দেশের ফুটবলের পোস্টার বয় জামাল ভুঁইয়া। বাংলাদেশ জাতীয় দলের অধিনায়ক সম্প্রতি আর্জেন্টিনার একটি ক্লাবে খেলার প্রস্তাব পেয়েছেন। ম্যারাডোনা-মেসির দেশে গিয়ে খেলতে উন্মুখ জামালের আজ সৌদি আরবে যাওয়ার কথা জাতীয় দলের সঙ্গে তিন জাতি আসরের প্রস্তুতি নিতে। এই ফাঁকে আড্ডায় মজেছিলেন দেশ রূপান্তরের সুদীপ্ত আনন্দ’র সঙ্গে। যেখানে এসেছে আর্জেন্টিনা, জাতীয় দলসহ নানা প্রসঙ্গ ম্যারাডোনা-মেসির দেশে গিয়ে খেলার হাতছানি পেয়েছেন। কেমন লাগছে?
জামাল ভুঁইয়া: ওরা (সোল দা মায়ো) আসলে আমার ব্যাপারে অনেক সিরিয়াস। ক্লাবের মালিক, সভাপতি, শীর্ষ কর্তারা এসে আমার সঙ্গে দেখা করে কথা বলেছে। ওদের এখানে দেখেই বুঝতে পেরেছি, ওরা আমাকে কতটা পেতে চায়। ভালো একটা প্রস্তাবও দিয়েছে। আমি সুযোগটা নিতে চাই। এখন শেখ রাসেল ক্রীড়াচক্র থেকে রিলিজ লেটার লাগবে। এটা পেয়ে গেলে মায়োর সঙ্গে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করতে পারব।
আর্জেন্টিনার তৃতীয় বিভাগ ফুটবল লিগ, ঠিক পুরোপুরি পেশাদার লিগ নয়। এটা একটা শৌখিন লিগ দাবি করেছে, সে দেশেরই একজন কোচ। তো সোল দা মায়ো ক্লাবে খেলার জন্য আপনার এত আগ্রহ কেন?
জামাল: দেখুন, আর্জেন্টিনার তৃতীয় বিভাগ লিগ বিশ্ব র্যাংকিংয়ে সৌদি প্রো-লিগের চেয়ে ছয় ধাপ এগিয়ে। আর্জেন্টাইন তৃতীয় বিভাগ লিগ ৬০তম, আর সৌদি লিগ, যেখানে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো খেলছে সেটা ৬৬তম। সুতরাং সেই লিগ নিয়ে প্রশ্ন তোলাটা অযৌক্তিক। তা ছাড়া ক্লাবটি আমাকে যে প্রস্তাব দিয়েছে, সেটা বর্তমান শেখ রাসেলের বেতনের অনেক বেশি। তা ছাড়া আমি তো আগেই বলেছি, সেখানে খেললে আমাদের সবার জন্য একটা দরজা উন্মোচিত হবে। তাই আমি সেখানে খেলতে চাই।
আর্জেন্টিনার মতো ফুটবলপাগল দেশে আগে কোনো বাংলাদেশি ফুটবলারের খেলার সুযোগ হয়নি। আপনি সেখান থেকে খেলার প্রস্তাব পেলেন...
জামাল: এটা কেবল আমার নিজের জন্য নয়, বাংলাদেশের অন্য খেলোয়াড়দের জন্যও অনেক বড় একটা সুযোগ। বাংলাদেশ থেকে একজন খেলোয়াড় আর্জেন্টিনায় গিয়ে খেলছে, এটা দেশের ফুটবলের জন্য বড় ব্যাপার হবে।
আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সান্তিয়াগো ক্যাফিয়েরোর ঢাকা সফর করে গেলেন। দূতাবাস উদ্বোধন করলেন, বাফুফেতেও গিয়েছিলেন। সব মিলিয়ে আর্জেন্টাইনদের বাংলাদেশের ফুটবলের ব্যাপারে অনেক আগ্রহ। আপনার কী মনে হয়, এতে বাংলাদেশের ফুটবল লাভবান হবে?
জামাল: দেখুন, গত বছর কাতার বিশ্বকাপে বাংলাদেশ আর্জেন্টিনাকে যেভাবে সমর্থন দিয়েছে, সেটা ছিল অবিশ্বাস্য। বাংলাদেশও যে একটি ফুটবলপাগল জাতি সেটা আরেকবার প্রমাণিত হয়েছে বিশ্বকাপে। সারা বিশ্ব দেখেছে বিশ্বকাপ নিয়ে বাংলাদেশিদের উন্মাদনা। বাংলাদেশিদের আর্জেন্টিনার প্রতি সমর্থনের বিষয়টা ফলাও করে বিশ্ব মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। এ কারণেই এ দেশে তারা দূতাবাস খুলেছে। দুটি দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কও ফুটবলের মাধ্যমে গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে।
আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আপনার একটা জার্সি বদলের ছবি তো রীতিমতো ভাইরাল হয়ে গেছে?
জামাল: (হাসি)। জাতীয় দলের অধিনায়ক হিসেবে তার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ হয় আমার। ফুটবল নিয়ে তিনি অনেক কথাই বলেছেন। তিনি নিজেও একজন ফুটবলার ছিলেন। খেলতেন আক্রমণভাগে। ফুটবলকে পাগলের মতো ভালোবাসেন। উনি আমাকে বলেছেন, যে করেই হোক, বাংলাদেশের পাশে থাকতে চায় তারা। এটা অবশ্যই ইতিবাচক একটা ব্যাপার। আমি মনে করি আর্জেন্টিনার সঙ্গে হাতে হাত রেখে কাজ করলে আমাদের দেশের ফুটবলেরও উন্নতি হবে।
এ দেশের মানুষ ফুটবল অনেক ভালোবাসে, সেটা বিশ্বকাপ এলেই বোঝা যায়। অথচ তারা দিনের পর দিন নিজেদের জাতীয় দলকে ভালো খেলতে, সাফল্য পেতে দেখছে না। আপনি এক দশক জাতীয় দলে খেলছেন। অধিনায়ক হিসেবে নিশ্চয় এটা কষ্ট দেয়?
জামাল: গেল দশ বছরে অনেক খেলোয়াড়, অনেক কোচ পরিবর্তন হয়েছে। এখন জাতীয় দল একটা শক্ত অবকাঠামোর ওপর দাঁড়িয়েছে। এখন বাইরের অনেক চাপ নিয়ে আমাদের খেলতে হয়। সমর্থক, বিভিন্ন বড় বড় কোম্পানি আমাদের জিততে, সাফল্য পেতে দেখতে চায়। এটা কিন্তু আমাদের সামগ্রিক ভাবনায় পরিবর্তন এনেছে। সবাই বুঝতে পেরেছে, একটা শক্তিশালী জাতীয় দল কতটা গুরুত্বপূর্ণ। শুনতে হয়তো অনেক বড় কথা শোনাবে। আমরা যদি আরও একটু ভালো করতে পারি, ঠিক ভারত যেটা করে, সেটা করতে পারি, তাহলে হয়তো তাদের মতো আমরাও র্যাংকিংয়ে ১০০’র মধ্যে ঢুকতে পারব।
২০১৩ থেকে ২০২১ চারটা সাফে খেলেছেন। এ বছরও সাফ আছে। নিশ্চয় আগের অপ্রাপ্তিগুলো ঘোচাতে চাইবেন।
জামাল: গত সাফে আমরা দুর্ভাগ্যের শিকার হয়ে শেষ মুহূর্তে নেপালের বিপক্ষে একটা গোল রিসিভ করে ফাইনালে যেতে পারিনি। তবে আমরা যে ভালো ফুটবল খেলেছি, সেটা সবাই বলেছে। এমনকি আমি তো মনে করি ২০১৮ সালে ঘরের সাফেও আমরা দারুণ খেলছিলাম। প্রথম দুই ম্যাচও জিতেছিলাম। তারপরও দুর্ভাগ্যের কারণে সেমিতে যেতে পারিনি। এ বছরটা আমাদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। সামনে তিন জাতি আসর, সাফ, বিশ্বকাপ বাছাই, অলিম্পিক বাছাই ছাড়াও ফিফা উইন্ডো আছে। তাই আমরা এ বছর ভালো করতে পারলে হয়তো র্যাংকিংয়ে আমাদের উন্নতি হবে। কেন যেন মনে হয়, এ বছরটা হয়তো আমাদের হবে।
তার মানে কি সাফ জিতে যাবেন?
জামাল: সাফে ভালো করার স্বপ্ন সবার থাকে। আমরাও গেল দুই আসরে দুর্ভাগ্যের কারণে ভালো করতে পারিনি। সামনে তিন জাতি আসর আছে। সেখানে যদি ভালো করতে পারি, আত্মবিশ্বাসটা বাড়বে নিঃসন্দেহে।
জাতীয় দলের স্কোরিংয়ে অনেক সমস্যা আছে। কী কারণে আমরা গোল করতে পারি না?
জামাল: দেখুন, এদেশের ফরোয়ার্ডরা পর্যাপ্ত গেম টাইম পায় না। কারণ ক্লাবগুলো এই পজিশনেই বেশি বেশি বিদেশি নিয়ে আসে। যার ফলে বিদেশিদের সঙ্গে লড়াই করে ফরোয়ার্ডরা মূল একাদশে নিয়মিত হতে পারছে না। এটা অবশ্যই জাতীয় দলকে ভোগায়। স্থানীয় ফুটবলাররা ঘরোয়া লিগ খেলতে না পারলে আত্মবিশ্বাসটা কোথায় পাবে। গোল করতে পারলেই ফরোয়ার্ডরা ধীরে ধীরে ভয়ডরহীন ফুটবল খেলতে পারে। সেটাই তো হয় না। আসলে আমাদের তৃণমূলে বেশি জোর দিতে হবে। যাতে প্রতিটি পজিশনেই ভালোমানের ফুটবলার পাওয়া যায়। যারা বিদেশিদের সঙ্গে লড়াই করে নিয়মিত খেলতে পারবে।
আপনি ডেনমার্কেও খেলেছেন। এখানেও খেলছেন। আসল পার্থক্যটা কী?
জামাল: মূল পার্থক্য ক্লাবগুলোতে। প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবগুলোর নিজস্ব মাঠ নেই। বসুন্ধরা কিংস, আবাহনী ও শেখ জামাল বাদে কারওই প্র্যাকটিস মাঠ নেই। এটা ফুটবল এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা। ক্লাবগুলোকে আরও বেশি পেশাদার হয়ে ওঠা প্রয়োজন। তারা অনেক টাকা হয়তো খরচ করছে প্রতি বছর, তবে সেটা কি তারা সঠিকভাবে খরচ করছে? বসুন্ধরা কিংস এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। তাদের সভাপতি (ইমরুল হাসান) একটা বড় স্বপ্ন, এএফসি কাপ জয়ের স্বপ্ন নিয়ে দলটাকে এগিয়ে নিচ্ছে। আসলে দেশের ফুটবলের উন্নতি করতে অন্যদেরও বসুন্ধরার মতো করে ভাবতে হবে।