মাদক চোরাচালান

নিত্যনতুন কৌশলের কাছে ধরাশায়ী আইনশৃঙ্খলা বাহিনী

দেশে উৎপাদন হয় না ইয়াবা ট্যাবলেট, অথচ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে সারা দেশ থেকে প্রতিদিন উদ্ধার হচ্ছে গড়ে প্রায় সোয়া লাখ পিস। সর্বোচ্চসংখ্যক ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার হয়েছে ২০২১ সালে, প্রতিদিন গড়ে প্রায় দেড় লাখ। ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, কোস্টগার্ড ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযানে উদ্ধার হওয়া মাদকের পরিসংখ্যান ঘেঁটে এমন ভীতিকর তথ্য পাওয়া গেছে।

গত ছয় বছরে সারা দেশে উদ্ধার হয়েছে ২৫ কোটি ৮৮ লাখ ৯৫ হাজার ৫৭০ ইয়াবা ট্যাবলেট।

অভিযানসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সীমান্ত দিয়ে দেশে যে পরিমাণ ইয়াবা ট্যাবলেট ঢুকছে তার অল্পসংখ্যকই ধরা পড়ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে। আটক ইয়াবার বেশিরভাগই কক্সবাজার-মিয়ানমার সীমান্ত থেকে আসা। পাচারকারীদের নিত্যনতুন কৌশলের কাছে একপ্রকার ধরাশায়ী হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। দেশে ইয়াবার মতো মাদকদ্রব্য ব্যাপক হারে পাচার হয়ে আসা নিয়ে সীমান্তরক্ষী বাহিনী থেকে শুরু করে দেশের অভ্যন্তরে মাদক নিয়ন্ত্রণে কাজ করা বাহিনীগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

কক্সবাজার জেলা পুলিশ বলছে, তারা সর্বাত্মক চেষ্টা করছে নিয়ন্ত্রণ করার। কারবারিদের ওপর তাদের সার্বক্ষণিক নজরদারি রয়েছে। জানতে চাইলে কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মাহফুজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যারা মাদক মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে ইতিমধ্যে জামিনে গেছে বা সাজা খেটে বের হয়ে গেছে তাদের ওপর নজরদারি রেখেছি যাতে ফের এ পেশায় জড়িয়ে না যায়। এর বাইরে আমাদের গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধির মাধ্যমে চেষ্টা করছি এটাকে নিয়ন্ত্রণ করার।’

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত ছয় বছরে সারা দেশে পুলিশ, র‌্যাব, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি, কোস্টগার্ড ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযানে উদ্ধার হয়েছে ২৫ কোটি ৮৮ লাখ ৯৭ হাজার ৫৭০ ইয়াবা। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ১ লাখ ১৮ হাজার ২১৪ ইয়াবা ধরা পড়েছে। ২০১৭ সালে ৪ কোটি ৭৯ হাজার ৪৪৩, ২০১৮ সালে ৫ কোটি ৩০ লাখ ৪৮ হাজার ৫৪৮, ২০১৯ সালে ৩ কোটি ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৩২৮, ২০২০ সালে ৩ কোটি ৬৩ লাখ ৮১ হাজার ১৭, ২০২১ সালে ৫ কোটি ৩০ লাখ ৭৩ হাজার ৬৬৫ ও ২০২২ সালে ৪ কোটি ৫৮ লাখ ৬৮ হাজার ৫৬৯ ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে। গত ছয় বছরে ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনায় মামলা হয়েছে ৬ লাখ ২৯ হাজার ৭৫১টি আর আসামি ৮ লাখ ১৭ হাজার ৫৩৩ জন।

২০০০ সালের পর টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা আসতে শুরু করে। তারপর এটি খুব দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে। তবে দেশে প্রথম ইয়াবার চালান ধরা পড়ে ২০০৩ সালে রাজধানীর গুলশানে।

পাশর্^বর্তী দেশ মিয়ানমার থেকে কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তের নাফ নদী দিয়ে বছরের পর বছর ধরে দেদার দেশে ঢুকছে মরণ নেশা ইয়াবা। বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থেকে শুরু করে সরকারের ওপর মহলও অবগত রয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে সরকার ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা করেছে। কিন্তু কাজে আসছে না কোনো পদক্ষেপই।

অভিযানসংশ্লিষ্ট শীর্ষ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা মনে করেন, সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা আসা বন্ধ করা না গেলে দেশের ভেতরে অভিযান চালিয়ে কোনোভাবেই ঠেকানো যাবে না। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সংস্থার তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি জানান, সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে যে পরিমাণ ইয়াবা ট্যাবলেট ঢুকছে তার ১০-২০ ভাগ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ধরতে পারছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. আজিজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইয়াবা মূলত মিয়ানমার থেকে আসছে। ইয়াবা চোরাচালান রোধে কক্সবাজারে আমরা একটি বিশেষ টাস্কফোর্স করেছি। কীভাবে মাদক প্রতিরোধ করা যায় সে বিষয়ে প্রতিনিয়ত কাজ করছি। আমরা তৎপর আছি, ইয়াবা যা আসছে তা আমরা উদ্ধার করছি।’

গ্রেপ্তারের পরও কেন ইয়াবার বিস্তার থামছে না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যারা মাদক চোরাচালান করে তারা মেধা খাটিয়েই কাজগুলো করে, তারা অনেক দুষ্ট হয়।’ অন্যদিকে ইয়াবায় আসক্তি থেকে বের হয়ে আসা অনেক কঠিন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা চিকিৎসার বিষয়ে সোচ্চার রয়েছি। তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করছি।’

যে পথে আসে ইয়াবা : কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তে প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে রয়েছে নাফ নদী। নদীটির ওপারে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য। ইয়াবার চালানের অধিকাংশই এই নাফ নদী পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে। সেখানকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে মাঝেমধ্যে ইয়াবার বাহকরা গ্রেপ্তার হলেও মূল হোতারা থাকছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। সরকারের ডাকে সাড়া দিয়ে টেকনাফের বেশ কয়েকজন মাদক কারবারি আত্মসমর্পণ করলেও ইয়াবা চোরাচালান থেমে নেই। বরং নতুন করে ইয়াবার রুটে দেশে ঢুকছে ক্রিস্টাল মেথ বা আইস নামের মাদকদ্রব্য।

গত বছর মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবসে প্রকাশিত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) প্রতিবেদনে বলা হয়, কক্সবাজার ও বান্দরবান দিয়ে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা পাচারের ১৫টি রুট দুর্গম হওয়ায় চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। মিয়ানমারের শান ও কোচিন প্রদেশে কারখানা স্থাপন করে ইয়াবা উৎপাদন করা হচ্ছে। এই ১৫টি পয়েন্টের মধ্যে ১০টি কক্সবাজার আর ৫টি বান্দরবান সীমান্তে। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর তল্লাশি থাকায় সম্প্রতি রুটও বদল করেছে ইয়াবার কারবারিরা। কৌশল পরিবর্তন করে তারা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে ইয়াবা পাচারে বেছে নিয়েছে সাতটি নতুন রুট। এর মধ্যে রয়েছে ভারতের মিজোরাম, আসাম ও মণিপুর হয়ে ত্রিপুরার দুটি রুট আর বান্দরবান, কক্সবাজার, বরিশাল, যশোর ও সাতক্ষীরার পাঁচটি রুট।

ইয়াবার বহনের যত কৌশল : ডিএনসি, পুলিশ ও র‌্যাবের কর্মকর্তারা বলছেন, মিয়ানমারের সঙ্গে বাণিজ্যিক লেনদেনের সুযোগ নিচ্ছে কারবারিরা। ইয়াবা ট্যাবলেট সহজেই বহনযোগ্য। মূলত কাট-আউট পদ্ধতিতে দেশের ভেতরে চলছে কারবার। বাহক প্রাথমিক অবস্থায় জানে না কে গ্রহণ করবে। বর্তমানে বাহকের পেটের ভেতর পাকস্থলীতে করে ইয়াবা বহন বেড়েছে। এ ছাড়া পেঁয়াজ, বেগুন, আসবাব, গাছের গুঁড়িসহ বিভিন্ন মালামালের সঙ্গে বহন করা হয় ইয়াবা। আগে থেকে সোর্সের মাধ্যমে তথ্য না পেলে পরিবহনের সময় সাধারণ তল্লাশি চালিয়ে তাদের শনাক্ত করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আবার পেটে ইয়াবা বহনকারীদের গ্রেপ্তারের পরও পড়তে হচ্ছে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে। পেটের মধ্য থেকে ইয়াবা বের করা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। গত বছর আগস্ট মাসে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে অসুস্থ হয়ে একজন মারা যান। পরে ময়নাতদন্তে তার পেটে অর্ধগলিত ইয়াবা পাওয়া গেছে। ইয়াবা ট্যাবলেটের অন্যতম খুচরা বাজার রাজধানী। সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে ঢাকাকে ট্রানজিট হিসেবেও ব্যবহার করা হচ্ছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক মো. জাফরুল্ল্যাহ কাজল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেখা গেছে পাঁচ হাজার পর্যন্ত ইয়াবা বিশেষ কায়দায় পেটের মধ্যে নিয়ে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে পৌঁছে দিচ্ছে। যানবাহনে চলাচলকারী কতজনকে আমরা চেক করব। তথ্য ছাড়া তো বের করা সম্ভব হয় না। তাছাড়া এদের আটকের পর পেট থেকে ইয়াবা বের করতে গিয়ে মৃত্যুর ঝুঁকিও থাকে যা আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জের।’