কারুশিল্পীদের মিলনমেলায় মুখর বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের লোকজ উৎসব। আবহমান বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে প্রতি বছর নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে এ উৎসবের আয়োজন করা হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাহারি কারুপণ্য নিয়ে এবারের উৎসবে অংশ নিয়েছেন ৬৪ জন দক্ষ কারুশিল্পী। এদের মধ্যে ১৭ জন নারী।
হাজার বছর ধরে এদেশে বৈচিত্র্যময় যেসব লোক কারুশিল্পের প্রচলন ছিল সেসব লোকশিল্পকে বর্তমান প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতেই এ উৎসবের আয়োজন হয়ে আসছে।
উৎসবে রাজশাহীর শখের হাঁড়ি, সোনারগাঁওয়ের নকশিকাঁথা, চট্টগ্রামের তালপাতার পাখা, ঝিনাইদহ ও মাগুরার শোলাশিল্প, সোনারগাঁয়ের কাঠের হাতি-ঘোড়া ও কাঠখোদাই কারুশিল্প, পাটজাত কারুশিল্প, রংপুরের শতরঞ্জি, মুন্সীগঞ্জের শীতলপাটি, মানিকগঞ্জের তামা-কাঁসা ও পিতলের কারুপণ্য, ঠাকুরগাঁওয়ের বাঁশের ঢালা-কুলা, কিশোরগঞ্জের টেরাকোটা ও টেপাপুতুল শিল্প, সিলেটের মণিপুরী তাঁতশিল্প, মানিকগঞ্জের বাঁশের কারুশিল্প, সোনারগাঁওয়ের নকশি হাতপাখা, একতারা শিল্প, খাগড়াছড়ির ক্ষুদ্র নৃ-গাষ্ঠীর কারুপণ্য, মুন্সীগঞ্জের পটচিত্র, সোনারগাঁয়ের কামারশিল্প, কুমিল্লার বাঁশি শিল্প ও তাঁতের জামদানি শাড়ি শিল্পসহ কারুপণ্যের বৈচিত্র্যময় সমারোহ ঘটেছে।
উৎসব প্রাঙ্গণে কুঁড়েঘরের আদলে তৈরি সারি সারি স্টলে কারুশিল্পীরা তাদের কারুপণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন। লোকজ উৎসবের মূল আকর্ষণ এ কারুশিল্পীরা। তারা এখানে বসে কারুপণ্য তৈরি ও বিক্রি করছেন। ফলে উৎসবে আসা দর্শনার্থীরা কারুশিল্পীদের কারুপণ্য তৈরির কলাকৌশল সরাসরি দেখার সুযোগ পাচ্ছেন। পাশাপাশি কারুশিল্পীদের কাছে থেকে পছন্দ অনুযায়ী কারুপণ্য কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। এতে করে কারুশিল্পীদের সঙ্গে ক্রেতাদের মেলবন্ধন তৈরির পাশাপাশি ঐতিহ্যের সঙ্গেও পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এটিই বাংলাদেশে একমাত্র উৎসব যেখানে এত বেশিসংখ্যক কারুশিল্পী একত্র হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।
বিলুপ্তপ্রায় লোক ও কারুশিল্পকে টিকিয়ে রাখার জন্য এবং কারুশিল্পীদের উৎসাহিত করতে উৎসবে অংশ নেওয়া কারুশিল্পীদের ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে বিনামূল্যে স্টল বরাদ্দসহ দৈনিক ভিত্তিতে সম্মানীও দেওয়ারও ব্যবস্থা করা হয়েছে। কারুশিল্পীদের দক্ষতা উন্নয়ন, পণ্য সঠিকভাবে বাজারজাতকরণ ও তাদের পণ্যের ন্যায্য মূল্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। বিশেষ করে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কারুশিল্পীদের মানোন্নয়নের চেষ্টা করছেন তারা।
রাজশাহী থেকে উৎসবে আসা শখের হাঁড়ির প্রবীণ কারুশিল্পী সুশান্ত পাল জানান, বাংলাদেশের কারুশিল্প এখন প্রায় বিলুপ্তির দ্বার প্রান্তে। এখন কেউ এ পেশা ধরে রাখতে আগ্রহী নয়। সবাই উন্নত জীবনযাপনের জন্য ভিন্ন পেশায় চলে যাচ্ছেন। আমি এ পেশায় থেকে বহু দেশ ভ্রমণ করেছি, কিন্তু অবস্থার কোনো পরির্বতন হয়নি। শিল্পকে ধরে রাখতে হলে আর্থিক কষ্ট মেনে নিয়েই ধরে রাখতে হবে।
বেতের তৈরি পণ্যের কারুশিল্পের সোনারগাঁয়ের পরেশ চন্দ্র দাস জানান, তিনি দীর্ঘদিন যাবৎ এ উৎসবে অংশ নিচ্ছেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের কারুশিল্পীরা এখানে একত্র হয়, এজন্য বেশ ভালো লাগে। তবে নিজের বেতশিল্প নিয়ে তিনি অনেকটা হতাশ।
তিনি বলেন, এ শিল্পের কাঁচামাল বেত সংগ্রহ করতে হিমশিম খেতে হয়। গ্রামগঞ্জের আনাচে-কানাচে আগে সহজেই বেতের ঝাড় থেকে বেত সংগ্রহ করা যেত। এখন সেগুলো নেই বললেই চলে তাই বিদেশি বেত কিনে কাজ করতে হয়।
উৎসবের আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের উপ পরিচালক রবিউল ইসলাম জানান, বাংলাদেশে এটিই একমাত্র উৎসব যেটি লোক ও কারুশিল্পকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হয়। এখানে কারুশিল্পের পাশাপাশি বিলুপ্ত প্রায় লোক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, গ্রামীণ খেলা ও আবহমান বাংলার লোকায়ত ঐতিহ্য যেমন বর-কনে, জামাইকে পিঠা খাওয়ানো, গ্রাম্য সালিশ, গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান ইত্যাদি স্থানীয় শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে দর্শনার্থীদের সামনে পরিবেশন করা হচ্ছে। উৎসবে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী পুতুল নাচ, বায়স্কোপ ও নাগরদোলার ব্যবস্থা।