বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) অঙ্গসংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল অতীতের গৌরব হারিয়ে এখন অনেকটা গতিহীন। এর মধ্যেও দীর্ঘদিন কেন্দ্রীয় থেকে তৃণমূল পর্যায়ের কমিটি গঠন, পুনর্গঠন ও হালনাগাদ না করা এবং অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং, কোন্দলের কারণে ছাত্রসংগঠনটিতে চলছে অস্থিরতা। সম্প্রতি এই অস্থিরতা আরও বেড়েছে। গতকাল শুক্রবার ছাত্রদলের একাধিক নেতাকর্মী দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, যখন আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ সময়, তখন হঠাৎ করে সংগঠনের একটি অংশ পেছনের ঘটনা সামনে এনে অস্থিরতা তৈরি করেছে।
তারা আরও বলেন, বর্তমানে ছাত্রদল সভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ ও সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েলের বিরুদ্ধে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা ও নিজ সংগঠনের জুনিয়রদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, টাকার বিনিময়ে ও ব্যক্তিগত অনুগতদের দিয়ে কমিটি গঠন, স্বেচ্ছাচারিতা, আত্মপ্রচারসহ বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে। এসব নিয়ে সংগঠনের মধ্যে চলছে চরম অস্থিরতা। যদিও সরকারের পদত্যাগ, সংসদ ভেঙে দেওয়া, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনসহ ১০ দফা দাবি আদায়ে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম চলমান রয়েছে। এ অবস্থায় সংগঠনের শীর্ষ দুই নেতার সঙ্গে অন্য নেতাদের দ্বন্দ্ব-সংঘাতে আগামী দিনের আন্দোলন-সংগ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
তবে এমন অভিযোগের বিষয়ে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক জুয়েল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তা আমাদের জানাতে পারেন। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে জানাতে পারেন। তারা তা না করে গণমাধ্যমের কাছে মিথ্যা অভিযোগ নিয়ে হাজির হচ্ছেন। এখন যেসব অভিযোগ আনা হচ্ছে তা পুরনো।’ হঠাৎ করে এসব অভিযোগ কেন আনা হচ্ছে, তা সহজেই বোঝা যায়, এমন মন্তব্য করে তিনি দাবি করেন, ‘সংগঠনের ভেতরে সরকারের এজেন্ট ঢুকে পড়েছে। তাদের প্ররোচনায় নিজ সংগঠনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন। এভাবে আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে সামনে যদি তারা দায়িত্বে আসতে চান কীভাবে চালাবেন সংগঠন?’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছাত্রদলের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ছাত্রদলের সাংগঠনিক অভিভাবক ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ছাত্রদলের বিগত কমিটির নেতাদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে গত বছরের ১৭ এপ্রিল ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় ‘সুপার ফাইভ’ কমিটি ঘোষণা করেন। এতে কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণকে সভাপতি, সাইফ মাহমুদ জুয়েলকে সাধারণ সম্পাদক এবং জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি রাশেদ ইকবাল খান, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও আবু আফসান মোহাম্মদ ইয়াহিয়াকে সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়। কমিটি ঘোষণার পর ছাত্রদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার আগে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সংগঠনটির অন্য তিন নেতার সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই নিজেদের মতো করে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করের।
গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ছাত্রদলের ৩০২ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটির ঘোষণা আসে। এর চার দিন পর কমিটিতে পদবঞ্চিত নেতাকর্মীরা বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। তারা জানান, ঘোষিত কমিটিতে সংগঠনের বেঁধে দেওয়া সময়ের আগে এসএসসি পাস করাসহ বিবাহিত ও অছাত্ররাও রয়েছেন। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপির সিদ্ধান্তে ৩২ জনের পদ স্থগিত করা হয়।
পদবঞ্চিতরা আরও অভিযোগ করেন, ছাত্রদলের নতুন কমিটি ঘোষণার পর থেকে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের স্বেচ্ছাচারিতা, আত্মপ্রচার, অধীন নেতাকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, সংগঠনের বাইরে নিজেদের বন্ধু-বান্ধবদের দিয়ে জেলা নেতাদের নির্দেশনা দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। কমিটি ঘোষণার পর সবাইকে নিয়ে সংগঠন পরিচালনায় ব্যর্থ হয়েছেন তারা। সর্বশেষ ১ জানুয়ারি ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে গুম, খুন হওয়া নেতাদের নাম উল্লেখ করে যে স্মারক প্রকাশ করা হয় তার নিচে ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটি না লিখে লেখা হয়েছে শ্রাবণ-জুয়েল পরিষদ।
তারা আরও বলেন, গত ১০ ডিসেম্বর গোলাপবাগে বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় গণসমাবেশে সংগঠনের সভাপতি শ্রাবণকে বক্তব্য দিতে দেওয়া হয়। সাধারণ সম্পাদককে বক্তব্য দিতে না দেওয়ায় গণসমাবেশের সভাপতি, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমান উল্লাহ আমানের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের সদস্য সচিব আমিনুল হক ও রফিকুল আলম মজনুর সঙ্গেও খারাপ ব্যবহার করেন। সংগঠনের বাইরে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গেও দুর্ব্যবহার করেছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্য সচিব আমিনুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সমাবেশের দিন দলীয় সিদ্ধান্ত ছিল অঙ্গসংগঠনগুলোর নেতাদের মধ্যে একজন করে বক্তব্য দেবেন। ওই দিন সমাবেশে ছাত্রদলের সভাপতি শ্রাবণকে বক্তব্য দিতে দেওয়া হয়। জুয়েলকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ না দেওয়ায় তিনি কিছুটা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। একইভাবে যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মোনায়েম মুন্নাও বক্তব্য রাখার সুযোগ চান। সুযোগ না দেওয়ায় তিনিও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাদের ক্ষোভের কারণে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমান উল্লাহ আমান বিরক্ত হন। তবে আমাদের কেউ ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে বিষয়টি জানাইনি। কারণ তিনি নিজেই অনলাইনে সমাবেশে যুক্ত ছিলেন। সবকিছু দেখেছেন। দলীয় সিদ্ধান্তে সবকিছু হয়, এটা সবার বোঝা উচিত।’
১৯৭৯ সালের ১ জানুয়ারি ছাত্রদল প্রতিষ্ঠা করেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান। ছাত্রদল স্বৈরাচার এরাশাদবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বর্তমানে ছাত্রদলের সেই ইমেজ নেই। এ বিষয়ে খোদ দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আক্ষেপ করে ছাত্রদলেরই এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় গুরু দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে ছাত্রদল আমাদের পথ দেখিয়েছিল। কিন্তু সেই ছাত্রদল এখন আর নেই। ছাত্রদল ব্যর্থ হয়েছে তাদের ভূমিকা পালন করতে।’
যে অভিযোগ উঠেছে সে প্রসঙ্গে ছাত্রদলের সভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সামনের দিনগুলোতে আমাদের রাজপথে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এ অবস্থায় সংগঠনের কিছু নেতা ও ছাত্রদলের সাবেক কিছু নেতা যারা বিএনপির সঙ্গে জড়িত, তারা সংগঠনে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছেন। সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বাইরে ভিন্ন একটি বলয় তৈরি করে হাইকমান্ডকে ভুল বার্তা দেওয়াসহ নানা অপপ্রচার চলছে। আমাদের বিরুদ্ধে যদি কোনো অভিযোগ থাকে, তবে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের কাছে তারা বলতে পারেন। কিন্তু তারা তা না করে বিএনপিবিরোধী কিছু গণমাধ্যমের সংবাদকর্মীদের কাছে গিয়ে মিথ্যা তথ্য তুলে ধরছেন। এতে করে আগামী দিনের আন্দোলন-সংগ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছি।’
৩২ নেতার পদ স্থগিতের বিষয়ে শ্রাবণ বলেন, ‘বিভ্রান্তিকারীদের অপপ্রচারে কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণার চার দিন পরেই তাদের পদ স্থগিত করা হয়। এতে যেমন সংগঠনের ভাবমূর্তির সংকট হয়েছে, তেমনি নিয়মবহির্ভূত ওই সিদ্ধান্তে হতাশ হয়ে পড়েছেন পদ স্থগিত করা রাজপথের নেতারা। অথচ কমিটি ঘোষণার এক সপ্তাহ আগে অভিযোগ জমা দেওয়ার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছিল। এ জন্য অভিযোগ বাক্স খোলা হয়। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়েছিল, সেসব তদন্ত করে ক্লিন ইমেজের নেতাদের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে পদায়ন করা হয়।’
শ্রাবণ বলেন, ‘কোনো রকম তথ্যপ্রমাণ ও যাচাই-বাছাই ছাড়া শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে এসব ছাত্রনেতার পদ স্থগিত করা হয়েছে। এমনকি আত্মপক্ষ সমর্থনেরও সুযোগ দেওয়া হয়নি। মূলত সংগঠনকে দুর্বল করার জন্যই সংগঠনবিরোধী এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় অপপ্রচারকারীদের অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে বিএনপির একটি অংশের নেতা। যারা চেয়েছিলেন ছাত্রদলকে তাদের পকেটে নিতে।’
ছাত্রদলের সভাপতির অভিযোগের তীর কেন্দ্রীয় কমিটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সম্পাদক রাকিবুল ইসলাম রাকিবের বিরুদ্ধে। শ্রাবণ বলেন, ‘শুরু থেকে রাকিব সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বাইরে একটি ভিন্ন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেন। এখান থেকে ছাত্রদলের বর্তমান সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে প্রচার-প্রচারণা চলছে। এমনকি তার নিজস্ব হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে (কমল ফোর্স গ্রুপ) অনুসারীদের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকবিরোধী স্ট্যাটাস, প্রচারণা এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে নিউজের লিঙ্ক শেয়ার করার জন্য নির্দেশনা দেন বলে আমার কাছে অভিযোগ করেছেন সংগঠনের নেতাকর্মীরা।’
গত ৭ ডিসেম্বর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনায় কার্যালয় থেকে যেসব নেতাকর্মীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল তার মধ্যে রাকিব ছিলেন। রাকিব বর্তমানে জেলে থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এক যুগ ধরে কমিটি নেই ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন ইউনিটের : প্রায় এক যুগ ছাত্রদল ঢাকা মহানগর উত্তরের আওতাধীন থানা কমিটি নেই। এসব থানা ইউনিটের মধ্যে রয়েছে খিলক্ষেত, শেরেবাংলা নগর, তেজগাঁও, তেজগাঁও শিল্পঞ্চল, তুরাগ, উত্তরা পশ্চিম, দক্ষিণ খান। ৭ বছরের বেশি সময় ধরে কমিটি নেই বাড্ডা, ভাটারা, গুলশান, বনানী, বিমানবন্দর ও উত্তরখান থানা ইউনিটের। এ ছাড়া ঢাকা মহানগর পশ্চিমের আওতাধীন থানা ইউনিটগুলোর কমিটিও নেই। দলের দুর্দিনে তাই অনেক নেতাকর্মী এখন পরিচয়হীন। অথচ এই ১২ বছরে চারটি কেন্দ্রীয় সংসদ ও চারটি মহানগর উত্তর ছাত্রদলের কমিটি গত হয়েছে এবং পাঁচবার কর্মিসভা করেছে। তিনটি টিম গঠন করেও কমিটি গঠন করতে ব্যর্থ হয়েছে সংগঠনটি। স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক লেনদেন ও নির্বাচনী এলাকায় বিএনপির কোন্দল, দলীয় মনোনয়ন নিয়ে জ্যেষ্ঠ নেতাদের দ্বন্দ্বকেও দায়ী করছেন নেতারা।
ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক ও কমিটি গঠনের জন্য গঠিত টিম লিডার আবু আফসান মোহাম্মদ ইয়াইয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগামী এক সপ্তাহ থেকে ১০ দিনের মধ্যে এই কমিটিগুলো ঘোষণা করা হবে। কাজ চলছে।’