নির্বাচনে জিততে আ.লীগের তিন করণীয়

আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জিতবে, এমন আত্মবিশ্বাসের কথা জানিয়ে দিয়েছেন দলের প্রধান শেখ হাসিনা। তবে এ জন্য দলের নেতাদের তিনটি করণীয় ঠিক করে দিয়েছেন তিনি। আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেছেন, এ তিনটি কাজ করতে পারলে আগামী নির্বাচনে বিজয় অনেকটাই নিশ্চিত হয়ে উঠবে।

গতকাল শনিবার দুপুরে গণভবনে যৌথ মুলতবি সভায় আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা দলের নেতাদের তিনটি করণীয় ঠিক করে দেন। সভা সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

দলের যৌথ মুলতবি বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

বৈঠকে উপস্থিত একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে জানান, দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা তিনটি করণীয় ঠিক করে দিয়ে সেগুলো বাস্তবায়নের নির্দেশনা দিয়েছেন। এই তিন করণীয় হলো দলের ভেতর দ্বন্দ্ব-কোন্দল ভুলে যেতে হবে। দলকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। বিএনপির শাসনামলের চিত্র ও আওয়ামী লীগের শাসনামলের উন্নয়ন জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষ ভুলে যায়, কিন্তু প্রচারের মাধ্যমে মানুষকে মনে করিয়ে দিতে হবে।

সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করতে বিদেশে নিযুক্ত দূতাবাসগুলোকে আরও সক্রিয় করে তুলতে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদ, উপদেষ্টা পরিষদ ও জাতীয় কমিটির সদস্যরা পরামর্শ দেন দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, শুধু দূতাবাসগুলো সক্রিয় হলেই হবে না, ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে জবাব দিতে হবে। তখনই তিনি নেতাদের এসব করণীয় ঠিক করে দেন।

এ ছাড়া গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি নিয়ে উপদেষ্টারা বক্তব্য দেন। তারা নির্বাচনের আগে জ্বালানি ও পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধের পরামর্শ দেন। জবাবে শেখ হাসিনা বলেছেন, সরকার এ ব্যাপারে কাজ করছে।

বৈঠক সূত্র আরও জানায়, যৌথসভায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের নেতাদের মধ্য থেকে কেউ বক্তব্য দেননি। জাতীয় কমিটি ও উপদেষ্টা পরিষদের প্রায় ২০ জন সদস্য বিভিন্ন পরামর্শ তুলে ধরেছেন তাদের বক্তব্যে। সেসব বক্তব্যের নোট নেন প্রধানমন্ত্রী। রুদ্ধদ্বার ওই সভায় সবার বক্তব্য শেষ হলে সমাপনী বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। সেখানে তিনি বলেন, সবাইকে মানসিক প্রস্তুতি রাখতে হবে, নিজেদের বিভেদ ভুলতে হবে। দ্বন্দ্ব দূর করে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে যেকোনো মূল্যে। এ সময় বিএনপির সরকারবিরোধী আন্দোলন নিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘গণতান্ত্রিক আচরণে আন্দোলন-সংগ্রাম যে কেউ করতে পারে। এতে সরকার পরিশুদ্ধ হবে। কিন্তু বিএনপির আন্দোলন ক্ষমতা দখলের, সেখানে জনগণের কল্যাণ নিহিত নেই। বিএনপি খুনির দল। ওই দলের অত্যাচার-নির্যাতন আওয়ামী লীগকেই বেশি সহ্য করতে হয়েছে। আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতাকর্মীকে তারা হত্যা করেছে।’

উপদেষ্টা ও জাতীয় কমিটির নেতা যারা বক্তব্য দিয়েছেন তাদের মূল কথা হচ্ছে, ২০২৩ সালের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও সংগঠনের তৃণমূলকে শক্তিশালী করা। তারা দলকে ঐক্যবদ্ধ করতে দলীয় সভাপতির নির্দেশনা চান। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় নেতাদের আরও বেশি সক্রিয় হওয়ার পরামর্শ দেন।

বক্তব্য দেন উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য কাজী আকরাম উদ্দিন, অধ্যাপিকা সুলতানা শফি, সাবেক রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ জমির, রাশিদুল আলম, ইনাম আহমেদ চৌধুরী, সাদেকা হালিম প্রমুখ।

আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার বক্তব্য উদ্ধৃত করে একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র হচ্ছে। সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।’

এর আগে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও সাবেক রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ জমির বলেন, লবিস্ট নিয়োগ করে সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিকভাবে ষড়যন্ত্র চলছে। তা মোকাবিলায় দূতাবাসগুলোকে আরও বেশি সক্রিয় হতে হবে। জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, এসব অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সবাইকে জবাব দিতে হবে। 

বৈঠকে উপস্থিত অন্তত পাঁচ নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যৌথসভায় নেত্রীকে (শেখ হাসিনা) খুবই আত্মবিশ্বাসী মনে হয়েছে। এর আগে এমনটা মনে হয়নি।’ ওই নেতারা বলেন, ‘তিনি আমাদের বলেছেন আগামীতে আওয়ামী লীগ আবারও ক্ষমতায় আসবে ইনশা আল্লাহ। তিনি বলেছেন, আমরা অনেক কাজ করেছি। এই কাজের সুফল জনগণ পাচ্ছে এবং জনগণ আওয়ামী লীগকেই ভোট দেবে। তার কোনো বিকল্প নাই।’

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে বিএনপির আন্দোলনের বিষয়ে কথা বলেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, ‘বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য আন্দোলন করেছিল। তারা কিন্তু ফখরুদ্দীনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হওয়া নির্বাচনে ২৯ আসন পেয়েছিল।’

সমাপনী বক্তব্যে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর থেকে অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়েছে। সব সময় সেটার শিকার হয়েছি আমরা (আওয়ামী লীগ)। তাদের ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’

বিএনপির আন্দোলন নিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি আবারও বলেছেন, নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করলে কোনো বাধা দেওয়া হবে না। কিন্তু তারা যদি ২০১৩, ১৪ এবং ১৫ সালের মতো অগ্নিসন্ত্রাস, জ্বালাও-পোড়াও করে তাহলে তার জবাব কঠোরভাবে দেওয়া হবে।

বৈঠক সূত্রে আরও জানা গেছে, জাতীয় কমিটির নেতাদের জেলায় জেলায় সংগঠনকে শক্তিশালী করার জন্য কাজ করতে নির্দেশ দিয়েছেন শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে তাদের কেন্দ্রীয় কমিটি, প্রয়োজনে দলীয় সভাপতির কাছে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ওই সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকের শুরুতে উপস্থিত নেতাদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা হয় আওয়ামী লীগ সভাপতির পক্ষ থেকে। প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনের বাগানে দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে শেখ হাসিনা আমন্ত্রিত জ্যেষ্ঠ নেতাদের খাবার পরিবেশন করেন। পাশাপাশি সব টেবিলে গিয়ে কথা বলেন। দুপুরের বিরতির পরে আবারও বৈঠক শুরু হয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতির সমাপনী বক্তব্যের মাধ্যমে বিকেল ৩টার পর যৌথসভা শেষ হয়।

বৈঠকের পর আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী আগামী নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। পাশাপাশি বলেছেন, আওয়ামী লীগ জনগণকে উন্নয়নের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেগুলো বাস্তবায়ন করে চলেছে। শতভাগ বিদ্যুৎ, রাস্তাঘাট, মেট্রোরেল, পদ্মা সেতুসহ যোগাযোগ অবকাঠামো ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটিয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার।