লাঙল ছাড়া কৃষির রূপকার মাসানোবু ফুকুওকা

বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা মেটাতে উচ্চফলনশীল জাত, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহারের নানা নেতিবাচক প্রভাব লক্ষ করে গত শতকে শুরু হয়েছে প্রাকৃতিক কৃষি দর্শনের চর্চা। এর পুরোধা ছিলেন মাসানোবু ফুকুওকা। লিখেছেন এনাম-উজ-জামান

১৯১৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি মাসানোবু ফুকুওকা জাপানের মাতসুয়ামা শহরের ১৬ মাইল দূরে ইয়ো নামক এক মফস্বল শহরতলিতে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা কামেইচিসি ফুকুওকা ছিলেন নগরপ্রধান, মা শাচিএ ইশসিকি ছিলেন সামুয়াই বংশোদ্ভূত, শিক্ষিত, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন নারী। মাসানোবুর পরিবার ছিল কৃষিভিত্তিক পরিবার। পরিবারের হাল ধরার জন্যই তাকে গিফু কৃষি মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়। গিফু মহাবিদ্যালয়ে মাসানোবু অধ্যাপক মাকাতো হিউরার অধীনে উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিষয়ে বিশেষায়িত শিক্ষা গ্রহণ করেন। শিক্ষা শেষে তিনি ইয়োহামা শুল্ক দপ্তরে উদ্ভিদ পরিদর্শক বিভাগে যোগ দেন। যোগদানের তৃতীয় বছরে মাসানোবু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন। সংক্রামক রোগ ভেবে শহুরে বন্ধুরা তাকে পরিত্যাগ করে। তার দিন কাটতে থাকে একাকী, অপরিচ্ছন্ন হাসপাতালের নির্জন, শীতল প্রকোষ্ঠে। সে ঘরে তিনি একাকী মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। তার বয়স তখন মাত্র ২৫ বছর।

কোনো চিকিৎসা ছাড়াই বেশ কিছুদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে মাসানোবু অবশেষে সুস্থ হন। এ থেকে তার উপলব্ধি হয়, এই পৃথিবীতে মানুষের কিছু করার নেই। কিছু করতে যাওয়া মানেই হলো নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে হস্তক্ষেপ করা মাত্র। এই উপলব্ধির পরে তিনি চাকরি ছেড়ে দেন। টোকিও, ওসাকা, কোবে, কায়টো আর ক্যায়ুসুর পথে, জনপদে ঘুরে তিনি নতুন উপলব্ধির কথা সবাইকে বলতে লাগলেন। তার কথাকে কেউ পাত্তা দিল না;

অপ্রকৃতিস্থ, খামখেয়ালি বলে উড়িয়ে দিল। তিনি ফিরে এলেন বাড়িতে, মা-বাবার কাছে। বাবার আশ্রয়ে শুরু করলেন নতুন উপলব্ধি অনুযায়ী জীবনযাপন আর পরীক্ষা-নিরীক্ষা।

কিছুদিন পরে মাসানোবু কোচিতে রোগ ও কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের প্রধান হওয়ার আমন্ত্রণ পান। তার বিভাগের কাজ ছিল বৈজ্ঞানিক কৃষিতে অগ্রগতির মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করা। ফুকুওকা কিন্তু তার নিজস্ব উপলব্ধিগত গবেষণা অব্যাহত রাখেন। তিনি কম্পোস্ট, রাসায়নিক সার, কীটনাশক ছাড়া উৎপন্ন ফসলের সঙ্গে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষকৃত ফসলের ফলনের তুলনা করেন। তিনি দেখেন যে, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারে যে ফলন পাওয়া গেছে তা এসব ব্যবহার না করে যে ফলন পাওয়া গেছে তার থেকে খুব বেশি না। রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যয় হিসাব করলে দুই পদ্ধতির ফলন সমান। এ থেকে তিনি সিদ্ধান্তে এলেন যে, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার অধিক ফলন দিতে পারে না। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে তিনি আবিষ্কার করেন প্রাকৃতিক কৃষির নিয়ম।

ক. মাসানোবুর প্রাকৃতিক কৃষির প্রথম সূত্র হলো, মাটিতে লাঙল চালানো যাবে না।

খ. দ্বিতীয় সূত্র হলো, কোনো রাসায়নিক বা কম্পোস্ট সার ব্যবহার করা যাবে না।

গ. তৃতীয় সূত্র হলো, আগাছা নিয়ন্ত্রণ করতে লাঙল দিয়ে চাষ বা আগাছানাশক ব্যবহার করা যাবে না। খড় বিছিয়ে দিলেই আগাছা মাড়িয়ে নতুন চারাগাছ উঠবে।

ঘ. ফুকুওকার চতুর্থ সূত্র হলো, জমিতে কীটনাশক ব্যবহার করা যাবে না। কীটনাশক কীট নিয়ন্ত্রণে স্বল্প সময়ে ফল দিলেও তা প্রকৃতপক্ষে দীর্ঘমেয়াদে জমির ক্ষতিই করে।

মাসানোবু ফুকুওকা তার গবেষণালব্ধ জ্ঞান নিজের কাছে গোপন করে রাখেননি। বই, গান, শ্লোক ইত্যাদি রচনা ও পরিবেশনের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেছেন অন্যদের মধ্যে। প্রাকৃতিক কৃষি বিষয়ে ১৯৭৫ তার বই ‘দ্য ওয়ান-স্ট্র রেভুল্যুশন : অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু ন্যাচারাল ফার্মিং’ প্রকাশিত হয়। সেই বছরই ‘দ্য ন্যাচারাল ওয়ে অফ ফার্মিং- থিওরি অ্যান্ড প্র্যাকটিস অব গ্রিন ফিলোসফি’ বইটি প্রকাশিত হয়। ১৯৭৮ সালে প্রথম বইটির ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশিত হলে সারা বিশ্বে কৃষিচিন্তার জগতে দারুণ আলোড়ন ওঠে। ১৯৮৫ সালে ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত হয় দ্বিতীয় বইটি। বই দুটি পাঠের পর জনসংখ্যার ক্রমাগত বৃদ্ধির বিপরীতে চাষহীন এই

কৃষিব্যবস্থা বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণে আদৌ সক্ষম কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন কৃষি গবেষকরা। এই প্রশ্নের জবাব দেন ফুকুওকা তার সর্বশেষ গ্রন্থ ‘সয়িং সিডস ইন দ্য দেজার্ট’।

১৯৭৯ সাল থেকে, ফুকুওকা বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। পৃথিবীর যে প্রান্তেই তিনি গেছেন সেখান থেকে সংগ্রহ করেছেন বীজ, আবার অন্য অঞ্চল থেকে সংগৃহীত বীজ ছড়িয়ে দিয়েছেন সেখানে, দেখতে চেয়েছেন ওই মাটিতে সেই বীজের প্রাকৃতিক অঙ্কুরোদগম ঘটে কি না। ঊষর মরুতে সবুজায়নের অভিযানে যে জ্ঞান তিনি অর্জন করেন তার ওপর ভিত্তি করে লেখেন তার সর্বশেষ গ্রন্থ ‘সয়িং সিডস ইন দ্য দেজার্ট’। প্রাকৃতিক কৃষি বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্যের চাহিদা পূরণ করতে পারবে কি না সে প্রশ্নের উত্তরে এ বইতে তিনি বলেন, অল্প জায়গায় অধিক শস্য ফলানোর চেষ্টার মাধ্যমে নয় বরং ঊষর জমিকে প্রাকৃতিক কৃষির মাধ্যমে সবুজায়নের ফলে এই চাহিদা পূরণ হতে পারে।

কৃষি, জনসেবা ও আধ্যাত্মিক ভাবনায় অবদানের জন্য মাসানোবু ফুকুওকা লাভ করেছেন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘দেশিকোত্তম’, এশিয়ার নোবেল হিসেবে খ্যাত ফিলিপাইনের র‌্যামন ম্যাগসেসে, আর্থ সামিট প্লাস ফাইভ ফোরামের ‘আর্থ কাউন্সিল’ পুরস্কার। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য সমস্যার সমাধানে ব্রতী প্রতিটি কৃষি গবেষকের অনুপ্রেরণা হয়ে আছেন দার্শনিক ও কৃষিবিদ মাসানোবু ফুকুওকা।