মানবাধিকার পরিস্থিতি ২০২২

আসকের দৃষ্টিতে ‘চরমতম’ থেকে ‘বিভীষিকাময়’ বছর

২০২১ সালে সার্বিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের পরিস্থিতিকে ‘চরমতর’ ও ‘সহ্যসীমা প্রায় অতিক্রান্তের’ বছর উল্লেখ করেছিল মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। সংস্থাটি ২০২২ সালের পরিস্থিতিকে দেখছে বিভীষিকাময় বছর হিসেবে।

শনিবার (৩১ ডিসেম্বর) দুপুরে রাজধানীর লালমাটিয়া আসকের কার্যালয়ে ‘মানবাধিকার পরিস্থিতি ২০২২: আইন সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সংস্থাটি। এতে গত বছরের সার্বিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র তুলে ধরে এর ওপর পর্যালোচনা করা হয়।

এ সময় আসকের নির্বাহী পরিচালক নূর খান লিটন বলেন, যে তথ্য আমরা পেয়েছি এটি অংশ বিশেষ মাত্র। দেশে যেসব ঘটনা ঘটছে তার সব কিন্তু সামাজিক, রাষ্ট্রীয় বাধাসহ নানা কারণে প্রকাশিত হচ্ছে না। এমনকি কিছু সেলফ সেন্সরশিপও আছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ওপরেও একধরনের খড়গ নেমে এসেছে। একথায় যদি বলি বর্তমানে দেশে মানবাধিকারের পরিস্থিতি বিভীষিকাময়। অনেকটা মাকাল ফলের মতো।

তিনি বলেন, পরিস্থিতি এমন যে বাইরে থেকে মনে হচ্ছে জনগণ সব অধিকার পাচ্ছে। কিন্তু ভিতরের পরিস্থিতিটা এমন আমাকে কম্বলে জড়িয়ে আঘাত করা হচ্ছে, শরীরের ভিতর জর্জরিত হয়ে যাচ্ছে, ঝরঝর হচ্ছে কিন্তু সেটি দৃশ্যমান নয়।

তিনি বলেন, গুম বা নিখোঁজ নিয়ে যেসব ঘটনা আসছে তাতে অজ্ঞাত স্থানে ৪৮ ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় আটক রাখা হয়েছে। এটি খুবই উদ্বেগজনক। গত বছরের সেপ্টেম্বর অক্টোবর মাসে নানা পেশার মানুষকে উঠিয়ে আনা হয়েছে এবং পরবর্তীতে জঙ্গি তকমা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আদালতের মাধ্যমে তাদের একটা বড় অংশ ইতিমধ্যে ছাড়া পেয়েছে।

নূর খান লিটন বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের গোপন যে ব্যবস্থা রয়েছে যেটিকে কারাগার, ডিটেনশন সেন্টার যাই বলি, ইন্টারোগেশনের জন্য যে সমস্ত জায়গা আমরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভুক্তভোগীর মুখে শুনছি সেই জায়গাগুলো অবিলম্বে বন্ধ করা উচিৎ। কারণ আমাদের আইন বা সংবিধান এটিকে সমর্থন করে না।

এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন আসকের পরিচালক (কর্মসূচি) নীনা গোস্বামী।

গণমাধ্যমের ভিত্তিতে আসকের তথ্য সংরক্ষণ ইউনিটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ সালে সারাদেশে ধর্ষণ ও দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৯৩৬ নারী। এর মধ্যে ধর্ষণ পরবর্তী হত্যার শিকার হয়েছেন ৪৭ জন। ধর্ষণের সর্বাধিক ৮৮টি ঘটনা ঘটেছে ঢাকায়। তবে, ২০২১ সালে ১৩২১ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। বিদায়ী বছরে শিশুর ওপর নির্যাতন ও নিষ্ঠুরতা অব্যাহত ঘটনায় হতাশা প্রকাশ করে আসক বলছে, এ বছর শারীরিক নির্যাতন, ধর্ষণের পর হত্যা, ধর্ষণ চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে হত্যা, অপহরণ ও নিখোঁজের পর হত্যায় ৫১৬ শিশু নিহত হয়েছে। গত বছর বলাৎকারের শিকার হয়েছে ৫২ ছেলে শিশু। ২০২১ সালে এভাবে ৫৯৬ শিশু নিহত হয়েছিল।

আসক বলছে, বছরজুড়ে ২২৬ জন সাংবাদিক বিভিন্নভাবে নির্যাতন, হয়রানি, হুমকি ও পেশাগত কাজে বাধার শিকার হয়েছেন। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে হামলার শিকার হয়েছেন অন্তত ৭৯ জন সাংবাদিক। দুর্বৃত্তদের গুলিতে কুমিল্লায় একজন সাংবাদিক নিহত হন।

আসকের পরিসংখ্যান অনযায়ী, ২০২১ সালে দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনা ব্যাপকহারে ঘটেছিল। তবে, ২০২২ সালে ঘটনা কমে আসলেও একেবারে থেমে থাকেনি। এবছর সারাদেশে বিভিন্ন এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের পূজামণ্ডপ, মন্দির, বাড়ি- ঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর- অগ্নিসংযোগের মতো ১২টি ঘটনা ঘটেছে। এতে হিন্দু সম্প্রদায়ের কমপক্ষে পাঁচজন আহত হয়েছেন।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এ বছর সংখ্যাগত দিক থেকে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কমে আসলেও একেবারে বন্ধ হয়নি। এ ধরনের হত্যাকাণ্ডে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকরী বাহিনী কোনো ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করছে না। ২০২২ সালে ১৯ জন নাগরিক বিচার বহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ ও গুলি বিনিময়ের ঘটনায় নিহত হয়েছেন চারজন।

এছাড়া বিভিন্ন আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে মারা গেছেন ১৫ জন। এর মধ্যে শারীরিক নির্যাতনে চারজন মারা গেছেন। এছাড়া দেশের ২১টি কারাগারে অসুস্থতাসহ বিভিন্ন কারণে ২০২২ সালে ৬৫ জন হাজতি ও কয়েদি মারা গেছেন বলে তথ্য দিয়েছে আসক।

আসক বলছে, বিদায়ী বছরে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে অপহরণ, গুম ও নিখোঁজের শিকার হন পাঁচজন। এর মধ্যে পরবর্তীতে চারজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয় এবং একজন ফিরে আসেন। এছাড়া এ বছর দেশের বিভিন্ন এলাকায় ৩৬ জন গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন। সংবাদ সম্মেলনে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সভা সমাবেশে কেন্দ্র করে হামলা, সহিংসতা ও মামলা ও গ্রেপ্তারে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসক।