অলৌকিক ভ্রমণের প্রস্তুতি

মেরাজের ঘটনাটি মূলত মহান আল্লাহর কুদরতের বহিঃপ্রকাশ এবং তার হাবিব মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মানে আয়োজিত একটি অলৌকিক ভ্রমণ। হিজরত-পূর্ব মক্কি জীবনের কোনো এক রাতে দুই পর্বে বিভক্ত এই ভ্রমণের আয়োজন হয়। প্রথম পর্ব মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত, এটাকে বলে ‘ইসরা’। দ্বিতীয় ও মূল পর্ব সেখান থেকে ঊর্ধ্বাকাশে সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত ভ্রমণ, এটাকে বলা হয় ‘মেরাজ’। পবিত্র কোরআন-হাদিসের অকাট্য প্রমাণাদি এবং পঁচিশজন সাহাবির বর্ণনা দ্বারা নবী করিম (সা.)-এর জাগ্রত অবস্থায় দৈহিক মেরাজ প্রমাণিত। সশরীরে এমন ভ্রমণ সংঘটিত হওয়াই ছিল নবী করিম (সা.)-এর শ্রেষ্ঠ মোজেজা, যা এই ভ্রমণকে অলৌকিক এবং অসাধারণ করে তোলে। সংশয়বাদীদের সন্দেহের কেন্দ্রও এটাই। দৈহিক এই ভ্রমণকে অসম্ভব বলে মক্কার কাফেররা যাচাই-বাছাইয়ের পেছনে পরে। ঘটনা প্রমাণে তারা বিভিন্ন দলিল তলব শুরু করলে একপর্যায়ে আল্লাহতায়ালা মসজিদে আকসাকে নবীজির (সা.) দৃষ্টির সামনে ভাসিয়ে তোলেন আর তিনি দেখে দেখে সব বিবরণ দিতে থাকেন।

এমন অসাধারণ এক নৈশ ভ্রমণের জন্য কুদরতিভাবে আল্লাহর পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছিল ব্যাপক প্রস্তুতি। যার মধ্য দিয়ে নবী করিম (সা.)-কে মানসিক, আত্মিক এবং দৈহিক প্রস্তুত করে তোলা হয়েছিল। এর মাঝে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি প্রস্তুতি হলো

ছাদ খুলে ফেরেশতার আগমন : মক্কার যে ঘরে নবীজি (সা.) রাতযাপন করছিলেন হঠাৎ তার ছাদ খুলে গেল, আর ওই পথে হজরত জিবরাইল (আ.) ঘরে অবতরণ করলেন। অথচ তিনি ইচ্ছে করলে অন্য সময়ের মতো স্বাভাবিক পদ্ধতিতে আগমন করতে পারতেন। এতে অসাধারণ কিছু ঘটতে যাচ্ছে তার প্রতি ইঙ্গিত করে নবীজি (সা.)-কে মানসিকভাবে প্রস্তুত করা হয়।

বক্ষবিদীর্ণ : নবী করিম (সা.)-কে নিয়ে আসা হয় কাবা ঘরের উত্তর অংশ হাতিমে কাবায়। এখানে এসে তিনি কিছুটা তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লেন। এমতাবস্থায় ফেরেশতা তার বক্ষ বিদীর্ণ করে হৃৎপিণ্ড বের করেন। অতঃপর জমজমের পানি দিয়ে ধৌত করে স্বর্ণের এক পাত্র ভরা ইমান দ্বারা পরিপূর্ণ করে পুনরায় স্থাপন করলেন। এভাবে তার আত্মিক ক্ষমতা অনেক গুণ বৃদ্ধি করে মেরাজের জন্য প্রস্তুত করা হয়।

বিশেষ বাহন : এই ভ্রমণের প্রথম পর্ব ইসরার বাহন ছিল বোরাক। আকারে খচ্চর থেকে ছোট ও গাধার থেকে বড় এক জন্তু। সে একেক কদম রাখে দৃষ্টির শেষ প্রান্তে। এভাবে কয়েক পলকে নবী করিম (সা.)-কে পৌঁছে দেওয়া হয় ১ হাজার ৪৬৪ কিলোমিটার দূরের মসজিদে আকসায়। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘পরম পবিত্র ও মহিমাময় তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাত্রি বেলায় ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত।’ সুরা বনি ঈসরাইল : ১

অসাধারণ গতিতে জান্নাতি বাহনে প্রথম পর্বের ভ্রমণ সম্পন্ন করার মধ্য দিয়ে তাকে প্রস্তুত করা হয় মূল পর্ব তথা মেরাজের জন্য।

দুধপান করানো : মসজিদে আকসায় দুই রাকাত নামাজ আদায় করে তিনি আরও আধ্যাত্মিক শক্তি অর্জনে ধন্য হন। এরপর হজরত জিবরাইল (আ.) কয়েক প্রকার পানীয় সামনে পেশ করলে নবী করিম (সা.) সেখান থেকে শুধু দুধ গ্রহণ করেন। এভাবে ঊর্ধ্বাকাশে ভ্রমণের প্রাক্কালে বরকতময় দুধ পান করিয়ে তার মাঝে বিশেষ দৈহিক শক্তি সঞ্চারের ব্যবস্থা করা হয়।

বিশেষ সিঁড়ি : পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠ থেকে ওপরের দিকে দশ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত পরিব্যপ্ত রয়েছে ট্রপোস্ফিয়ার, স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার, মেসোস্ফিয়ার, থার্মোস্ফিয়ার, এক্সোস্ফিয়ার এবং ম্যাগনেটোস্ফিয়ার নামক ছয় স্তরের বায়ুমণ্ডল। এর কোনো স্তরে মাইনাস ৮০ ডিগ্রি পর্যন্ত ঠান্ডা আবার কোনো স্তরে ১৬০০ ডিগ্রি তাপমাত্রা রয়েছে। এসব প্রতিকূল স্তরসমূহ পার হওয়ার জন্য মেরাজ নামক বাহন ব্যবহার করা হয়। মেরাজ অর্থ সিঁড়ি। বিশেষ এই চলন্ত সিঁড়ি দেওয়া হয়েছিল প্রতিকূল বায়ুমণ্ডলে নিরাপদে ভেদ করার জন্য। যেভাবে হজরত মুসা (আ.)-এর জন্য লোহিত সাগরের

নবীদের সাক্ষাৎ : বিভিন্ন নবী-রাসুলদের সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা হয়। প্রথম আসমানে দেখা হয় হজরত আদম (আ.)-এর সঙ্গে আর সপ্তম আসমানে দেখা হয় হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর সঙ্গে। এর মধ্যবর্তী আসমানসমূহে অন্য নবীদের সাক্ষাৎ মেলে। এভাবে তাকে মহামহিয়ানের দিদারের জন্য চূড়ান্তভাবে প্রস্তুত করে তোলা হয়।