যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ায় উদ্ধারকাজে দুর্ভোগ

ভূমিকম্পে বিপর্যস্ত সিরিয়ায় বিঘ্নিত হচ্ছে উদ্ধার কার্যক্রম। যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলটিতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ধুলোয় মিশে যাওয়া অবকাঠামো, যন্ত্রপাতির অভাব এবং প্রবল ঝড়-বৃষ্টি।

সোমবার (৬ ফেব্রুয়ারি) স্থানীয় সময় ভোররাত ৪টা ১৭ মিনিটের দিকে তুরস্কের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। আর এর উৎপত্তি তুরস্কের সিরীয় সীমান্তবর্তী শহর গাজিয়ান্তেপে। সেদিন বিকেল নাগাদ আশপাশের এলাকায় অন্তত ৫০টি আফটারশক অনুভূত হয়, যার মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী কম্পনটির মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৫।

মঙ্গলবার (৭ ফেব্রুয়ারি) কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, সিরিয়ায় ভূমিকম্পে ১ হাজার ৪৪৪ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করেছে কর্তৃপক্ষ। হতাহতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে।

ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইদলিব প্রদেশ। সরকারবিরোধী বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এই এলাকায় ধ্বংসস্তূপ থেকে দুর্গতদের উদ্ধারের মতো পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি নেই বলে জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলেকে জানিয়েছেন স্থানীয় সাংবাদিক ওমর আলবাম।

ইদলিবের প্রায় ৩০ কিলোমিটার উত্তরে তুরস্কের সীমান্তবর্তী শহর সারমাদা। সেখানেই থাকেন এই সাংবাদিক। তিনি জানান, শহরটি বলতে গেলে ধুলোয় মিশে গেছে। দুইবার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে সেখানে। সিরিয়ায় চলমান যুদ্ধে রাশিয়ার বিমান হামলার কারণে আগে থেকেই শহরের ভবনগুলো নাজুক অবস্থায় ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।

যুদ্ধবিধ্বস্ত ভবনগুলো থেকে মানুষকে উদ্ধারে সাহায্য করতে কয়েক বছর আগে কাজ শুরু করে হোয়াইট হেলমেট নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী দল। ভূমিকম্পের পর তেমন কোনো যন্ত্রপাতি না থাকলেও তারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া মানুষগুলোকে উদ্ধারের। তবে এ কাজে বেশ দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তাদের।

ভূমিকম্পের পর সেখানকার কয়েকটি এলাকায় মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে গেছে। সাংবাদিক ওমর আলবাম বলেন, ‘ঠিক কত লোকের মৃত্যু হয়েছে এর সঠিক কোনো তথ্য এখনই জানা সম্ভব নয়। পরিস্থিতি খুব জটিল’।

হোয়াইট হেলমেট জানিয়েছে, তারা প্রায় ৭০০ মরদেহ এবং আহতাবস্থায় দুই হাজারের মতো মানুষকে উদ্ধার করেছে। যদিও স্থানীয়রা বলছেন, শুধু হোয়াইট হেলমেটের সাহায্যই পর্যাপ্ত নয়। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর এগিয়ে আসা উচিত। আর কিছু না হোক, অন্তত ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে মানুষকে উদ্ধার এবং চিকিৎসা-সহায়তাটুকু করা দরকার।

স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, ‘ভয়ঙ্কর এক অভিজ্ঞতা। আমরা কখনো কল্পনাও করিনি, যেন কেয়ামত ঘটে গেছে। আমি ও আমার পরিবার বেঁচে গেছি, কয়েকজন প্রতিবেশীও প্রাণে রক্ষা পেয়েছে। কিন্তু আমাদের চোখের সামনেই অসংখ্য ভবন মাটিতে মিশে গেছে। আমাদের ভবনেই মারা গেছেন পাঁচজন’।

অন্যদিকে দেশটিতে বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হয়েছে সরকারি বাহিনী নিয়ন্ত্রিত এলাকা আলেপ্পো। সেখানেও উদ্ধারের পর্যাপ্ত সরঞ্জামাদি নেই। সাধারণ মানুষ যে যার মতো করে সাহায্যের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

৩০ বছর বয়সি স্থানীয় এক নারী জানান, যারা উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছেন, তাদের বেশিরভাগই বেসামরিক লোকজন। খালি হাতে ধ্বংসস্তূপ সরানোর চেষ্টা করছেন তারা। কোনো যন্ত্রপাতি নেই। ফলে তারা নিজেরাই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়তে পারেন।

এর আগে সিরিয়ার সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় জানায়, ভূমিকম্পবিধ্বস্ত আলেপ্পো, লাতাকিয়া, হামা ও তারতুস এলাকায় বেশকিছু ঐতিহাসিক ভবন ধ্বংস হয়ে গেছে। অন্যতম প্রাচীন ও বিশালাকৃতির প্রাসাদ আলেপ্পো সিতাদেলের বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। তবে প্রাসাদটি এখনো দাঁড়িয়ে আছে। অটোমান আমলের প্রাসাদটির ভেতরে একটি মসজিদের মিনারেও আংশিক ক্ষতি হয়েছে।

ইউনোস্কোর ঐতিহ্যবাহী শহরের তালিকাভুক্ত আলেপ্পোতে অন্যান্য ঐতিহাসিক ভবনের ক্ষয়ক্ষতি পরিমাপের জন্য কারিগরি দল কাজ করছে বলে জানিয়েছে তারা।