ছাদের মাঠে বিশ্বকাপ

আমি ঈপ্সিতা। আমাদের একটা নতুন বাসা হয়েছে। পুরনো বাসাটা ছোট্ট ছিল যে। আমি খেলব বড় জায়গাজুড়ে তাই মা-বাবা এই বড় বাসা নিয়েছেন। কিন্তু মা-বাবা সারা দিন বাসায় থাকেন না। অফিসে চলে যান। আমার সঙ্গে খেলা করে আফরিন। দিনের বেলা দাদি এসে আমার সঙ্গে থাকেন। দাদি সঙ্গে থাকলে আমার ভালো লাগে। আমি কার্টুন দেখি। মিনা আর রাজু। আমার ভাই নেই। আমার একটা পাখিও নেই। মা-বাবাকে বলেছি মিনার মতো আমিও একটা পাখি চাই। মা, বাবা, আমি আর আফরিন, মা-বাবার যেদিন ছুটি সেদিন বেড়াতে যাই। বেড়াতে গিয়ে আমরা এক দিন দুটো পাখি কিনে এনেছি। কিন্তু ওরা তো কথা বলে না। আর ওদের সঙ্গে খেলাও যায় না। মা আর আমি এক দিন মৌমিতার বাসায় গিয়েছিলাম। মৌমিতার একটা ভাই আছে। মৌমিতা ওর ভাইয়ের সঙ্গে খেলে। সেদিন আমিও ওদের সঙ্গে খেলেছি। মৌমিতার মতো আমারও একটা ভাই থাকলে ভালো হতো। সে আমার সঙ্গে খেলতে পারত। আফরিন বড় হয়ে গেছে। ও একটু বেশিই বড় হয়ে গেছে। ওর সঙ্গে তাই খেলা যায় না। সে অনেক কিছু বলে বড়দের মতো। কিন্তু সব বড় আবার বড় না। বড়রাও যে ছোট থাকতে পারে তা আমি অবশ্য পরে বুঝেছি।

এক দিন আমি দাদি আর আফরিনকে নিয়ে ছাদে গিয়েছি। ওখান থেকে পাশের বাসার ছাদে ইঁদুর দেখে ভয় পাই। আমি লুকিয়ে লুকিয়ে আফরিনকে নিয়ে দেখছিলাম ইঁদুরটাকে। তখন পাশের বাসা থেকে এক আন্টি বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। আমি বললাম, আন্টি দেখো একটা ইঁদুর। তোমার দরজা বন্ধ করে দাও। সে তোমার ঘরে ঢুকে যাবে। আন্টি বললেন, তোমার নাম কী? আমি বললাম, ঈপ্সিতা। এই আন্টিটা বড় হলেও বড়দের মতো না। কীভাবে বুঝলাম? বলছি।

খেলার সময় এক দিন আফরিনের সঙ্গে আমার ঝগড়া হয়। তা দেখে মা আমার ওপর রাগ করেন। বলেন, আফরিনকে সরি বলো। আফরিন তো আমার খেলার সাথী। ওর সঙ্গে তো প্রতিদিন অনেকবার ঝগড়া হয় আবার পরে মিলও হয়ে যায়। অন্যদিন তো সরি বলি না। আমার বা আফরিন কারোই মনে থাকে না কিছুই। তাহলে আজ কেন বলতে হবে? মা তো জানেন না এসব। তাই মা রাগ করেন। আমি সরি বলি কিন্তু মন খারাপ হয়। আমি জানালা ধরে দাঁড়িয়েছিলাম সেদিন। তখন ওই আন্টি ছাদে এলেন। আমাকে দেখে ‘হাই’ দিলেন, বললেন, কী মন খারাপ? আমি বললাম, আন্টি, তুমিই বলো খেলার বন্ধুর সঙ্গে একটু, এই এইটুকু ঝগড়া হলে কি সরি বলতে হয়? আন্টি তখন কী বললেন জানো? বললেন, বললেও হয়, তবে না বলাই ভালো! তখনই আমি বুঝলাম, আন্টি অনেক জানেন, বড়দের মতো দেখতে হলে কী হবে আন্টি একদম বড়দের মতো না।

আন্টির সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর আমার খুব মজা হলো। জানালা দিয়ে ডাক দিলেই আন্টি হাজির। আন্টির সঙ্গে আমার অনেক কথা হয়। আন্টিও আমার মতো মাটি নিয়ে, ঘাস নিয়ে খেলা করেন। আমি এক দিন জিজ্ঞেস করলাম, আন্টি তুমি কী করো? আন্টি বললেন, মালা তৈরি করি। ফুলের মালা আমি দেখেছি। কিন্তু ঘাসের মালা দেখিনি। আমি বললাম, ফুল কই? আন্টি বললেন, ঘাসের মালা। দাঁড়াও তোমাকে একটা ঘাসের মালা করে দিচ্ছি। সত্যিই আন্টি কী সুন্দর একটা ঘাসের মালা তৈরি করে দিলেন। আন্টি খুব ভালো। শুধু ঘাসের মালা না। আমাকে মাটির সুন্দর সুন্দর পুতুলও দেন। ওগুলো অবশ্য আন্টি বানাতেন না। আন্টি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন বাবার কথা, মার কথা, আর কে কে আছে। আমি তাকে আফরিনের কথা, দাদির কথা, মৌমিতার কথা বললাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তোমার কে কে আছে? আন্টি বললেন, আমার কেউ নেই। আমার তুমি আছো। আমি বললাম, না, সব বাসায় বেবি থাকে। যাও, তোমাদের বাসার বেবি আনো। খেলা করি। আন্টি বললেন, তুমিই আমার বেবি। আসো আমরা খেলি। তারপর থেকে আমি আর আন্টিই খেলি।

এক দিন আমাদের ছাদে, আন্টিদের ছাদে, সব ছাদেই অনেক সুন্দর সুন্দর পতাকা। দেখতে সুন্দর লাগছিল। কিন্তু হঠাৎ সব ছাদে এত এত পতাকা কেন বুঝতে পারছিলাম না। আফরিনকে জিজ্ঞেস করলাম, আফরিনও জানে না। আন্টির মজার ব্যাপার কি জানো? আন্টি দেখতে বড় হলেও আসলে ছোট, মানে ছোটদের মতো আর কী, কিন্তু বড়দের ব্যাপার-স্যাপারও বোঝে। আন্টিকে জিজ্ঞেস করতেই বুঝিয়ে দিলেন কেন এত পতাকা। অনেক বড় একটা খেলা হচ্ছে, তার নাম বিশ্বকাপ, অনেক দেশ খেলছে সেই খেলায়, সেসব দেশের পতাকা এগুলো। আমার মনে পড়ল, তাই তো বাবাও তো টেলিভিশনের শব্দ বন্ধ করে খেলা দেখেন। রাতে খেলা হয় তো, টেলিভিশনের শব্দে যদি আমার ঘুম ভেঙে যায় তাই বাবা শব্দ বন্ধ করে খেলা দেখেন। কিন্তু তার পরও কখনো কখনো ঘুম ভেঙে গেলে আমি দেখেছি বাবাকে খেলা দেখতে। এত বড় একটা ব্যাপার হচ্ছে আর আমি জানিই না। আমার এত মন খারাপ হলো যে বলার না। আফরিন বারবার বলতে লাগল, কী হয়েছে? মন খারাপ কেন, মন খারাপ কেন? আমি একটা কথাও বললাম না। মন খারাপের সময় কি কথা বলতে ইচ্ছে হয়, না বলা যায় যে, আমার এই বিষয়ে মন খারাপ! বললাম না, আফরিন বড় হয়ে গেছে, ও অনেক কিছু বোঝে না। আন্টি কিন্তু বুঝে ফেললেন আমার কেন মন খারাপ। সেদিন কিছুই জিজ্ঞেস করেননি। পরদিন আমাকে ডাকলেন, ঈপ্সিতা! আমি জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি, আন্টির হাতে একটা রঙিন বল। কী যে সুন্দর! আন্টি বললেন, এই যে তোমার বল এইটা। তুমি খেলবা। কিন্তু বল খেলে তো মাঠে। ঘরের ভেতরে বল খেলতে আমার একদম ভালো লাগছিল না। আন্টি না, সেটাও বুঝে ফেললেন! আন্টি বললেন, তুমি আর আফরিন আসো আমাদের বাসায়। এই ছাদে আমরা খেলব। আন্টিদের ছাদটা সত্যি সুন্দর। আন্টি আবার ছাদে মাঠের মতো বানিয়েছেন দাগ টেনে। আন্টি আমাকে দেখিয়ে দিলেন কীভাবে এটা খেলে। হাত দিয়ে খেলা যায় না। পা দিয়ে খেলতে হয়। গোল দিতে হয়। আন্টি গোল বেশি দিলে আন্টি জিতবেন আর আমি গোল বেশি দিতে পারলে আমি জিতব। প্রথম দিন আন্টি জিতেছিলেন। তারপর আর কোনো দিন আন্টি জিততে পারেননি। আমরা প্রতিদিন খেলি। এখন আমাদের খেলা দেখতে অন্য ছাদেও ভিড় হয়। কোনো দিন খেলা শুরু করতে একটু দেরি হলে অন্য ছাদের আন্টিরা বলেন, কী ব্যাপার আজ তোমাদের ছাদের মাঠে বিশ্বকাপ খেলা হবে না? নামটা আমার ভালোই লেগেছে। আন্টিরও নিশ্চয়ই ভালোই লাগবে। ভাবছি আমাদের বল খেলার নামটা ‘ছাদের মাঠে বিশ্বকাপ’ই রেখে দেব।