তুরস্ক-সিরিয়ায় স্মরণকালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের এক সপ্তাহ পেরিয়েছে। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী দুই দেশ মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা ৩৬ হাজার ছাড়িয়েছে। ভূমিকম্পের পর সাত দিনে এখন চারদিকে কেবল ধূলিসাৎ ভবন, বাতাসে লাশের গন্ধ। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তুরস্কে ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থলের কাছাকাছি শহর কাহরানমারমারাসের ধসে পড়া ভবনের নিচে এখনো অনেক মৃতদেহ চাপা পড়ে আছে। ৬ দিন পেরিয়ে গেছে, এছাড়া রোদের তাপে এসব মরদেহ পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।
এদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ায় মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে আসা ভূমিকম্পে উদ্ধার এবং ত্রাণ তৎপরতা নিয়ে দেখা দিয়েছে হতাশা। বলছে, গত বছর থেকেই কলেরার প্রকোপ বাড়তে থাকা সিরিয়ায় এই ভূমিকম্প নতুন শঙ্কা জাগাচ্ছে। সহায়তাকারী ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, ‘ভয়াবহ ভূমিকম্পে কলেরার প্রকোপ বৃদ্ধি পেতে পারে।’
মানবিক বিপর্যয়ের চ্যালেঞ্জ
লণ্ডভণ্ড তুরস্ক-সিরিয়ায় এখন মূল চ্যালেঞ্জ মানবিক সংকট মোকাবিলা। দুই দেশে আঘাত হানা এই ভূমিকম্পকে শত বছরের সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্যোগ বলে অভিহিত করেছেন জাতিসংঘের জরুরি ত্রাণ বিষয়ক প্রধান মার্টিন গ্রিফিথস। উদ্ধার তৎপরতাও শেষের দিকে বলে জানিয়েছেন তিনি। জাতিসংঘের এই কর্মকর্তার মতে এখন দরকার মানবিক সহায়তা। বিশেষ করে আশ্রয়, খাদ্য এবং মানসিক সাহায্য নিশ্চিতের আহ্বান তার। সিরিয়ার আলেপ্পো পরিদর্শনে গিয়ে তিনি বলেন, ‘ভূমিকম্পে রক্ষা পাওয়া যাদের সঙ্গে কথা বলেছি তাদের চেহারায় ভয়াবহতা দেখে আসার মানসিক আঘাতের ছাপ স্পষ্ট। বিশ্বের এখন এই ক্ষত সারাতে এগিয়ে আসতে হবে।’ ভূমিকম্পে প্রাণে রক্ষা পেলেও মারাত্মক ভীতি নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন তুরস্কের কাহরানমারমারাসের বাসিন্দা সেদাত কাভসুত। তিনি আলজাজিরাকে বলেন, ‘এখন সবচেয়ে বড় বিষয় হয় ভীতি। এখন কোনো ভবনে ঢুকলে প্রস্রাবও করতে পারি না, এত ভয় লাগে।’
জাতিসংঘের বরাতে ব্রিটিশ গণমাধ্যম গার্ডিয়ান জানিয়েছে, তুরস্ক-সিরিয়ায় কমপক্ষে ৮ লাখ ৭০ হাজার মানুষের এখন গরম খাবার দরকার। সিরিয়ায় ৫৩ লাখ মানুষ গৃহহীন। তুরস্কে ৮০ হাজার মানুষ হাসপাতালে এবং ১০ লাখের বেশি মানুষ আছে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে। দক্ষিণ তুরস্কের আদানায় কাজ করছেন অ্যাকশন এগেইনস্ট হাঙ্গারের কর্মী আনা মোরা সেগুরা। বিবিসিকে তিনি জানান, অত্যাবশ্যকীয় জিনিসের চাহিদার তালিকাটি বেশ লম্বা। অন্তর্বাস থেকে শুরু করে মাথাগোঁজার তাঁবুর সংকট চলছে। তিনি বলেন, ‘জীবন বাঁচাতে বাড়ি থেকে পালানো মানুষেরা এক কাপড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন। এখন খোলা আকাশের নিচে এত মানুষের মধ্যে থাকতে হলে অবশ্যই ন্যূনতম ব্যক্তিগত পরিধেয় থাকার দরকার মনে করছেন তুর্কিরা, বিশেষ করে নারীরা। এখানে আমাদের আরও তাঁবু দরকার। বিধ্বস্ত এলাকার হাজার হাজার বাসিন্দাকে এই তীব্র শীতে মাথাগোঁজার ঠাইটুকু তো নিশ্চিত করতে হবে।’
সিরিয়ায় সংকটে ত্রাণ, তুরস্কে নিরাপত্তা
ভূমিকম্পে সিরিয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল। সেখানকার বহু মানুষ দ্বিতীয়বারের মতো গৃহহীন হয়েছেন। দেশটিতে প্রায় এক যুগ ধরে চলা গৃহযুদ্ধের কারণে এর আগেও তারা বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন। এরপরও সরকার নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের তুলনায় তারা সামান্যই ত্রাণসহায়তা পেয়েছেন। মার্টিন গ্রিফিথস এক টুইটে বলেছেন, ‘আমরা এখনো উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ার দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারিনি।’ তিনি বলেন, ওই এলাকার বাসিন্দারা ঠিকই নিজেদের অবহেলিত ভাবছেন। বিষয়টি দ্রুত সমাধান করা দরকার। জাতিসংঘের এক মুখপাত্র বলেছেন, অনুমোদন না দেওয়ায় সরকার নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল থেকে বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে ত্রাণ সরবরাহের কাজ থমকে গেছে। এ অঞ্চলের বেশির ভাগের নিয়ন্ত্রণ করছে হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস) নামের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী। ইদলিবে এইচটিএসের একটি সূত্র রয়টার্সকে বলেছে, সরকার নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল থেকে কোনো ধরনের ত্রাণবাহী বহর ঢুকতে দেবে না তারা।
নজিরবিহীন দুর্যোগে যখন মানুষ দিশেহারা, সে সময়ে তুরস্কের শহরে লুটপাটের ঘটনাও ঘটছে। এদিকে এখনো সিরিয়ার সব অঞ্চলে দুর্গত মানুষের জন্য ত্রাণ নিয়ে যেতে পারেনি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। তুরস্কের ইতিহাসে ১৯৩৯ সালের পর এবারের ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে। এই ভূমিকম্পে শুধু তুরস্কে এখন পর্যন্ত ৩১ হাজার ৬৪৩ জনের মৃত্যুর খবর জানিয়েছে দেশটির দুর্যোগ বিষয়ক দপ্তর। এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে আছেন বহু মানুষ। জাতিসংঘের আশঙ্কা, ভূমিকম্পে দুই দেশে নিহতের সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। দুর্যোগে বিপর্যস্ত তুরস্কের সহায়তায় বিভিন্ন সংস্থা ও দেশ এগিয়ে এলেও এখনো দেশটিতে দুর্গত মানুষকে আশ্রয় ও তাদের কাছে খাবার পৌঁছে দেওয়া চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। এর মধ্যে গোষ্ঠীগত সংঘাত ও লুটপাট সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। গেল শনিবার তুরস্কে উদ্ধারকাজ স্থগিতের ঘোষণা দেয় জার্মানির দুটি সংস্থা। কারণ হিসেবে তারা একাধিক গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষের কথা জানায়। স্থানীয় লোকজনও লুটপাটের কথা জানিয়েছে। ভূম্পিকম্পে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দক্ষিণ–পূর্বাঞ্চলীয় শহর কাহরানমানমারাস শহরের এক বাসিন্দা বলেন, তার ঘরে থাকা সব অলংকার চুরি হয়ে গেছে। এখানকার বাস্তুহারা বাসিন্দারা বলছেন, নিজেদের বিধ্বস্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ির যত দূর সম্ভব কাছেই তারা তাঁবু টানিয়ে থাকছেন। লুটপাট ঠেকাতে তারা এই ব্যবস্থা নিয়েছেন। এছাড়া লুটেরাদের ভয়ে দোকান থেকে মালপত্র সরিয়ে নিতে শুরু করেছেন দোকানিরা। তুরস্কের মধ্যাঞ্চলীয় আন্তাকায়া শহরে দোকানিরা নিজেদের দোকান খালি করতে শুরু করেছেন। মালপত্র সরিয়ে নিচ্ছেন অন্যত্র। তাদের ভাষ্য, এমনটা করা হচ্ছে লুটেরাদের ভয়ে। ইলেকট্রনিক পণ্যের দোকান থেকে শুরু করে মুদি, ওষুধের দোকানসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাট হয়েছে। বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, তুরস্কে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা থেকে লুটপাট থামাতে বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা। মার্কেটগুলোতে টহল দিচ্ছে সেনাসদস্যরা। দুর্গত এলাকাগুলোতে ডাকাতির অভিযোগে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৯৮ জনকে। নৈরাজ্য ঠেকাতে ক্ষতিগ্রস্ত ১০ প্রদেশে নিরাপত্তা জোরদার করেছে তুর্কি সরকার। তুরস্কের অর্থনীতি এমনিতেই মূল্যস্ফীতিতে আক্রান্ত ছিল। এর ওপর এলো ভয়াবহ ভূমিকম্প। তুরস্কের সরকারি হিসাব বলছে এই ভূমিকম্পে দেশটির প্রায় ৯ লাখ কোটি টাকার ক্ষতি হয়ে গেছে।
জীবিত অথবা মৃত স্বজনের আশায়
তুরস্কে গাজিয়ানতেপ, কাহরানমারমারাসের ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে জীবিত কাউকে উদ্ধারের আশা স্তিমিত হয়ে এসেছে। তবে ধসে পড়া কংক্রিটের জঞ্জালের নিচ থেকে কয়েকজনকে এখনো জীবিত অবস্থায় উদ্ধারের ‘অলৌকিক’ ঘটনা ঘটছে। তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর আদিয়ামানে ভূমিকম্পের ১৭৮ ঘণ্টা পর একটি ছোট্ট মেয়েকে উদ্ধার করা হয়েছে। প্রায় কাছাকাছি সময়ে হাতায়া প্রদেশে ভূমিকম্পে ভেঙে পড়া একটি তিন তলা ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ৭০ বছর বয়সী নুরে গুরবাজকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। এরকম ‘অলৌকিক’ভাবে বেঁচে থাকারাই এখনো আশার আলো দেখাচ্ছেন নিখোঁজদের স্বজনদের।
স্বজনরা তাই তীব্র শীতে কোনো রকমে আগুন জ্বালিয়ে ধসে পড়া ভবনের সামনেই বসে থেকে উদ্ধারকারীদের কাজ দেখছেন। বিবিসি ওয়েদার বলছে, তুরস্ক-সিরিয়ায় ভূমিকম্প উপদ্রুত অঞ্চলে আসন্ন সপ্তাহে তীব্র ঠাণ্ডা বিরাজ করবে। তুরস্কের গাজিয়ানতেপ ও সিরিয়ার আলেপ্পোতে রাতের তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে থাকতে পারে।