গত বিপিএলেও বলছিলেন, ‘মনে হয় আমি আমার দেশের বিপক্ষেই খেলি।’ নাজমুল হোসেন শান্তর আক্ষেপের সুর এখানে স্পষ্ট। দীর্ঘদিন বাজে সময়ের গেরোয় পরে শুধু সমালোচনা সহ্য করে গেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সেসব কটাক্ষ কঠিন সময়ে শুধু এড়িয়ে গেছেন তিনি। করেছেন নিজের কাজ। পরিশ্রমের শেষে পেয়েছেন পুরস্কার। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে স্রোতের বিপরীতে সাঁতরে ১৮০ রানে হয়েছিলেন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক। আঁধারে যেমন ক্ষীণ আলো পরিব্রাজকের ভয়-শঙ্কা দূর করে দেয়, সেই ১৮০ রানে দূর হয় শান্তর সব জড়তা। এরপর শুধু ছুটছে শান্তর ব্যাট। তাতে রানের ফোয়ারা এত যে এখন চারপাশে কী হচ্ছে তা দেখার সময় নেই। এখন গ্যালারি থেকে ‘শান্ত-শান্ত’ উল্লাসধ্বনি এলেও তা শুনতে পান না এই ব্যাটার। কারণ শান্তর মাথায় একটাই চিন্তা– ‘রান করতে হবে’।
রান করার মন্ত্রেই একের পর এক টুর্নামেন্ট বা সিরিজ রাঙিয়ে তুলছেন শান্ত। বিশ্বকাপের দেশের সেরা রান সংগ্রাহক বিপিএলেও ৫১৬ রানে হয়েছেন সেরা ব্যাটার। এরপর ইংল্যান্ডের সঙ্গে তিন ওয়ানডেতে দুই ফিফটিতে ১১১ রান করে হয়েছেন দ্বিতীয় সেরা। কাল টি-টোয়েন্টিতে তৃতীয় ফিফটি করে দলকে জেতালেন তিনি। এই সঙ্গে এক অনুভূতিও যুক্ত হলো– আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথমবার হয়েছেন ম্যাচসেরা। এই সব কিছু ওই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আত্মবিশ্বাস থেকে পাওয়া, জানালেন শান্ত, ‘অবশ্যই যখন বড় একটা টুর্নামেন্টে দলের হয়ে ভালো করতে পারব তখন আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। তবে প্রতিদিন তো নতুন, আগের চিন্তা খুব একটা কাজ করে না। নতুন দিন হিসেবে নতুন মানসিকতা নিয়ে নামতে হয়। তবে এটা ঠিক যে আগের ভালো লাগাটা কাজ করে।’
শান্তকে এগিয়ে দিচ্ছে এই ভালো লাগা। প্রতি ইনিংসে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করছেন। সেই ধারাবাহিকতায় এখন আত্মবিশ্বাস পেয়ে গেছেন। কীভাবে বিপক্ষ বোলারকে সামলাবেন। কখন দ্রুত রান তুলবেন আর কখন গতি কমাবেন সব কিছু চলে এসেছে শান্তর আয়ত্তে। তাই নিজেকে আরও স্বচ্ছ ভাবে মেলে ধরতে পারছেন এই ব্যাটার, ‘ভিন্নতা (নিজের মধ্যে) বলতে আমি প্রতিনিয়ত রান করছি। ব্যাটার হিসেবে যখন নিয়মিত রান করব তখন একটা আত্মবিশ্বাস আসে। আর খেলা সম্পর্কেও ধারণা থাকে। ওটাই কাজে লাগিয়ে ভালো করার চেষ্টা করেছি।’ কালকের এই ভালো করার ব্যাপারে বাংলাদেশ ওপেনার জানান, ‘(নিজের ইনিংসের) শুরুটা ভালো হয়েছিল। আমি চেষ্টা করেছি ওই ধারাবাহিকতা ধরে খেলতে। আর বাড়তি কোনো দায়িত্ব বা কিছু করার তাড়না ছিল না। চেষ্টা করেছি বল দেখা এবং সে অনুযায়ী খেলার।’
বিপিএলে সিলেট স্ট্রাইকার্সে তৌহিদ হৃদয়ের সঙ্গে জুটি বেঁধে রান করেছেন অনেক। সেই আত্মবিশ্বাস বা অভ্যস্ততা ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কাল কাজে লাগিয়েছেন দুজন। অভিষেক ইনিংস খেলতে নেমেই বিশাল এক ছক্কা ও দুই চার মারা হৃদয়ের প্রশংসা করলেন শান্ত। তাদের ৬৫ রানের জুটিতে বাংলাদেশের জয়ের পথ সহজ হয়। শান্ত এবার স্বপ্ন দেখছেন সিরিজ জেতার, ‘প্রথম ম্যাচ জয় অবশ্যই আত্মবিশ্বাস দেবে। দ্বিতীয় ম্যাচ যখন খেলতে যাব তখন এসব নতুন করে পরিকল্পনা করতে হবে। তবে এটা ঠিক এই জয়ের পর আমাদের মানসিকতা-চিন্তাধারায় অনেক বদল আসবে। এখন সিরিজে আমরা যে অবস্থায় আছি এখান থেকে অবশ্যই সিরিজ জেতা উচিত তবুও বলব আমাদের নির্দিষ্ট দিনে ভালো খেলতে হবে।’
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটটা এই সেদিনও দুর্বোধ্য মনে হতো বাংলাদেশের। ঠিক যেমন ওয়ানডে ক্রিকেট এক সময় ছিল। তবে বড় দলের বিপক্ষে নিয়মিত জয়ের বিশ্বাস বাংলাদেশকে ওয়ানডেতে এখন ভালো পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এই জয়ে বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টিতেও ভালো দল হওয়ার শুরু পাবে সেই বিশ্বাস রাখছেন শান্ত, ‘ইংল্যান্ড বিশ্বের সেরা একটা দল। ওরা যে ক্রিকেট খেলে তা আমাদের জন্য খুব চ্যালেঞ্জিং ছিল। ওদের বিপক্ষে যেহেতু জিতলাম এটা আমাদের টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ভবিষ্যতে অনেক সাহস দেবে। আর ওয়ানডে দল যেমন ভালো করে তেমনি খুব দ্রুত টি-টোয়েন্টি দলও ভালো করবে।’
ভালো করার শুরুটা হোক কালকের জয় থেকেই। শান্ত যেমন নিজেকে বদলেছেন, হয়েছেন সব ফরম্যাটের অপরিহার্য। শান্তদের ব্যাটে চড়ে বাংলাদেশও টি-টোয়েন্টিতে নতুন করে চিনুক নিজেদের। শান্ত যেমন আত্মবিশ্বাস পেয়েছেন গত বিশ্বকাপ থেকে। বাংলাদেশ আত্মবিশ্বাস পাক এই জয় থেকে।