ব্রিটিশ অভিজাতরা খেলতেন বলেই বোধহয় ক্রিকেটকে বলা হতো ভদ্রলোকের খেলা। সাদা পোশাক, মাথায় হ্যাট, খেলার মধ্যে চা-পান, মধ্যাহ্ন ভোজনের বিরতি সব কিছুই বহন করে সেই সব আভিজাত্যের নিদর্শন। কালের খেয়ায় খেলাটা আর শুধুই অভিজাতদের ভেতর সীমাবদ্ধ নেই বরং নানান উপাদান খেলার উত্তেজনা বারবার করেছে কলুষিতও। তবুও ভদ্রলোকের খেলা’র কিছুটা ভদ্রোচিত আচরণ এখনো রয়ে গেছে। তবে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে এই ভদ্রতার সীমা লঙ্ঘন হচ্ছে প্রতিনিয়তই। কাল সাকিব আল হাসান, নুরুল হাসান ও এনামুল হক যা করেছেন তাতে আবারও ফুটে উঠেছে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের রুগ্ণ চেহারা।
ঘটনার সূত্রপাত মঙ্গলবার রংপুর রাইডার্স-ফরচুন বরিশাল ম্যাচের প্রথম ইনিংসের পর, দ্বিতীয় ইনিংস শুরুর আগে। চতুরঙ্গা ডি সিলভা ও এনামুল হক বিজয় নেমেছেন রান তাড়ায়। স্ট্রাইকে বাঁহাতি চতুরঙ্গাকে দেখে রংপুর অধিনায়ক নুরুল হাসান বল তুলে দিলেন অফস্পিনার শেখ মাহেদী হাসানের হাতে। সেটা দেখেই মাঠের বাইরে বাউন্ডারি লাইনের কাছ থেকে চেঁচিয়ে বরিশাল অধিনায়ক সাকিব নিজের দলের ব্যাটসম্যানদের বললেন প্রান্ত বদল করতে, যাতে অফস্পিনারকে খেলতে পারেন ডানহাতি এনামুল। তারা সেটা করলেন, তখন নুরুল হাসান সোহানও আবারও বোলার বদল করলেন। মাহেদীর পরিবর্তে বল দিলেন বামহাতি স্পিনার রাকিবুল হাসানের হাতে। এভাবে অদল বদল দেখে সাকিব নিজেই মাঠে দৌড়ে ঢুকে পড়লেন। কিছুক্ষণ কথা হলো সাকিব, আম্পায়ার আর ব্যাটসম্যানদের ভেতর। খানিকটা সময় পর বামহাতি রাকিবুলের ওভার দিয়েই শুরু হলো ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংস, বলটা খেললেন বাঁহাতি চতুরঙ্গা ডি সিলভা।
ম্যাচশেষে সংবাদ সম্মেলনে এসে মেহেদী হাসান মিরাজ বলেছেন, ‘সোহান মনে হয় দুষ্টুমি করেছে’, যদিও সংবাদ সম্মেলনে এসে রংপুর অধিনায়ক বলেছেন ‘এটা আসলে দুষ্টুমিও হয়নি।’ ক্রিকেট মাঠে এই ধরনের ‘দুষ্টুমি’ করা কতটা যুক্তিযুক্ত এবং এসব ‘দুষ্টুমি’র মাধ্যমে মাঠে উপস্থিত বিদেশি ক্রিকেটার এবং টেলিভিশন দর্শকদের কাছে বাংলাদেশের ক্রিকেটের ব্যাপারে কী বার্তা যায়, সেটা সহজেই অনুমেয়।
মাঠে কী হয়েছিল তা নিয়ে মিরাজের বক্তব্য, ‘আমাদের তো ডান/বাম ব্যাটার ছিল। যেহেতু মাহেদী ডানহাতি বোলার, তাই সাকিব ভাই চেয়েছিলেন ডানহাতি ব্যাটার স্ট্রাইক করুক। ফলে অ্যাডভান্টেজ পাবে। যেহেতু টি-টোয়েন্টিতে একটি দুটি বল খুব গুরুত্বপূর্ণ।... এটাই বলছিল। ওরাও অ্যাডভান্টেজ নিতে চাচ্ছিল, আমরাও চাচ্ছিলাম। হয়তো একটু দুষ্টুমি করছিল, বাট বিষয়টা এত সিরিয়াস কিছু না।’ একই প্রসঙ্গে নুরুল হাসান বলেছেন, ‘আমি দেখছিলাম বাইরে থেকে সাকিব ভাই চিল্লাচ্ছেন, তাই আমিও চেঞ্জ করছিলাম ভেতরে। যখন দেখলাম সাকিব ভাই বাইরে থেকে চিল্লাচ্ছেন তখন আমি বোলার চেঞ্জ করেছি। এটা আসলে দুষ্টুমিও হয়নি। আমি যেটা বললাম বেস্ট বোলারটাকে ইউজ করা। বাট পরিস্থিতিটা ঐদিকে চলে গেছে।’
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের জাতীয় দলের ম্যাচগুলোতে স্ট্রাইকে ডানহাতি ব্যাটসম্যান থাকলে বামহাতি বোলার আনা কিংবা বামহাতি ব্যাটসম্যান থাকলে ডানহাতি বোলার আনার ব্যাপারটা রীতিমতো অলিখিত আইনের পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে। দলের ক্রিকেটাররা এমনভাবে নিয়মটি মানেন যেন ব্যতিক্রম হলেই তাতে আইনের লঙ্ঘন হবে। ব্যাটসম্যানদের কে স্ট্রাইক নেবেন সেটা ঠিক করতে অধিনায়কের মাঠে ঢুকে যাওয়ার ব্যাপারটাও অদ্ভুত। নুরুল হাসানের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল এমন কিছু আগে দেখেছেন কি না, উত্তরে বলেছেন, ‘আজ দেখলাম’। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নুরুল হাসানের অভিজ্ঞতাও কম নয়, দলকে নেতৃত্বও দিয়েছেন। জাতীয় দলের হয়ে ম্যাচে এমনটা করলে শাস্তির মুখে পড়তে হবে কি না জানতে চাইলে নুরুল হাসানের উত্তর, ‘নো কমেন্টস, আমার কোনো ধারণা নেই।’ তবে মিরাজ মনে করেন, দরকার হলে অধিনায়ক যেতেই পারেন, ‘সিচুয়েশন যদি ডিমান্ড করে, তবে তো অধিনায়ক মাঠে যেতেই পারেন।’ অনুমতি নিয়েই গিয়েছিলেন সাকিব বলেছেন মিরাজ, ‘হ্যাঁ আম্পায়ারের সঙ্গেই তো কথা বলছিলেন। থার্ড আম্পায়ারের সঙ্গে কথা বলছিলেন প্রথমে।’
বিপিএল শুরুর আগে থেকেই সাকিবের মুখে খই ফুটছে। আসরের মান নিয়ে বলেছেন ‘একেবারে যা-তা’। সেই আসরের মান আরও নিচে নামিয়ে আনছেন এমন অখেলোয়াড়সুলভ আচরণে। অবশ্য উদ্ধত আচরণে সাকিব একা নন। খুলনা টাইগার্সের বিপক্ষে ম্যাচে সৌম্য সরকার আউট হয়ে মাঠ ছাড়তে চাননি, এডিআরএস নামক হাস্যকর পদ্ধতির প্রবর্তন করে বিপিএল আয়োজকরা শুধু সংশয়ই বাড়িয়েছে যেটা ম্যাচ শেষে এসে বলেছেন খুলনায় খেলা ডাচ ক্রিকেটার পল ভ্যান মিকারেন। সৌম্যকে আউট দিয়েছিলেন আম্পায়ার, এডিআরএসের পর বড় পর্দায় দেখানো হয় আউট, কিন্তু সৌম্য যেতে চাচ্ছিলেন না এবং তারপর সৌম্যকে নট আউট দেওয়া হয়। এই নিয়ে আম্পায়ারের সঙ্গে বাগ্বিত-ায় জড়ান তামিম ইকবাল। কাল সিকান্দার রাজার বলে লেগ বিফোর উইকেট হয়ে এডিআরএস নিয়েও বাঁচেননি এনামুল হক, তবুও মাঠ ছাড়ছিলেন না। এইসব নিয়ে বেশি কিছু বলতেও চাননি নুরুল হাসান, ‘আম্পায়াররাও মাঠে ডিসিশন নিতে অনেক প্রেশারে পড়ে যাচ্ছেন। সবাই তো মানুষ আসলে, সবারই একটু আধটু ভুল হবে। বাট এইটুকু একটু বেটার হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।’ অদ্ভুত এই এডিআরএস, যেখানে হক-আই নেই বা বল ট্র্যাকার নেই, সেটা দিয়ে আম্পায়াররা কীভাবেই বা সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবেন? এই এডিআরএস থাকা ভালো কি ভালো না, এমন প্রশ্নে নুরুল হাসানের উত্তর, ‘আমার কাছে মনে হয়, না থাকাটাই ভালো।’
আনামুলের আউট হওয়ার পরের প্রতিক্রিয়া কীভাবে দেখছেন, এমন প্রশ্নে রংপুর অধিনায়ক বলেন, ‘এটা আসলে আম্পায়ারের সঙ্গে কী কথা হচ্ছিল আমি তো জানি না। আউট সিদ্ধান্তের পর আমি সেলিব্রেশন করছিলাম। নো কমেন্টস আসলে।’
দিনশেষে এই ‘দুষ্টুমি’র জন্য শাস্তি পাচ্ছেন সাকিব, নুরুল হাসান ও এনামুল হক। তিনজনেরই ম্যাচ ফি’র ১৫ শতাংশ জরিমানা করা হয়েছে। তবে এমন শাস্তি সাকিব অতীতে অনেক পেয়েছেন, তবুও তার দুষ্টুমি কমেনি।
কিছুদিন আগে সাকিব বলেছিলেন তিনি বিপিএলের সিইও হতে চান, এরপর বলেছেন তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের প্রেসিডেন্টও হতে চান। প্রশ্ন হচ্ছে, যদি আসলেই কোনো একদিন এই সব পদে দায়িত্ব নেন সাকিব, তখন এমন ‘দুষ্টু’ ক্রিকেটারদের কি তিনি শাস্তি দেবেন?