বাংলাদেশের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এ বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল তৎকালীন পূর্ববঙ্গীয় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি। তারা দেশের সবস্তরের মানুষকে নিয়ে গড়ে তোলেন স্বাধীন বাংলার দাবি, জন্ম হয় বাংলাদেশ নামের একটি স্বাধীন দেশের। কিন্তু শুরুটা কেমন ছিল বাংলাদেশের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের? লিখেছেন বিপুল জামান
বঙ্গভঙ্গ বাংলার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। একজন গভর্নরের পক্ষে বাংলা প্রেসিডেন্সির মতো বড় প্রদেশ শাসন করা ছিল কঠিন। তা ছাড়া ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষে বাংলায় শুরু হয় জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম। এ আন্দোলনকে স্তিমিত করতে এবং প্রশাসনিক কাজ সহজ করার জন্য লর্ড কার্জন ১৯০৫ সালে উত্তর ও পূর্ব বাংলাকে আসামের সঙ্গে যুক্ত করে গঠন করেন ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’ নামের এক নতুন প্রদেশ। এ প্রদেশের রাজধানী করা হয় ঢাকা। আর পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও উড়িষ্যা নিয়ে গঠিত হয় ‘পশ্চিমবঙ্গ’ প্রদেশ। কিন্তু তীব্র বিরোধিতার মুখে ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়।
বঙ্গভঙ্গের ফলে শিক্ষা, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে এগিয়ে যাওয়ার যে সুযোগের সূত্রপাত হয়েছিল তা বিনষ্টে স্বভাবতই আশাহত হয়েছিলেন পূর্ববঙ্গের অধিবাসীরা। তাদের প্রতিনিধি হয়ে নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী, শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হকসহ অন্য নেতারা ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পূর্ববঙ্গে শিক্ষার প্রসারে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাব করেন। এই সাক্ষাতের তিন দিন পর ১৯১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন লর্ড হার্ডিঞ্জ। এরই ফলে পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের প্রশাসনিক কার্যক্রম চালানোর জন্য নির্মিত বিভিন্ন ভবন নিয়ে গড়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ৬০০ একর জমি নিয়ে যাত্রা শুরু করে। জনশ্রুতি রয়েছে ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য নিজ পরিবারের ৬০০ একর জমি দান করেন। এ কারণেই কৃতজ্ঞতাস্বরূপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্যার সলিমুল্লাহর নামে একটি হলের নামকরণ করে ‘স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম হল’। প্রকৃতপক্ষে এটি একটি প্রচলিত গুজব বৈ কিছু নয়। (১*) এর কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সরকারি খাসজমিতে। এই জমি আগেই পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের প্রশাসনিক কাঠামো নির্মাণের জন্য অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। বঙ্গভঙ্গ রদ হলে সেই নবগঠিত প্রশাসনিক ভবনগুলোকে নিয়েই গড়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থিত পুরনো প্রতিটি স্থাপনার রয়েছে অন্য পরিচয়। কার্জন হল, জগন্নাথ হল, শহীদুল্লাহ হল, রোকেয়া হল প্রতিটি স্থাপনার আজকের পরিবর্তিত রূপে পৌঁছানোর পেছনে রয়েছে চমকপ্রদ ইতিহাস। বাংলা একাডেমি, ঢাকা মেডিকেল কলেজ এসব স্থাপনা শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপনা ছিল।
কার্জন হল : পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের জন্য নির্মিত টাউন হলের নামকরণ করা হয়েছিল কার্জন হল। বঙ্গভঙ্গ রদের পর এটি হয় ঢাকা কলেজের গ্রন্থাগার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার, পরীক্ষার হল এবং প্রথম সমাবর্তনের ভেন্যু হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। বর্তমানে কার্জন হল বিজ্ঞানসংশ্লিষ্ট অনুষদসমূহের পরীক্ষার হল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
বাংলা একাডেমি : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অবস্থিত বাংলা একাডেমি আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশ ছিল। তখন শুধু বর্ধমান হাউজের অস্তিত্ব ছিল। শুরুতে এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিথিশালা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ইতিহাসবিদ শরীফ উদ্দিন আহমেদ সম্পাদিত ঢাকা কোষে বলা হয়েছে, ‘১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর এই ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল। ব্রিটিশ শাসন পরিষদের তিন সদস্যের একজন অবিভক্ত বাংলার বর্ধমানের মহারাজা স্যার বিজয় চাঁদ মাহতাব ১৯১৯ থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে কিছুকাল এই বাড়িতে থাকেন বলে এর নাম হয় বর্ধমান হাউজ।’ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও পরবর্তীকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য রমেশচন্দ্র মজুমদার ও কাজী মোতাহার হোসেন এই ভবনে বসবাস করেছেন। এ সময়ে এই দুই শিক্ষকের আতিথ্য গ্রহণ করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর বর্ধমান হাউজ পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবন ছিল। যুক্তফ্রন্ট বিজয়ী হলে তারা ঘোষণা করে, পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বর্ধমান হাউজে থাকবেন না। এখানে বাংলা ভাষার গবেষণাগার তৈরি হবে। ১৯৫৫ সালের ৩ ডিসেম্বর এখানে বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ : বর্তমান ঢাকা মেডিকেল কলেজ ভবনটিই ছিল নবপ্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবন। পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের সচিবালয় বা প্রশাসনিক ভবন হিসেবে এটি নির্মিত হয়েছিল। পাকিস্তান সৃষ্টির পর এর একটি অংশ পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসনিক ভবন বা সচিবালয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষার দাবিতে তৎকালীন কলাভবনের গেট থেকে অর্থাৎ বর্তমান ঢাকা মেডিকেল কলেজের পূর্বভাগের গেট থেকেই ছাত্র-জনতা মিছিল নিয়ে তৎকালীন পার্লামেন্ট হাউজ বা পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক ভবনের দিকে যাত্রা শুরু করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এটি ফিল্ড হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। যুদ্ধের পর এখানে প্রতিষ্ঠিত হয় মেডিকেল কলেজ।
উপাচার্য ভবন : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য ভবন নবগঠিত প্রদেশের গভর্নর হাউজ হিসেবে নির্মিত হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সৃষ্টির শুরু থেকে এটি উপাচার্য ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলার কারণ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলার একটি কারণ হলো, এটি অক্সফোর্ডের মতোই আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়। আরেকটি কারণ হলো, এর পাঠক্রমের সঙ্গে অক্সফোর্ডের পাঠক্রমের সামঞ্জস্য ছিল। ছাত্রাবাসেও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় সহযোগিতা করতেন হাউজ টিউটররা। এটি ছিল একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। শিক্ষায় পিছিয়ে থাকা এ অঞ্চলে ছাত্রছাত্রীদের পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য ক্লাসে শিক্ষাদানই যথেষ্ট ছিল না। এভাবে তিল তিল করে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ একসূত্রে গাঁথা।
* তথ্যসূত্র :
১. সরদার ফজলুল করিম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজ: অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের আলাপচারিতা (১৯৯৩), সাহিত্য