হজের ব্যয় বৃদ্ধিতে বাড়ছে হতাশা

স্ত্রীকে নিয়ে পবিত্র হজব্রত পালনের জন্য ২০২০ সালে আট লাখ টাকা জোগাড় করেছিলেন টঙ্গীর বাসিন্দা মো. কামরুল ইসলাম। সেবার বেসরকারিভাবে হজে যাওয়ার ‘সাধারণ’ প্যাকেজের মূল্য ছিল জনপ্রতি ৩ লাখ ৬১ হাজার ৮০০ টাকা। তবে করোনা মহামারীর কারণে সে বছর শেষ মুহূর্তে হজে যেতে পারেননি তারা।

চলতি বছর হজপালনের পরিকল্পনা করছেন মো. কামরুল ইসলাম। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন, এ বছর বেসরকারিভাবে জনপ্রতি হজ প্যাকেজের মূল্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৭২ হাজার ৬১৭ টাকা। এটাই সর্বনিম্ন প্যাকেজ, তবে এটা তিন বছর আগের খরচের প্রায় দ্বিগুণ। সরকারি আয়োজনে প্যাকেজ মূল্য আরও ১০ হাজার টাকা বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে।

মো. কামরুল ইসলাম এখন ভাবছেন বাড়তি টাকা কীভাবে জোগাড় করা যায়। তার পরিকল্পনা বাড়ির সামনের দোকানের পজিশন বিক্রির। এ ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। না হলে হজপালনের পরিকল্পনাই বাদ দিতে হবে। মো. কামরুল ইসলামের মতো অনেকে হজ প্যাকেজের মূল্যবৃদ্ধির ফলে হজযাত্রা নিয়ে দোলাচলে পড়েছেন। কামরুল ইসলামের যদিও বিকল্পভাবে টাকা জোগাড়ের ব্যবস্থা আছে, যাদের নেই তাদের কী হবে?

খবরে প্রকাশ, এ বছর উড়োজাহাজভাড়া, মক্কা-মদিনার বাড়িভাড়া ও অন্যান্য পরিষেবা খরচ বেড়েছে। এর সঙ্গে ডলার ও সৌদি মুদ্রা রিয়ালের বিনিময় হার বৃদ্ধি পাওয়ায় সার্বিকভাবে হজপালনের খরচ বেড়েছে। গত বছরের হজ প্যাকেজের সঙ্গে তুলনা করে দেখা যায়, চলতি বছর বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে যাওয়া ও আসার উড়োজাহাজভাড়া বেড়েছে ৪০ শতাংশের বেশি। গত বছর যাওয়া-আসার (রাউন্ড ট্রিপ) ভাড়া ছিল ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা। এবার তা ৫৭ হাজার ৭৯৭ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ১ লাখ ৯৭ হাজার ৭৯৭ টাকা। সাধারণভাবে ঢাকা-জেদ্দা-ঢাকা পথে একটি রাউন্ড ট্রিপে উড়োজাহাজের টিকিটের মূল্য ধরা হয় ১ লাখ থেকে ১ লাখ ১০ হাজার টাকার মতো। সেই তুলনায় হজ প্যাকেজের উড়োজাহাজভাড়া অনেক বেশি। উড়োজাহাজভাড়ার পাশাপাশি বেড়েছে মক্কা ও মদিনায় হজযাত্রীদের বাড়িভাড়া। গত বছর হজ প্যাকেজে বাড়িভাড়া (ভ্যাটসহ) ছিল ৬ হাজার ৫০৪ রিয়াল বা ১ লাখ ৫৮ হাজার ৫৭ টাকা। এ বছর তা বেড়ে হয়েছে ৭ হাজার ২০১ রিয়াল বা ২ লাখ ৪ হাজার ৪৪৫ টাকা। গত বছর বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রতি রিয়ালের দাম ২৪ দশমিক ৩ টাকা হিসাব করা হয়েছিল। চলতি বছর তা হিসাব করা হয়েছে ২৮ দশমিক ৩৯ টাকা।

হজের সময় পাঁচ দিন ধরে মিনা, আরাফাহ ও মুজদালিফায় হজযাত্রীদের বিভিন্ন পরিষেবা দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে তাঁবুর ব্যবস্থা করা, তাঁবুতে ম্যাট্রেস, বিছানা, চাদর, বালিশ, কম্বল, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ও প্রতিদিনের খাবার সরবরাহ ইত্যাদি। মোয়াল্লেম সেবা হিসেবে পরিচিত এসব পরিষেবার জন্য খরচ গত বছর প্রাথমিকভাবে ২ হাজার ৫২০ রিয়াল বা ৬১ হাজার ২৩৬ টাকা (প্রতি রিয়াল ২৪ দশমিক ৩ টাকা ধরে) নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরে তা বেড়ে হয় ৫ হাজার ৬৫৬ রিয়াল বা ১ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। এ বছর এই খাতের খরচ মাত্র ২ রিয়াল বেড়েছে। তবে মুদ্রার বিনিময় হার বাড়ায় (প্রতি রিয়াল ২৮ দশমিক ৩৯ টাকা ধরে) তা ১ লাখ ৬০ হাজার ৬৩০ টাকা হয়েছে। এ ছাড়া চলতি বছর হজযাত্রীদের খাবার খরচ, জমজমের পানি, ভিসা ফি ও হজ গাইড বাবদ ব্যয় বেড়েছে।

হজের খরচ বৃদ্ধির কারণ বিশ্লেষণে এটা স্পষ্ট, হজের ব্যয় বৃদ্ধিতে সৌদি আরব এবং বাংলাদেশ যার যার অবস্থানে লাভের জায়গায় কোনো ধরনের ছাড় দেয়নি। অর্থাৎ লোভের হাত থেকে ছাড় পায়নি পবিত্র হজ খাত। হজের মতো ফরজ ইবাদত ও ধর্মীয় বিষয় নিয়ে এমন মুনাফাবাজি সাধারণ মানুষ কখনোই আশা করেনি। হজ থেকে তো কোনো সরকারেরই মুনাফা করার কথা নয়।

বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ মধ্যবিত্ত। প্রায় সবার শেষ আশা থাকে, আল্লাহর মেহমান হয়ে জীবনে একবার হলেও পবিত্র কাবা ঘর জিয়ারত ও নবীজির রওজায় উপস্থিত হয়ে সালাম পেশ করার। কিন্তু হজের ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অনেক হজযাত্রীই চোখের পানি ফেলে প্রাক-নিবন্ধন বাতিল করছেন।

২০২২ সালে বাংলাদেশ থেকে হজ প্যাকেজের মূল্য ছিল ৫ লাখ ২৭ হাজার ৩৪০ টাকা। একই বছর ভারতের হজ প্যাকেজ ছিল বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৫ লাখ ৭৬৩ টাকা আর পাকিস্তানের হজ প্যাকেজের মূল্য ছিল বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৩ লাখ ৩১ হাজার ৭৫২ টাকা। চলতি বছর বাংলাদেশি টাকায় ভারতের হজ প্যাকেজ মূল্য হচ্ছে প্রায় ৫ লাখ ১৫ হাজার ৮৪৬ টাকা আর পাকিস্তানের হজ প্যাকেজ মূল্য হচ্ছে ৩ লাখ ৫০ হাজার ৯৭২ টাকা।

গত জানুয়ারি মাসেও ১৫ দিনের ওমরাহ প্যাকেজের খরচ ছিল ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা থেকে দেড় লাখ টাকা। এই টাকায় উড়োজাহাজভাড়া, মক্কা-মদিনায় আবাসন, মক্কা-মদিনা যাতায়াত ও খাবার যুক্ত ছিল। সেখানে হজের সময় এমন অস্বাভাবিক খরচ বৃদ্ধির যৌক্তিক কোনো কারণ থাকতে পারে না।

প্রশ্ন হলো, বর্তমান অবস্থায় হজের ব্যয়বৃদ্ধির প্রভাব সম্ভাব্য হজযাত্রীরা কীভাবে মোকাবিলা করবেন? উত্তর, এ বছর বাংলাদেশ থেকে হজে যাওয়ার জন্য যারা নিবন্ধন করেছেন, হজের প্যাকেজ মূল্য বেড়ে যাওয়ার কারণে তাদের বড় একটি অংশই শেষ পর্যন্ত আর হজে যাবেন না। বাস্তবে তেমনটি ঘটলে সম্ভবত এ বছরই হবে এ ধরনের প্রথম ঘটনা যে কোটা বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত তা অপূর্ণ থেকে যাবে।

যদি বলা হয়, উড়োজাহাজভাড়া বেড়ে যাওয়ার কারণে প্যাকেজব্যয় বাড়াতে হচ্ছে, তাহলে বলব, হজযাত্রী পরিবহনের একচেটিয়া কর্র্তৃত্ব শুধু বাংলাদেশ বিমান ও সৌদি এয়ারলাইনসের ওপর ছেড়ে না দিয়ে সব এয়ারলাইনসের মধ্যে প্রতিযোগিতা সৃষ্টির জন্য তা উন্মুক্ত করে দেওয়া হোক। এমনটি করা হলে তাতে উড়োজাহাজভাড়া কমতে বাধ্য।

অন্যদিকে সৌদি আরবে পবিত্র কাবা অবস্থিত হওয়ায় পুরো হজ ব্যবস্থাপনা সৌদি সরকার করে থাকে। সৌদির সঙ্গে জড়িত হজপালনে যেসব আনুষঙ্গিক খরচ বেড়েছে, তা আন্তর্জাতিক বাজার ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কি নাসেটাও কূটনৈতিক পর্যায়ে আলাপ-আলোচনা করা যেতে পারে। সবদিক থেকে হজপালনে কিছুটা ব্যয় সাশ্রয় হলে স্বল্প আয়ের দেশের মানুষ হজপালনে আরও বেশি করে অংশ নিতে পারবেন। তাই সরকারকে দেশে এবং সৌদি আরবের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে সহনীয় মাত্রায় হজযাত্রার ব্যয় সর্বনিম্ন ৫ লাখ টাকার নিচে পুনর্নির্ধারণ করা প্রয়োজন বলে মনে করি। আর ব্যয়সাশ্রয়ের লক্ষ্যে হাজিদের দেখাশোনার জন্য ন্যূনতম পর্যায়ের লোকবল যুক্ত রেখে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে হজপালনের সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়েও সরকারের সিদ্ধান্ত কামনা করছি।

লেখক : শিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক লেখক

muftianaet@gmail.com