চিকিৎসার ব্যয় কমান সুযোগ বাড়ান

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে চিকিৎসাসেবার মূল্য। মানুষকে আগের চেয়ে বেশি মূল্যে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। দেশে বর্তমানে স্বাস্থ্যসেবায় সরকারি ব্যয়ের তুলনায় তিন গুণ বেশি অর্থ ব্যক্তির পকেট থেকে খরচ হচ্ছে। গত দুই দশক ধরেই মানুষের পকেটের এই ব্যয় বাড়ছে। অন্যদিকে কমছে সরকারি ব্যয়। অন্যদিকে বেশির ভাগ চিকিৎসকের রোগী দেখা নিয়ে দেশের মানুষ সন্তুষ্ট নয়। তারা মনে করে, চিকিৎসকরা আন্তরিক নন। অভিযোগ রয়েছে ওষুধ কোম্পানির দৌরাত্ম্য ও তাদের সঙ্গে চিকিৎসকদের স্বার্থের দ্বৈরথ পকেট কাটছে রোগী ও তাদের স্বজনদের। 

বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরে ‘স্বাস্থ্যসেবায় ব্যক্তির পকেট থেকে যাচ্ছে ৬৯% অর্থ’ এবং ‘ওষুধ কোম্পানির টাকায় ওমরাহ করেন অনেক চিকিৎসক’ শিরোনামে প্রকাশিত দুটি প্রতিবেদনেও এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। প্রথম প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, দেশে স্বাস্থ্যব্যয়ের দুই-তৃতীয়াংশ বা ৬৮ দশমিক ৫ শতাংশ বা ৬৯ শতাংশ অর্থ যাচ্ছে ব্যক্তির পকেট থেকে। এক্ষেত্রে সরকার ব্যয় করছে মাত্র ২৩ দশমিক ১ শতাংশ অর্থ। গত ১০ বছরে দেশের স্বাস্থ্য খাতে সরকারের ব্যয় যেমন কমেছে, তেমনি বেড়েছে ব্যক্তির ব্যয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টস-ষষ্ঠ রাউন্ড’-এর গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ইউনিটের বাংলাদেশ ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টস সেলের ফোকাল পারসন ডা. সুব্রত পাল বলেছেন, নিজ পকেট থেকে ব্যয় (ওওপি) সবসময় সরকারের ব্যয় বা সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে না। তিনি মনে করেন, মানুষের খরচ করার প্রবণতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেশে স্বাস্থ্যব্যয়ে মোট ব্যক্তি পর্যায়ে খরচের ৫৪ শতাংশই খরচ করে থাকেন দেশের শীর্ষ ধনীরা। অন্যদিকে দরিদ্র শ্রেণির জনগণের নিম্ন দুই ভাগ নিজ খরচের যথাক্রমে ৪ শতাংশ এবং ৮ শতাংশ খরচ করে থাকেন। এক্ষেত্রে চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকারের বিষয়ে মানসম্মত সেবাপ্রাপ্তির সুযোগ ও সাধ্যের বৈষম্য রয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ, সাধারণ মানুষের আয় কমে যাওয়ায় অনেকেই বাধ্য না হলে হাসপাতালে বা চিকিৎসা নিতে যাচ্ছেন না বলে জানা গেছে।

স্বাস্থ্যসেবা পেতে ব্যক্তির সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয় ওষুধে, যা মোট স্বাস্থ্যব্যয়ের ৬৪ দশমিক ৬ শতাংশ। এরপর মেডিকেল ও ডায়াগনস্টিকে ১১ দশমিক ৭ শতাংশ, চিকিৎসক দেখাতে ১০ দশমিক ৮ শতাংশ, সাধারণ হাসপাতালে ১০ দশমিক ১ শতাংশ, অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবায় ২ দশমিক ৪ শতাংশ, দন্ত চিকিৎসক দেখাতে শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ ও চিকিৎসাসামগ্রী কিনতে শূন্য দশমিক ১ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয় মানুষের। দেশ রূপান্তরের দ্বিতীয় প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, দেশে ওষুধ কোম্পানির মার্কেটিংসংক্রান্ত বিধি (কোড) মানা হয় কি না, সে প্রশ্ন তুলেছেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব ড. মুহাম্মদ আনোয়ার হোসেন হাওলাদার। তিনি অভিযোগ বলেন, ‘অনেক চিকিৎসক শুনি ওমরাহ পালনে যান ওষুধ কোম্পানির টাকায়। অনেকে বলেন, ফ্রিজ নেয় টেলিভিশন নেয়। কেউ আছে ফ্ল্যাট পর্যন্ত কিনে দেয়।’ চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে কোম্পানির সুবিধা নিয়ে তাদের উৎপাদিত ওষুধ প্রেসক্রাইব করার অভিযোগের সত্যতা রয়েছে। অন্যদিকে, রোগীর ব্যবস্থাপত্রে ওষুধের নাম না লিখে ওষুধের জেনরিক লিখে দেওয়ার কথা বলা হলেও তা মানা হচ্ছে না। এছাড়া, ক্রেতা আকর্ষণের জন্য প্যাকেজিংয়ে বেশি খরচ না করেও কোম্পানিগুলো ওষুধের দাম কমাতে পারে।

সাধারণ মানুষের মানসম্মত চিকিৎসাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা এবং চিকিৎসা ব্যয় লাঘব করতে হলে দেশব্যাপী জেলা-উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ বাড়ছে না বললেই চলে। ২৪ বছর ধরেই দেশে স্বাস্থ্যসেবা পেতে সরকারি সেবার বাইরে মানুষের নিজস্ব ব্যয় উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের যে খরচ, তার যদি ১০ শতাংশ বা তার বেশি স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় হয়, তাহলে সে পরিবার বা ব্যক্তি আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। এটা বাংলাদেশে অনেক বেশি, ২৫ শতাংশ। স্বাস্থ্যসেবায় ব্যক্তির পকেট থেকে ব্যয় এশিয়া ও বৈশ্বিকভাবেও সবচেয়ে বেশি। জাতিসংঘের ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কমিশন ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিকের (এসকাপ) অর্থনৈতিক ও সামাজিক জরিপ অনুসারে এশিয়ার ৪৮টি দেশের মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে কম ব্যয় করে বাংলাদেশ। ফলে এ প্রশ্নটিই বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে যে, সরকার আসলেই জনমুখী স্বাস্থ্যসেবা খাত গড়ে তুলতে এবং স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়াতে চায় কি না?