পড়ার সময় পড়া আর...

কঠোর শাসনের ঘেরাটোপ থেকে শিক্ষার্থীরা অপেক্ষাকৃত স্বাধীন জীবনের প্রথম স্বাদ পায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর। অনেকেই আবেগের আতিশয্যে ভুলেই যায় বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের প্রবেশ উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য। মুক্ত স্বাধীন ক্যাম্পাস জীবনের বাঁকে বাঁকে রয়েছে চোরাবালি। পরিকল্পিত রুটিনবদ্ধ জীবনযাপন করতে না পারলে উচ্চশিক্ষার সোনার হরিণ মেলে না। লিখেছেন বিপুল জামান

বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরে প্রবেশের আগে সব শিক্ষার্থীকেই পার হতে হয় ভর্তি পরীক্ষার বৈতরণী। ভর্তি পরীক্ষার দুর্লঙ্ঘ বাধা পেরোনোর জন্য অভিভাবক ও শিক্ষকরা তাদের এই বলে উৎসাহিত করেন যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলে এই কঠোর তপস্যার শেষ হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে তেমন পড়াশোনা করতে হয় না। শিক্ষার্থীরা ভর্তির পর অভিভাবকদের কথা আক্ষরিকভাবে বিশ্বাস করে।  নতুন পরিচয় হওয়া বন্ধু, সদ্য ভর্তি হওয়া ক্যাম্পাস আর প্রথম পাওয়া স্বাধীনতা উদযাপনে মগ্ন থাকেন তারা। দিন যায়। পরীক্ষার আগে পড়াশোনা করে এই দুস্তর পারাবার পার হওয়ার চেষ্টা করে। ফলাফল খারাপ রেজাল্ট অথবা ইয়ার ড্রপ বা সেমিস্টার ড্রপ, হতাশা, অভিভাবক, শিক্ষক, বন্ধুদের কটুকথা, বকাঝকা। এসব অনেকের পক্ষেই মেনে নেওয়া সম্ভব হয় না। কেউ কেউ বেছে নেন আত্মহননের মতো হঠকারী পথ। অথচ একটু সচেতন হলেই সম্ভব হবে পড়াশোনা ঠিক রেখেই জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময় ক্যাম্পাস লাইফকে উদযাপন।

ক্যাম্পাস জীবনে পড়াশোনা ও অন্যান্য সবকিছুর সুসমন্বয় কীভাবে করতে পারেন শিক্ষার্থীরা জানতে চাই এনপিএল প্রশিক্ষক ও লাইফকোচ মো. মিরাজ হোসেনের কাছে। মিরাজ হোসেন শিক্ষার্থীদের এই সমস্যার জন্য দায়ী করেন অভিভাবক, শিক্ষক তথা সমাজের তৈরি কিছু ভুল ধারণাকে। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য শিক্ষার্থীদের যুদ্ধ করে আসতে হয় আমি বলব। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়ার ব্যাপারটি তাই তাদের কাছে বিজয় অর্জনের মতো একটি বিষয়। তারা এটি উদযাপন করতে চায় এবং তারা উদযাপন করবে। কিন্তু কিছু ভুল ধারণার ভুল দৃষ্টিভঙ্গির ফেরে পড়ে তারা ভুল করেন। তিনি উচ্চশিক্ষার পথে কিছু চোরাবালির কথা উল্লেখ করেন।

 শিক্ষার্থীরা মনে করেন ক্যাম্পাসে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো পড়াশোনা নেই। এ কারণে তারা সারা বছর পড়াশোনা না করে পরীক্ষার আগে পড়তে বসেন। কিন্তু সারা বছর ক্লাস না করলে বেসিক বিষয়গুলো জানা থাকে না ফলে পরীক্ষার আগে অথই সাগরে পড়েন। সেক্ষেত্রে ফলাফল ভালো হয় না। ক্যাম্পাসে পড়াশোনা নেই এটা হলো ভুল কনসেপ্ট। এটা তো পড়াশোনারই জায়গা, বিশ্ববিদ্যালয় তো উচ্চশিক্ষা অর্জনের স্থান। আড্ডা-গল্প-বন্ধুত্ব সামাজিক সংগঠন সবকিছু হবে পড়াশোনাকে ঠিক রেখে। পড়ার সময় পড়া আর অবসর সময়ে স্কিল ডেভেলপমেন্ট, সমাজসেবা, বাকি সব।

 শিক্ষার্থীদের আরেকটা ভুল ধারণা হলো, সিজিপিএ গুরুত্বপূর্ণ নয়। এটা ঠিক না। যেকোনো চাকরির জন্য একটি সিজিপিএ নির্ধারিত থাকে যার নিচে ফলাফল থাকলে আবেদন করা যায় না। তাছাড়া ভাইভার সময়েও কিন্তু জানতে চাওয়া হয় সিজিপিএ কত। তাই সিজিপিএ কমপক্ষে ৩.৫ থাকলে ভালো হয়, ন্যূনতম ৩.০ তো থাকতেই হবে। সিজিপিএ গুরুত্বপূর্ণ নয় এটা বুঝতে বুঝতে সময় চলে যায়, অনার্স মাস্টার্স শেষ হয়ে যায়। হা-হুতাশ করা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না।

 অনেকে মনমতো বিষয় না পেলে বিষয়ভিত্তিক পড়াশোনায় আর মনোযোগী হন না তারা বিসিএসের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। বিসিএসের জন্য দীর্ঘ প্রস্তুতির দরকার আছে সত্য কিন্তু প্রথম বর্ষ থেকে শুরু করতে হবে বিষয়টা এমন না। বিভাগীয় পড়াশোনায় মনোযোগী হতে হবে। কারণ এই বিষয়ের ওপরেই যেহেতু তার ডিগ্রি সেহেতু সব জায়গায় কিন্তু এ বিষয়ে কিছু না কিছু জিজ্ঞেস করা হবে। ফলে অ্যাকাডেমিক বিষয়ে বেসিক ধারণাগুলো অর্জন করতে হবে। তাছাড়া এ সময়ে সামাজিক সংগঠন, ক্যাম্পাসের যে সংগঠন আছে সেগুলোতে যুক্ত হতে হবে, তাহলে নেট-ওয়ার্কিংটা ভালো হবে, পরিচিতি বাড়বে। এগুলো খুব সাহায্য করে পরবর্তী জীবনে। কিছু গুণাবলি আছে যেগুলো সংগঠনে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করলেই শেখা সম্ভব সেগুলো অর্জন করা যায় না বই পড়ে।

 অনেকে নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য মাদক গ্রহণ করে থাকে। জীবনে সবকিছুর অভিজ্ঞতা নেওয়ার দরকারও নেই। নেগেটিভ জিনিসের অভিজ্ঞতার দরকার নেই। পজেটিভ বিষয়গুলো ঠিক রাখতে হবে। পড়াশোনা ঠিক রাখতে হবে, ক্যারিয়ারের জন্য নিজেকে যোগ্য করে তুলতে হবে, ক্যাম্পাসে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে।

এগুলো থেকে বাঁচতে শিক্ষার্থীদের নিয়মতান্ত্রিক ও রুটিনবদ্ধ জীবনযাপন করতে হবে। ক্যাম্পাসে পড়াশোনার পাশাপাশি আনন্দ-মজা-বন্ধুত্ব সব হবে কিন্তু একটা রুটিন থাকবে, পরিকল্পনা থাকবে, শর্টটার্মে কী লাভ, লং টার্মে কী লাভ, এগুলো বিচার বিবেচনা করে তাদের এগোতে হবে, তাহলে ভুল করবে না, সময় ব্যবস্থাপনাও সুন্দর হবে।

ছবি : আবুল কালাম আজাদ