চট্টগ্রামে প্রায় প্রতিদিনই নির্মাণশ্রমিকের হতাহতের খবর আসছে। সেফটি গার্ড না থাকায় কেউ মরছে নির্মাণাধীন কোনো স্থাপনার ছাদ ধসে পড়ে, কেউ উঁচু ভবনের দড়ি ছিঁড়ে, আবার মাচা ভেঙে নিচে পড়ে। গত মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে নগরের বাকলিয়া থানাধীন কল্পলোক আবাসিকের ২ নম্বর সড়কের ডি ব্লক এলাকায় নির্মাণাধীন ৯তলা ভবন থেকে পড়ে তিন শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। ভবন মালিক ও ঠিকাদারকে আসামি করা হয়েছে। তবে আসামিরা পালিয়েছেন। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছেন বাকলিয়া থানার ওসি আবদুর রহিম।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) গবেষণা সেল এবং সাপোর্ট সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে ২০২২ সালে কর্মরত অবস্থায় মারা গেছেন ২৩৮ জন শ্রমিক। এর মধ্যে নির্মাণশ্রমিক ৩৫ জন। সরকারি ও বেসরকারি সব পর্যায়ে কর্মস্থলে নিরাপদ পরিবেশ ও স্বাস্থ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ২০১৩ সালে জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেফটি নীতিমালা ২০১৩ প্রণয়ন করে। কিন্তু এই নীতিমালা কেউ মানে না। প্রশাসনের উদাসীনতা, নজরদারির অভাব এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতার কারণে শ্রমিকদের মৃত্যুর মিছিল দিন দিন বাড়ছে।
বিলসের সহকারী প্রোগ্রাম অফিসার ফজলুল করিম মিন্টু বলেন, ‘সারা দেশের মতো চট্টগ্রামেও শ্রমিকরা কাজ করতে গিয়ে কর্মক্ষেত্রে বারবার দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মারা যাচ্ছেন। অনেকেই অকালে প্রাণ হারাচ্ছেন এবং অনেকে চিরতরে পঙ্গু হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
জানা গেছে, মঙ্গলবার বাকলিয়া থানাধীন কল্পলোক আবাসিকের ৯তলার সানসেট পলেস্তারা করার সময় মাচা ভেঙে ওই তিন শ্রমিক নিচে পড়ে যান। ঘটনাস্থলেই দুজনের মৃত্যু হয়। আরেকজন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তারা হলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ থানার উত্তর জগন্নাথপুরের মো. ইসমাঈলের ছেলে মো. ইস্রাফিল, ঠাকুরগাঁওয়ের হাতিয়া থানার বাংলানাগা গ্রামের মো. বদুর ছেলে মো. রিপন এবং রাজশাহীর সাকিম আলী। ভবনের মালিক দুবাইপ্রবাসী মাহবুব। এ ঘটনায় সাকিম আলীর ভাই হাকীম আলী বাকলিয়া থানায় মামলা করেছেন। এতে ভবন মালিক মাহবুব ও ঠিকাদার মো. জামালকে আসামি করা হয়েছে।
গতকাল বুধবার সকাল ১০টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, কল্পলোক আবাসিকের ডি ব্লকে দুই শতক জায়গার ওপর গড়ে উঠেছে দুবাইপ্রবাসী মাহবুবের ৯তলা ভবন। ভবনের বাইরে পলেস্তারা হয়নি। ভবনটির গ্রাউন্ড ফ্লোরে ঢোকার পথে কয়েকটি বাঁশ দিয়ে বেষ্টনী দিচ্ছেন কেয়ারটেকার নুরুল হক।
প্রশ্ন করলে জানান, গতকালের দুর্ঘটনার সময় তিনি উপস্থিত ছিলেন না। ঘটনার পর থেকে ভবন মালিক মাহবুব ও ঠিকাদার জামাল কোথায় আছেন, তা তিনি জানেনও না।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী মো. রিপন নামে এক কিশোর জানায়, তখন বেলা ১১টা। ভবনটির ৯তলায় দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে মাচার ওপর দাঁড়িয়ে সানশেড পলেস্তারা করছিলেন তিন শ্রমিক। হঠাৎ করে তারা মাটিতে পড়ে যান। এ সময় দুজনের সাড়াশব্দ ছিল না। আরেকজন কাতরাচ্ছিলেন। দ্রুত তাদের হাসপাতালে পাঠায় রিপনসহ আশপাশের আরও কয়েকজন।
বাকলিয়া থানার ওসি আবদুর রহিম বলেন, ‘এ বিষয়টা আমারও নজরে এসেছে। শুক্রবার জুমার নামাজের আগে এলাকায় মাইকিং করব। শ্রমিকদের সেফটির জন্য ভবন মালিকদের সচেতন করা হবে।’
এদিকে তিন শ্রমিকের মৃত্যুর খবর পেয়ে গতকাল মঙ্গলবার ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষর অথরাইজড অফিসার মো. হাসান। এ ব্যাপারে চউকের ডেপুটি চিফ টাউন প্ল্যানার মো. আবু ঈসা আনসারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তিন শ্রমিকের মৃত্যুর জন্য যারা দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’