শাস্ত্রীয় সংগীতের আধুনিক ইতিহাস এবং উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এক রেখায় বয়নি। তারই ধারাবাহিকতায় বোধ করি অবিভক্ত বাংলার, বর্তমান বাংলাদেশ অংশে জন্ম নিয়েছেন, রাগ সংগীতের এমন মহান শিল্পীদের ইতিহাসকে লিপিবদ্ধ করতে গিয়ে আমাদের ইতস্তত করতে দেখা যায়। তার ওপর, কাকে কোন বর্গে ফেললে যথাযথ হয়, তাই নিয়েও বিশেষজ্ঞরা সংকটে পড়েন। যে শিল্পী জন্মেছেন পদ্মার পাড়ে কিন্তু প্রশিক্ষণ ও গুণের কদর পেয়েছেন কলকাতায়, তিনি কতটা আমাদের, আর কতটা ‘ওদের’? যে শিল্পী জন্মেছেন লাহোরে, গাণ্ডাবদ্ধ শিষ্য হয়েছেন উর্দুভাষী উস্তাদের, আর মুক্তিযুদ্ধের পর পাকাপাকিভাবে চলে এসেছেন ঢাকায়, তিনি কি ঢাকার শিল্পী নাকি লাহোরের শিল্পী?
গানকে গানের মতোই শিখতে গিয়ে বা গাইতে গিয়ে বা শুনতে গিয়ে সংগীততত্ত্ব নিয়ে আমরা ভাবি না; ভাবি না রাজনীতি নিয়েও। ওইসব বিতর্ক চলবেই। তাই ওইসবকে সরিয়ে রেখেই আমাদের মাটি থেকে উঠে আসা, তর্কাতীতভাবে প্রণম্য পাঁচজন শিল্পীর কথা অল্প কিছু শব্দে লিখে রাখতে চাই। এই তালিকা মূলত আমার নিজের পছন্দের অনুসারী, তবে এতে শুধু আমার রুচিগত পক্ষপাতই আছে, এমনটা মনে করি না। এতে শিক্ষার্থী হিসেবে আমার নিজের চর্চা ও আমার গুরুদের হাতে পাওয়া কিছু সাংগীতিক বিচারও প্রতিফলিত হয়েছে। তালিকাটি গবেষকদের কোনো কাজে আসবে না বলেই মনে হয়; এতে একেবারেই গানপ্রিয় মানুষদের কথা মাথায় রেখেছি : অভিজ্ঞতা বলে, এই মানুষেরা রাগ সংগীতকে বৈয়াকরণিকের জ্ঞান দিয়ে বুঝুন কিংবা না-বুঝুন, রসগ্রাহী শ্রোতা হওয়ার উৎসাহ তাদের আছে।
মহাকাব্যে পাঁচ প্রাতঃস্মরণীয় নারীর কথা বলা হয়েছে অহল্যা, দ্রৌপদী, কুন্তী, তারা, মন্দোদরি, এই পাঁচজন হচ্ছেন ‘পঞ্চকন্যা’। সেইমতো এই পাঁচজনও, পঞ্চরত্ন; প্রাতঃস্মরণীয় বললেও বেশি বলা হয় না।
১) বাবা আলাউদ্দিন খাঁ : ১৮৬২ সালে জন্ম, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। সত্যিকার অর্থেই যাকে ‘পলিম্যাথ’ অর্থাৎ বহু মাধ্যমে কৃতবিদ্য বলা যায়, আমাদের সর্বজনাব ‘বাবা’ আলাউদ্দিন খাঁ, সেই উচ্চতার শিল্পী। সেতার, সানাই, সরোদ, বেহালা, বাঁশি, মৃদঙ্গ, রবাব সঙ্গে আরও-আরও বাদ্যযন্ত্রের সম্ভাবনাকে উন্মোচন করার এক বিস্ময়কর অভিযানে ছিলেন তিনি। তার হাতে তৈরি হয়েছেন অসংখ্য যুগস্রষ্টা ও গুণিজন। পণ্ডিত রবিশঙ্কর, উস্তাদ আলি আকবর খাঁ (পুত্র), অন্নপূর্ণা দেবি (কন্যা), পণ্ডিত নিখিল ব্যানার্জি, পণ্ডিত ভি জি যোগ, বিদূষী শরণ রানি এদের প্রত্যেকের শিল্পী হয়ে ওঠার শুরু বাবা আলাউদ্দিন খাঁ’র শিষ্যত্ব গ্রহণের মধ্যে দিয়ে। মাইহারের রাজদরবারে সভাবাদক হিসেবে ছিলেন দীর্ঘদিন; সেইভাবেই পত্তন করেন সেনিয়া-মাইহার ঘরানার। শিক্ষক হিসেবে তার মেজাজ ছিল কুখ্যাত: খোদ অন্নদাতা রাজামশাইকেই তবলা পেটানোর হাতুড়ি ছুড়ে মেরেছিলেন, এমন গল্প চালু আছে। সংগীতকারদের রাজা বলেই মান্য করা হয় তাকে। নিজের ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতায় দেখেছি ও শুনেছি যে উপমহাদেশের সংগীতশিক্ষার উচ্চতর পীঠস্থানগুলোতে তাকে রাগদারি ও তন্ত্রকারির গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড ধরা হয়। ২০২৩-এ এসেও কোনো নতুন রাগের তালিম নেওয়ার সময় যখন গুরুকে জিজ্ঞেস করি, কার গায়ন বা বাজনা শুনলে রাগের স্বরূপ অনুধাবন করা সহজ হবে, অবধারিতভাবে বাবা আলাউদ্দিনের নাম আসে। মানুষ হিসেবে ও গুরু হিসেবে তিনি কতখানি অবিস্মরণীয় ছিলেন, তার নমুনা পাওয়া যায় রবিশঙ্করের ‘রাগ-অনুরাগ’ গ্রন্থে, ও পুত্র আলি আকবর খাঁ’র ‘আপনাদের সেবায়’ গ্রন্থে। তার সাংগীতিক উৎকর্ষের অজস্র নমুনার মধ্য থেকে ব্যক্তিগত পছন্দের তালিকায় জায়গা দিয়েছি রাগ হেম (তার সিগনেচার রাগ) আর রাগ জয়জয়ন্তীকে। জানি না, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তার ভিটার যে অংশটুকু ধর্মান্ধ উন্মাদদের হাতে সম্প্রতি তছনছ হয়েছে, তার কতটুকু সংস্কার করা সম্ভব হয়েছে।
২) পণ্ডিত তারাপদ চক্রবর্তী : জন্ম ১৯০৯ সালে, ফরিদপুরের কোটালীপাড়ায়। শুরু করেছিলেন তবলা শিল্পী হিসেবে, কিন্তু অমর হয়ে রয়েছেন কণ্ঠশিল্পী হিসেবে অনন্য অবদানের জন্য। তার গায়নের অসংখ্য নমুনা হয়তো সেইভাবে সংরক্ষিত হয়নি (যদিও ইউটিউবে ছায়া-হিন্দোল ও ছায়ানট রাগসহ বেশ কয়েকটা পরিবেশনা আছে), তবে তার সাংগীতিক যাত্রা জনশ্রুতিতে ধরা আছে। সতের বছর বয়সে কলকাতা যাত্রা করলেও শাস্ত্রীয় সংগীতের পথে তাকে অজস্র ঘাত-প্রতিঘাতের সামনে পড়তে হয়েছিল। বেতারে চাকরি করেছেন বেশ কিছুদিন, তার আগে শরণার্থী হিসেবে কুলিগিরি আর বাড়ি-বাড়ি চাল বিক্রি করার কাজও করেছেন। বার্ধক্যে এসে ভারত সরকারের পদ্মশ্রী খেতাব ফিরিয়ে দেন, হয়তো অল্প বয়সের সংগ্রামের কথা ভুলতে পারেননি বলেই। বিষ্ণুপুর আর কিরানা ঘরানার সংমিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন তিনি নিজের গানে; একই সঙ্গে বাংলা খেয়াল গানের ধারাও তার প্রবর্তিত। তার অজস্র সুযোগ্য শিষ্যের মধ্যে আছেন পণ্ডিত মানস চক্রবর্তী ও বিদুষী শ্রীলা চক্রবর্তী (দুই সন্তান)। আরেকটু কম গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু চমৎকার তথ্যাণু হচ্ছে : এখনকার কবি শ্রীজাত, পণ্ডিত তারাপদরই দৌহিত্র।
৩) পণ্ডিত পান্নালাল ঘোষ : ১৯১১ সালে জন্মেছেন, অবিভক্ত বাংলার বরিশাল জেলায়। মূলত তার কারণেই বাদ্যযন্ত্র হিসেবে বাঁশিকে “পল্লীগ্রামের ব্যাপার-স্যাপার” বলে অন্ত্যজ করে দেখার আর উপায় রইল না। পেশাগত জীবনের প্রথম অধ্যায়ে থিয়েটার কোম্পানিতে কাজ করেছেন, সংগীতায়োজক হিসেবে বম্বের সিনেমাতেও কাজ করেছেন। বাবা আলাউদ্দিন খাঁ’র সংস্পর্শে এসে নিমরাজি বাবাকে রাজি করিয়ে অতঃপর মার্গ সংগীতের উচ্চতর জ্ঞানে ঋদ্ধ হয়েছেন। তার সবচেয়ে স্মরণীয় কীর্তি হলো বাদ্যযন্ত্র হিসেবে বাঁশিকে ভেঙে নতুন করে গড়া। বাঁশির যে আধুনিক রূপটি আমরা দেখি, সেটি পান্নালাল ঘোষের উদ্ভাবন। ৩২ ইঞ্চি আকৃতির সাত ছিদ্রবিশিষ্ট বাঁশির প্রথম প্রচলন তিনিই করেছিলেন। এর আগে ‘সোলো ইন্সট্রুমেন্ট’ অর্থাৎ একক বাদনের যন্ত্র হিসেবে রাগ সংগীতে বাঁশির কোনো জায়গাই ছিল না। বছর কয়েক আগে ঢাকার আর্মি স্টেডিয়াম যেদিন ভেঙে পড়ল পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়ার বাজনা শুনতে, সেইদিন বরিশালের ছেলে পান্নালালও হয়তো সেই কীর্তির অংশভাক হয়েছিলেন।
৪) পণ্ডিত রাধিকা মোহন মৈত্র : রাজশাহীর জমিদার পরিবারে জন্ম ‘রাধুবাবু’র, ১৯১৭ সালে। পুরো উপমহাদেশের সরোদ বাদনকে তিনি দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন – শিল্পী এবং গুরু, দুই ভূমিকাতেই। তার সবচেয়ে বিখ্যাত শিষ্য পণ্ডিত বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর (অধুনা-প্রয়াত) মুখ থেকে তার সাধনা ও শিষ্যদের প্রতি পিতৃসুলভ প্রশ্রয়ের গল্প শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল। শিল্পী হিসেবে তার মধ্যে সত্যিকারের আন্তর্জাতিকতাবাদ ও আঞ্চলিকতার মিশ্রণ ঘটেছিল: যেমন দাপটে সারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অভ্যাগত কলাকার হিসেবে বাজিয়ে গেছেন, তেমনই নিবেদনের সঙ্গে মেধাবী-তরুণ শিক্ষার্থীদের জন্য প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দিয়ে গেছেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে স্নাতকোত্তর শিক্ষালাভ করেছিলেন, গবেষক ও সংগীততাত্ত্বিক হিসেবেও খ্যাত ছিলেন। ইউটিউবে কাফি রাগের ওপর তার এগার মিনিট একচল্লিশ সেকেন্ডের একটা গৎ আছে (ঝাঁপতালের ওপর নিবদ্ধ)। আমার ব্যক্তিগত জীবনযুদ্ধের অ্যান্টিডোট সেই বাজনাটি।
৫) উস্তাদ বিলায়েত খাঁ : গৌরীপুরের (ময়মনসিংহ) বিলায়েত খাঁকে বলা যায় সমগ্র উপমহাদেশের সেতারবাদনের শেষ কথা: ‘গায়কি-অঙ্গের’ শিরোমণি। ১৯২৮ সালে জন্মেছেন, পঞ্চরত্নের বাকি চারজনদের অনুজ তিনি; তাই তার অসংখ্য বাজনার রেকর্ড উচ্চমানের শ্রাব্যতার সুবিধাসহ শুনতে পাওয়া যায়। ইমদাদখানি ঘরানায় সেতার-সুরবাহার বাজিয়েছেন; উপমহাদেশের আধুনিক ইতিহাসে দীর্ঘতম পারিবারিক সংগীতপরম্পরার প্রতিনিধিত্ব করেছেন। সেতারকে নিজের মতো ভেঙে গড়েছেন তিনিও; মানুষের কণ্ঠ যেমন সুরসৃষ্টি করতে পারে, সেতারে সেই আওয়াজের ও সেই মেজাজের সুর উৎপাদন করতে পারার মতো অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। তার বাজনা বেছে শুনতে গেলে অজস্র বৈচিত্র্যময় রাগের মধ্যে আমি বেছে নিই বড়-বড় আদি রাগ: ইমন, তোড়ি, দরবারি, ভৈরবী।
অনেকেই বলে থাকেন, উপমহাদেশের রাগ সংগীতের চর্চা, সাধনা এবং পরিবেশনের ধারায় বিভিন্ন শ্রেণি, ধর্ম ও জাতির যে সংশ্লেষ ঘটেছে, সংস্কৃতির অন্য কোনো মাধ্যমে তা বিরল। মহারাষ্ট্রের নিরামিষভোজী ব্রাহ্মণ থেকে শুরু করে, এক বসায় একখানা আস্ত বাছুর খেয়ে ফেলা খাঁ সাহেব: সংগীত মোটামুটিভাবে সবাইকেই জায়গা দিতে পেরেছে। সংগীতের এই ধারার উৎকর্ষের ইতিহাসে জমিদারনন্দন যেমন পাওয়া যাবে, অন্ত্যজ শ্রেণি থেকে উঠে আসা সাধক-সাধিকাও পাওয়া যাবে। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করলে যদিও জীবৎকালে তাদের সবার তুলনামূলক আর্থসামাজিক ক্ষমতা সমান ছিল না, শ্রেণিবৈষম্য, লিঙ্গবৈষম্য আর প্রাদেশিকতায় যদিও ভুগতে হয়েছিল অনেককেই, তবু সময় সেই ভঙ্গিলতাকে অনেকাংশে সমান করে দিয়েছে; কারণ সময় মূলত সংগীতকেই ধারণ করেছে, প্রতিভাকেই মনে রেখেছে। আর কে না জানে, আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে আমাদের সময়েরই সন্তান? সন্তানের অধিকারে তাই আজ, যারা সত্যিই চিহ্ন রেখে গেছেন, তাদের অবদানকে স্মরণ করলাম।