দেশের আসন্ন খাদ্য ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এজন্য কৃষি ও এসএমই খাতের উৎপাদন বৃদ্ধিতে একের পর এক পুনঃঅর্থায়ন স্কিম ঘোষণা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোকে কৃষিখাতে বিনিয়োগ বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোও কৃষিখাতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। এছাড়া কৃষিখাতে বিনিয়োগে খেলাপি হওয়ার প্রবণতা কম থাকায় এ খাতে বিনিয়োগ আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থ বছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) কৃষি ও পল্লীঋণ বিতরণ হয়েছে ১৬ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা। যা লক্ষ্যমাত্রার ৫৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ। আর এই ঋণের পরিমাণ আগের বছরের একই সময়ে বিতরণ করা ঋণের চেয়ে ২ হাজার ১৭৩ কোটি টাকা বা ১৩ শতাংশ বেশি। গত মাসের চেয়ে এটি ৩ হাজার ৮৯৩ কোটি টাকা বেশি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। করোনা মহামারি ও বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে কৃষির গুরুত্ব ব্যাপকহারে পরিলক্ষিত হচ্ছে। তাই কৃষি খাতে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের মাধ্যমে সহায়তা করতে বাংলাদেশ ব্যাংক সচেষ্ট রয়েছে। এমতবস্থায় ব্যাংকগুলো যদি এই খাতের প্রতি গুরুত্ব দেয় তবে আসন্ন খাদ্য বা অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা বাংলাদেশের জন্য সহজ হয়ে যাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, গত অর্থবছরে ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ২৮ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা ধরা হলেও ব্যাংকগুলো তার চেয়েও বেশি বিতরণ করেছে। যা লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ১০২ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে কৃষি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ৩০ হাজার ৯১১ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। যার মধ্যে অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই লক্ষ্যমাত্রার ৫৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ ঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকগুলো।
আর চলতি বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ১১ হাজার ৭৫৮ কোটি এবং বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ১৯ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রথম ৬ মাসে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাংকগুলো ৬ হাজার ৭০৩ কোটি বা লক্ষ্যমাত্রার ৫৭ দশমিক ০১ শতাংশ এবং বিদেশি ও বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো ৯ হাজার ৯৬৭ কোটি বা লক্ষ্যমাত্রার ৫২ দশমিক ৪ শতাংশ ঋণ বিতরণ করেছে। গত ছয় মাসে কৃষি ও পল্লীঋণ খাতে সবচেয়ে বেশি ঋণ বিতরণ করেছে রাষ্ট্রের বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। ব্যাংকটি এই সময়ের মধ্যে ঋণ বিতরণ করেছে ৩ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। যা লক্ষ্যমাত্রার ৫৯ দশমিক ৬৯ শতাংশ। আর কোন ঋণ বিতরণ করেনি বিদেশি কমার্শিয়াল ব্যাংক অব শিলং ও উরি ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে (জুলাই) দেশে কৃষিঋণ বিতরণ হয়েছে ১ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা, দ্বিতীয় মাসে (আগস্ট) বিতরণ হয়েছে ২ হাজার ১৭৩ কোটি টাকা, তৃতীয় মাসে (সেপ্টেম্বর) কৃষিঋণ বিতরণ হয়েছে ২ হাজার ৭৪৭ কোটি টাকা, চতুর্থ মাসে (অক্টোবর) বিতরণ হয়েছে ২ হজার ৮৮৫ কোটি টাকা, পঞ্চম মাসে (নভেম্বর) ৩ হাজার ৩০৮ কোটি টাকা বিতরণ হয়েছে। আর সর্বশেষ ডিসেম্বরে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ৩ হাজার ৮৯৩ কোটি টাকা।
সে হিসাবে অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই কৃষি ও পল্লীঋণ খাতে মোট ১৬ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ হয়েছে। অর্থাৎ চলতি অর্থ বছরের প্রথম মাস থেকেই ঋণ বিতরণে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। গত বছরের একই মাসে কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণ হয়েছিল ১৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা। সে হিসেবে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এবার ঋণ বিতরণ বেড়েছে ২ হাজার ১৭৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে কৃষিখাতে ঋণ বিতরণ বেড়েছে ১৩ শতাংশ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি (২০২২-২৩) অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ১৬ হাজার ৪৩০ কোটি টাকার ঋণ শোধ করেছেন কৃষকরা। গত বছরের একই সময়ে আদায় হয়েছিল ১৩ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা। সে হিসেবে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় আদায় বেড়েছে ২ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা, যা একই সময়ের তুলনায় ১৭ দশমিক ২৬ শতাংশ বেশি।
বর্তমানে ব্যাংক খাতে কৃষিঋণের স্থিতি বা পরিমাণ ৫০ হাজার ৯৯৭ কোটি টাকা, যার মধ্যে ডিসেম্বর পর্যন্ত কৃষি খাতে খেলাপি ঋণ ৩ হাজার ৮১৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকা, যা মোট ঋণের ৭ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
কৃষিঋণের মধ্যে দুই ভাগে অর্থাৎ শস্য-ফার্ম (যেমন: গবাদিপশু ও মৎস্য খামার) এবং নন ফার্ম খাতে ঋণ দেওয়া হয়। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে শস্যে ৭ হাজার ৯১৫ কোটি, পোল্ট্রিতে ৩ হাজার ৪৮৫ কোটি এবং মৎস খাতে ২ হাজার ১৮ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া নন-ফার্মে ২ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে।
বৈশ্বিক খাদ্য অর্থনৈতিক সংকট ও খাদ্যের পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগামীতে খাদ্য সংকট আরও প্রকট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির নির্দেশনা রয়েছে। এ জন্য কৃষি ঋণ বিতরণে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা রয়েছে। এসব কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কৃষি ঋণ বিতরণ বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।