সাহিত্যপাড়ায় বয়সের চেয়ে মেধার গুরুত্ব বেশি

ইন্টারমিডিয়েট দ্বিতীয় বর্ষে প্রথম ছোটগল্প সংকলন বের করাটা, আবার সেই বই এতদিন যাদের লেখা পড়ে বড় হয়েছি তাদের হাতে অটোগ্রাফসহ তুলে দেওয়া নিঃসন্দেহে দারুণ অনুভূতি। পছন্দের লেখকদের সঙ্গে এখন বন্ধুত্ব হয়েছে, বয়সে প্রায় দুই-তিন গুণ বড় লেখকরা আপনি বলে সম্বোধন করছেন, এসব তো অনেকের স্বপ্নের বাস্তবায়ন। কিন্তু আমার লেখার উদ্দেশ্য কেবল আভাগার্দ লেখকদের সঙ্গে মিশতে পেরে হোমড়া- চোমড়া ভাব নেওয়া এই নয়। হয়তো আমি প্রথম লিখতে বসেছিলাম যখন ক্লাস টু’তে, তখন বাবার অনুকরণ করে একটা লেখক-লেখক ভাব আনতে চেয়েছিলাম, বাবা মা’র প্রশংসা চেয়েছিলাম (পেয়েছিও), কিন্তু এখন উদ্দেশ্য ভিন্ন।

আমি কামিং অফ এইজ সাহিত্য এবং সিনেমার বড় ভক্ত, পরাবাস্তবতাও টানে বেশ। তো, গত বছর রিচার্ড লিংকলেটারের বয়হুড নামের দীর্ঘ বারো বছর ধরে বানানো এক বাচ্চার শৈশব থেকে তারুণ্যে পদার্পণের কামিং অফ এইজ সিনেমাটা দেখতে গিয়ে আমি খেয়াল করি,  সিনেমাটা আসলে কিশোরের দৃষ্টিকোণ থেকে বানানো হলেও কিশোরের দৃষ্টিকোণ থেকে হয়নি ঠিক। পরিচালকের এত কসরতের পরেও সিনেমাটা হয়েছে স্মৃতির রোমন্থন। তাই আমি ঠিক করলাম, আমি এক কিশোরের দৃষ্টিকোণ থেকেই কিশোরের গল্প বলব। কিন্তু আমি ফ্যামিলি ড্রামা লিখতে পারি না। ক্লিশে মনে হয়। ফ্যামিলি ড্রামা যেহেতু এক কিশোরের জীবনের অবিচ্ছেদ্য বিষয়, তাই আমি ঠিক করলাম ফ্যামিলি ড্রামাই বলব আমি পরাবাস্তবতার মোড়কে। কিশোররা জীবনের এই পর্যায়ে কঠিন যেসব ঘটনা আর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয় তার ভয়াবহতা ঠিক কতটুকু, তা বোঝাতেই রূপকের আশ্রয় নেওয়া। অনেকে জিজ্ঞেস করেন, নিজেকে প্রকাশের আরও তো উপায় আছে, লিখতেই কেন হবে? এর উত্তর আমিও ঠিক জানি না। এর সম্ভাব্য কারণ দুটি। এক- আমি লিখতে ভালো পারলেও বাকপটু না, তাই সোশ্যাল মিডিয়ায় জনপ্রিয় ভøগ বা টুকটাক রিলসের মাধ্যমে প্রকাশ করার সুযোগ কিংবা ইচ্ছা কোনোটাই নেই। দুই- সাহিত্যের মাধ্যমে যেই গভীরতা আর ব্যাপ্তির সঙ্গে নিজেকে, কেবল নিজেকে কেন, নিজের অন্তর্ভেদী দৃষ্টি দিয়ে চারপাশকে উপস্থাপন করা যায়, তা টুকটাক দুয়েক মিনিটের রিল বা ভøগ কেন, অন্য কোনো শিল্পমাধ্যমেই হয়তো প্রকাশ করা সম্ভব না। সাহিত্যের কাজ হলো জীবনের মতো কঠিন জিনিসকে, এবং জীবনের নানা কঠিন প্যাঁচকে বোধগম্য করে উপস্থাপন করা, অন্যের দৃষ্টিকোণ থেকে জীবনকে দেখানো।

এত কম বয়সে লিখতে বসলেও প্রকাশের আত্মবিশ্বাস ছিল না। এক্ষেত্রে পেন্ডুলাম টিম সাহায্য করেছে ভীষণ। তাদের প্রথমে কেবল তিনটা গল্প পাঠাতেই তারা রাজি হয়ে যায় বই প্রকাশ করতে। এজন্য পেন্ডুলাম এবং রুম্মান আপুকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। এবং একটা জিনিস খেয়াল করলাম, সাহিত্যপাড়ায় বয়সের চেয়ে মেধার গুরুত্ব বেশি। কেবল সাহিত্যে কেন, সব ক্ষেত্রেই এমনটাই হওয়া উচিত নয় কি?

স্পন্দন তাহসান

বই : মৃতরা কি জানে, তারা মৃত? প্রকাশনী : পেন্ডুলাম