শীতের সকাল হওয়ায় একটু দেরিতেই ঘুম থেকে উঠেছে চট্টগ্রাম নগরীর আসকার দীঘির পাড় এলাকার গৃহবধূ আনজুমান আরা। নাস্তা তৈরি বাদ দিয়ে তড়িঘড়ি চুলায় বসিয়েছিলেন দুপুরের রান্না। কিন্তু বিধি বাম, ১০টা বাজতেই চুলার আগুন নিভে গেল পুরোপুরি। তাই আর রান্না হয়নি। অগত্যা হোটেল থেকে কিনে দুপুরের খাবার খেতে হলো বাসার সবাইকে।
চট্টগ্রাম নগরীর বাকলিয়া, মাদারবাড়ি, মুরাদপুর, বায়েজিদ, ঘাটফরহাদবেগ, দেওয়ানবাজারসহ অধিকাংশ এলাকায় এটাই নিত্যদিনের চিত্র। সকাল হলেই চলে যায় বাসা বাড়ির চুলার গ্যাস। ফলে অনেকেই ভোরেই করেছেন দুপুরের রান্না।
প্রায় তিন মাস ধরেই এমন অবস্থা চলে আসছে বলে জানালেন নগরীর লালখান বাজার এলাকার বাসিন্দা হাসিনা বেগম। দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘প্রথম প্রথম সকালে গ্যাস চলে গেলে বেলা দুইটা-তিনটার দিকে আসত। এখন দেখি সন্ধ্যার আগে আসে না। যে কারণে ইলেকট্রিক হিটারে রান্না করতে হয়। আর এতে চাপ পড়ছে বিদ্যুৎ বিলের ওপর।’
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) কর্মকর্তারা জানান, চাহিদার তুলনায় সরবরাহের ঘাটতির কারণে গ্যাসের এ সংকট চলছে। আর কবে নাগাদ সংকটের সমাধান হবে সে ব্যাপারে স্পষ্ট কিছু বলতে পারছেন না কেউ। কেজিডিসিএল সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে অন্তত সাড়ে তিনশ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন। কিন্তু বিগত তিন মাস ধরে সরবরাহ ২৬০ থেকে ২৮০ মিলিয়ন ঘনফুটের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। এ সময় বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সারকারখানায় বাল্ক আকারে গ্যাস সরবরাহ দিতে গিয়ে আবাসিক ও শিল্প খাতে চাহিদানুযায়ী গ্যাস সরবরাহ কঠিন হয়ে পড়ছে।
পেট্রোবাংলার ১২ জানুয়ারির দৈনিক গ্যাস বিতরণ প্রতিবেদনে দেখা যায়, এদিন কেজিডিসিএলকে ২৭৬ দশমিক ৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হয়। সেখান থেকে শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৩৯ দশমিক ৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হয়। কাফকো সারকারখানাকে ৪৮ দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনফুট। চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) শাটডাউনে থাকায় সেখানে ৫২ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে ৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হয়। রাউজান তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও বাড়বকু- ২২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকায় সেখানে কোনো গ্যাস সরবরাহ হয়নি। অবশিষ্ট ১৮৫ মেগাওয়াট গ্যাস সরবরাহ করা হয় শিল্প ও আবাসিক খাতের গ্রাহকদের। গ্যাস সংকটে পোশাক কারখানাগুলোও ধুঁকছে। তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সাবেক প্রথম সহ-সভাপতি ও ইস্টার্ন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসিরুদ্দিন চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডায়িং ও ওয়াশিং প্ল্যান্টগুলোতে গ্যাস ব্যবহার করতে হয়। চলমান গ্যাস সংকটে তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া কাপড় আয়রন করার ক্ষেত্রেও গ্যাসের প্রয়োজন হয়। রপ্তানি অর্ডার ঠিক রাখতে এসব কারখানাকে এখন গ্যাসের পরিবর্তে বৈদ্যুতিক জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। জানতে চাইলে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, চলমান গ্যাস সংকটের পেছনে বৈশি^ক নানা কারণ বিদ্যমান। আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) থেকেই মূলত চট্টগ্রাম অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হয়ে থাকে। কিন্তু বর্তমানে এলএনজির সংকট রয়েছে। যে কারণে আমরা চাহিদানুযায়ী গ্যাস পাচ্ছি না। এর ফলে পাইপলাইনে চাপ কমে যাচ্ছে। তিনি বলেন, কবে নাগাদ এ পরিস্থিতির উত্তরণ হবে তা এ মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। কারণে এতে আমাদের কোনো হাত নেই। কেজিডিসিএল চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ পেলে তা গ্রাহকদের সরবরাহ দিতে পারবেÑ এটাই মূল কথা।