংলাদেশকে। ভারতে নতুন ভ্যারিয়েন্ট দেখা দেওয়ায় এবং চীনে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় স্বাস্থ্য বিভাগ নতুন করে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে।
এ ব্যাপারে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা এবং সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই মুহূর্তে সংক্রমণ সর্বনিম্ন। টিকা নেওয়ার হার ভালো। অনেকে সংক্রমিত হয়ে গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, সারা বিশ্বে ৯০ শতাংশ লোক হয় টিকা অথবা সংক্রমিত হয়ে করোনা প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করেছে। আমাদের দেশে সেই হার ৯৫ শতাংশ। সারা বিশ্বের মধ্যে শুধু আফ্রিকার কয়েকটি দেশে টিকার অবস্থা ভালো নয়। বাংলাদেশে টিকার হার ভালো। কিন্তু নতুন ভ্যারিয়েন্ট যদি ছড়াতে থাকে, তাহলে সেটা আরও বেশি মিউটেশন বা পরিবর্তিত হয়ে আরও খারাপ হতে পারে। কাজেই সতর্ক থাকতে হবে।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সাত দিন পর গতকাল করোনায় একজনের মৃত্যু হয়। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত করোনায় দেশে মোট মারা গেল ২৯ হাজার ৪৩৯ জন। তবে গত ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত রোগী আরও কমে ছয়জনে ও শনাক্তের হার শূন্য দশমিক ৪৪ শতাংশে নেমে এসেছে। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত মোট শনাক্ত হলো ২০ লাখ ৩৭ হাজার ২৪ জন।
সাফল্য করোনা টিকায় : চলতি বছর করোনা টিকা সংগ্রহ ও দেওয়ার ক্ষেত্রে সাফল্য দেখিয়েছে স্বাস্থ্য খাত। বিশে^ যে পাঁচটি দেশ প্রথম টিকার ব্যাপারে পরিকল্পনা করেছিল তার মধ্যে বাংলাদেশ একটি। টিকাদানের হারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে প্রথম এবং বিশ্বের মধ্যে পঞ্চম অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে।
টিকার সংকট কেটে যাওয়ায় গণটিকা ও বুস্টার ডোজ দেওয়ার নানা উদ্যোগ নেয় সরকার। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গতকাল রবিবার পর্যন্ত মোট জনসংখ্যার ৮৭ শতাংশ টিকার প্রথম ডোজ, ৭৪ শতাংশ দ্বিতীয় ডোজ ও ৪৮ শতাংশ তৃতীয় ডোজ নিয়েছে। ২০ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া টিকার চতুর্থ ডোজ নিয়েছে ৬৬ হাজার ২৩৯ জন।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, ‘গত বছরের মতো এ বছরও আমাদের সবচেয়ে বড় সফলতা টিকা কার্যক্রমের মাধ্যমে আমরা কভিড নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছি। কয়েক দফায় বিশেষ কর্মসূচি নেওয়ায় দ্বিতীয় ডোজের হার বেড়েছে। এখন তৃতীয় ও চতুর্থ ডোজ চলছে। করোনা কমে যাওয়ায় মানুষের টিকা নেওয়ার আগ্রহ কিছুটা কমেছে। কিন্তু করোনা থেকে সুরক্ষিত থাকতে হলে টিকা নিতে হবে।’
মাঙ্কিপক্স নিয়ে আতঙ্ক : করোনার মধ্যেই নতুন রোগ মাঙ্কিপক্স আতঙ্ক দেখা দেয় দেশে। এ বছর আফ্রিকা, ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বের প্রায় ১২টি দেশে এ রোগের সংক্রমণ ঘটে। গত আগস্টে ভারতেও মাঙ্কিপক্স আক্রান্ত রোগী শনাক্তের খবর পাওয়া যায়। এ নিয়ে বাংলাদেশেও ভীতিকর অবস্থা তৈরি হয়। সংক্রমণ এড়াতে সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দেশের স্থল, বিমান ও নৌপথে সতর্কতা জারি করে। এর মধ্যে ঢাকায় চর্মরোগে আক্রান্ত একজন তুরস্কের নাগরিকের দেহে মাঙ্কিপক্স শনাক্ত হয়েছে এমন খবরে হইচই পড়ে যায়। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ওই ব্যক্তি মাঙ্কিপক্স আক্রান্ত রোগী নয় বলে জানায়। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে মাঙ্কিপক্সের প্রাদুর্ভাব ঘটেনি।
ডেঙ্গুর সর্বোচ্চ প্রাদুর্ভাব : দেশে ডেঙ্গুর ২২ বছরের ইতিহাসে এবারই সর্বোচ্চ ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। ফেব্রুয়ারি, মার্চ ও এপ্রিল বাদে বছরের প্রায় পুরোটা সময়ই দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ ছিল। জুন থেকে ডেঙ্গুর প্রকোপ ভয়াবহ হয়ে ওঠে। সেপ্টেম্বরে ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকা ছাড়াও কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বাড়ে। এ সময় দেশের সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর শয্যা সংকট দেখা দেয়। আগের বছরগুলোতে সেপ্টেম্বরের শেষে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমে এলেও এ বছর সেপ্টেম্বরের পর সংক্রমণ ছিল ঊর্ধ্বমুখী।
অতীতের যেকোনো বছরের তুলনায় এ বছর ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ মৃত্যু দেখেছে বাংলাদেশ। চলতি বছর এ পর্যন্ত মারা গেছে ২৭৬ জন, যা দেশের ইতিহাসে এক বছরে সর্বোচ্চ। এর আগে ২০১৯ সালে ডেঙ্গুতে ১৭৯ জনের মৃত্যু হয়। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল রবিবার পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৬২ হাজার ২১ জন। এর মধ্যে ঢাকার বাসিন্দা ৩৯ হাজার ৫৬ এবং ঢাকার বাইরের ২২ হাজার ৯৬৫ জন।
ছিল অন্যান্য রোগের প্রকোপ : ব্যাকটেরিয়াজনিত ডায়রিয়ার প্রকোপও শঙ্কা ছড়িয়েছিল বছরের মার্চ ও এপ্রিলের দিকে। গরমের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মাঝে এই পানিবাহিত ডায়রিয়ার প্রকোপ বাড়তে থাকে। এ অবস্থা চলমান থাকে অক্টোবর পর্যন্ত। এতে রাজধানীর মহাখালী কলেরা হাসপাতালে ডায়রিয়া রোগীদের চাপ বাড়ে।
এ বছর দেশে অসংক্রামক রোগের প্রবণতাও বেড়েছে। হৃদরোগ, ক্যানসারসহ অনেক রোগের ব্যাপারে বছরজুড়ে সভা-সেমিনারে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।