খুলনার আলোচিত রহিমা বেগম ‘অপহরণ’ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। গতকাল সোমবার সকালে মামলার তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্ত কর্মকর্তা খুলনা মহানগর হাকিম আদালতে প্রতিবেদনটি জমা দেন। প্রতিবেদনে অপহরণের অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় রহিমা বেগম এবং তার দুই মেয়ে মরিয়ম মান্নান ও আদুরি আক্তারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া অপহরণ মামলায় যে পাঁচজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। জমিসংক্রান্ত বিরোধের জেরে মেয়ে মরিয়ম মান্নানের নেতৃত্বেই প্রতিবেশীদের ফাঁসাতে রহিমা বেগমের অপহরণ নাটক সাজানো হয় বলে উল্লেখ করা হয় তদন্ত প্রতিবেদনে।
গতকাল এক প্রেস ব্রিফিংয়ে পিবিআইর পুলিশ সুপার সৈয়দ মুশফিকুর রহমান বলেন, তদন্তে রহিমা বেগমকে অপহরণের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি; বরং জমিসংক্রান্ত বিরোধে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে মরিয়ম মান্নানের নেতৃত্বে অপহরণের নাটক সাজানোর প্রমাণ মিলেছে। মূলত রহিমা বেগম অপহরণ হননি, তিনি স্বেচ্ছায় আত্মগোপনে গিয়েছিলেন। তিনি ২৮ দিন আত্মগোপনে ছিলেন। এই ২৮ দিন তিনি বিভিন্ন স্থান পরিবর্তন করেছেন।
২৭ অক্টোবর রাতে তিনি খুলনার মহেশ্বরপাশার বাসা থেকে আত্মগোপন করার পরে ঢাকায় চলে যান। ঢাকায় কিছুদিন অবস্থানের পর একটি ব্যাগে কিছু কাপড় ও ওষুধ দিয়ে মরিয়ম মান্নান তাকে বান্দরবান পাঠিয়ে দেন। সেখানে কিছুদিন অবস্থান করার পর তিনি চলে যান ফরিদপুরের বোয়ালমারী ইউনিয়নের সৈয়দপুর গ্রামের আবদুল কুদ্দুসের বাড়িতে। সংবাদ পেয়ে ওই বাড়ি থেকে রহিমা বেগমকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। তাকে উদ্ধারের পর তিনি কোনো কথাই বলছিলেন না। অনেক চেষ্টার পর কথা বলানো সম্ভব হলে তিনি জমিজমাসংক্রান্ত বিষয়ে প্রতিবেশীদের সঙ্গে ঝামেলা আছে উল্লেখ করে তারা অপহরণ করেছে বলে বিবৃতি দেন। পরে ২২ ধারায় জবানবন্দির জন্য আদালতে পাঠানো হলে তিনি একই রকমের মিথ্যা বক্তব্য দেন।
মুশফিকুর রহমান আরও বলেন, বিষয়টিকে ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’তে পরিণত করেছিলেন মরিয়ম মান্নান। পাশাপাশি ময়মনসিংহের ফুলপুরে ৩০ থেকে ৩২ বছর বয়সী এক নারীর অর্ধগলিত মরদেহকে তিনি নিজের মায়ের বলে চালিয়ে দেওয়ার নাটক করেছিলেন। এর কারণ ছিল যদি তাকে (নারীর মরদেহ) তার মা বলে চালিয়ে দেওয়া যেত, তাহলে প্রতিবেশীদের চিরতরে ফাঁসানো যেত এবং নিঃশেষ করা যেত। কিন্তু তিনি চিন্তা করতে পারেননি যে পুলিশ তার মাকে খুঁজে বের করে ফেলবে।
পিবিআইর পুলিশ সুপার বলেন, ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১৭ ধারা অনুযায়ী, রহিমা বেগম, তার মেয়ে মরিয়ম মান্নান এবং আরেক মেয়ে ও মামলার বাদী আদুরি আক্তারের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আদালতে সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া এই ‘অপহরণ নাটকের’ মাস্টারমাইন্ড মরিয়ম মান্নান। মরিয়ম মান্নান তার মাকে খুঁজে পাওয়ার জন্য দেশব্যাপী যে ক্রাইসিস সৃষ্টি করেছিলেন, সে কারণে আমরা একটু বেশি সময় নিয়ে তদন্ত করেছি। যাতে আমরা দেশবাসীকে আশ্বস্ত করতে পারি এবং সবাইকে একটা বার্তা দিতে পারি, পরে এ ধরনের ঘটনা ও নিজের মাকে লুকিয়ে রেখে এই ধরনের নাটক করতে কেউ যেন সাহস না পায়।’