‘অভিনয় নিয়ে আমার কখনোই কোন চিন্তা-ভাবনা ছিল না। বলা যায়, অনেকটা হুট করেই এখানে আসা। শুরুর দিকে অনেক কিছুই বুঝতাম না। আমার কাছে মনে হয়, আজকে আমি যা হয়েছি বা যেখানে এসেছি একদমই সেলফ মেইড। নিজের চেষ্টাতেই সাফা কবির হিসেবে নিজেকে আমি তৈরি করেছি।’- ক্যারিয়ারের এক দশক পূর্তিতে এসে এমন কথা বললেন ছোট পর্দার জনপ্রিয় অভিনেত্রী সাফা কবির।
২০১৩ সাল থেকে শুরু, আদনান আল রাজীব পরিচালিত ‘অল টাইম দৌড়ের ওপর’ টেলিফিল্ম দিয়ে অভিনয়ে নাম লেখান। দেখতে দেখতে ক্যারিয়ারের এক দশক পার করে দিলেন এ তারকা। এরমধ্যে নানা চরাই উৎরাই পার করেছেন তবুও হাল ছাড়েন নি তিনি। যখনই কেউ টেনে ধরেছেন তখনই আবার নতুন উদ্দোমে দ্বিগুণ সাহস নিয়ে এগিয়েছেন। দু হাতে কুড়িয়েছেন দর্শকের ভালোবাসা। ঈদের নাটক ও সমসাময়িক ব্যস্ততা প্রসঙ্গে কথা হয় সাফা কবিরের সঙ্গে। সেই আলাপচারিতার চুম্বকাংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-
সামনেই ঈদ। ঈদকে ঘিরে ব্যস্ততা কেমন?
বিশেষ দিবসগুলোকে ঘিরে সবসময়ই একটু ব্যস্ততা বেশি যায় সবার। সেদিক থেকে আলহামদুলিল্লাহ আমারও ব্যস্ততা অনেক বেড়েছে। সবাই বলছিলো, বেশি বেশি কাজ করো। এখন মনে হচ্ছে সত্যি সত্যি ব্যস্ততা অনেক গুণ বেড়ে গিয়েছে আমার। এরমধ্যে ঈদের জন্য বেশ কিছু নাটকের কাজ করেছি, ওটিটিরও করেছি। হাতে এখনো কিছু সময় আছে এরমধ্যে আরও কিছু কাজ করা হবে। আর যেহেতু সামনে রামজান মাস, এই মাসে দুটো টিভি শো করবো ইফতারি নিয়ে। এর আগে অনেকবার বলা হলেও সময়ের জন্য করা হয়ে উঠেনি। এবার সেটা করছি।
টেলিভিশনের সব তারকাই এখন ওটিটিমুখী। এই প্লাটফর্মে তাদের ব্যস্ততাও বেড়েছে অনেক। এই মাধ্যমে আপনি নিয়মিত হবেন কখন?
আমি ওটিটির বেশ কিছু কাজ করেছি। এছাড়াও দেশীয় এবং দেশের বাইরের প্লাটফর্মে কিছু কাজ নিয়ে কথাবার্তা চলছে। এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আছে, চূড়ান্ত কিছু হয়নি। আমি খুব ধৈর্য্যশীল মানুষ, কোন কিছু নিয়ে তাড়াহুড়ো নেই আমার। বিঞ্জের জন্য একটা ওয়েব ফিল্মের কাজ শেষ করেছি যেটার নাম ‘কুহেলিকা’। খুব সম্ভবত এটা ঈদে আসবে। আপাতত এই কাজটা নিয়ে অনেক বেশি এক্সাইটেড।
ক্যারিয়ারের এক দশক পার করে দিলেন। আজকের এই অবস্থানে দাঁড়িয়ে কি মনে হচ্ছে, জার্নিটা কেমন ছিল?
আমার কাছে জার্নিটা খুব ম্যাজিকাল মনে হয়েছে। এটা এজন্য, কারণ অন্য কোন পেশাতে থাকলে এরকমটা হতো বলে মনে হয় না। আমরা যেখানে কাজ করি এই জায়গাটা আসলে শুধু কাজের অভিজ্ঞতা নয়, জীবনের অভিজ্ঞতাও বাড়ায়। এই দশ বছরে আমি অনেক কিছুই শিখেছি, ক্যারিয়ারের উত্থান-পতন দেখেছি, সাথে জীবনেরও অনেক পরিবর্তন দেখেছি।
আজ থেকে দশ বছর আগে সাফা কবির নামটাই কেউ জানতো না। সেখান থেকে আজকে কিছু মানুষ হলেও আমার নামটা জানে, আমাকে চিনতে পারে। আমাকে সম্মান দেয়, ভালোবাসে। এটাই তো অনেক। আমার মনে হয় না, অন্য কোন পেশাতে গেলে এটা সম্ভব হতো।
অ্যানাটনি কেলি সাফা থেকে সাফা কবির প্রসঙ্গে একটু জানতে চাই...
সাফা হচ্ছে আমার ডাক নাম আর কবির হচ্ছে পদবী (সার নেম) যেটাকে বলে। সাফা নামটা রেখেছেন আমার বাবা। আর অ্যানাটনি কেলি নামটা রেখেছিলেন আমার দাদাভাই। আমি যখন অনেক ছোট তখনই তিনি মারা যান যে কারণে ওইসময়ে এটার মানে জানতে পারিনি। তবে মা-দাদুর কাছে শুনেছি, এই নামটা দাদাভাইয়ের খুব পছন্দের ছিল। উনি খুবই সৌখিন মানুষ ছিলেন। উনার কথা ছিল এমন- আমার ছেলে বিদেশে থাকে তাই আমার নাতনির নামও বিদেশি রাখবো। তার ঐ চাওয়াটাকে প্রাধান্য দিয়েই আমার এই নামটা রাখা হয়। অনেকেই ভাবে যে, এই নামটা বোধহয় আমি নিজে রেখেছি। আসলে বিষয়টা তা নয়। অ্যানাটনি কেলি নামটা মনে রাখা বেশ কঠিন অনেকের জন্য, বলতেও কষ্ট হয়ে যায় তাই ওটা ব্যবহার করা হয় না।
এই ১০ বছরের ক্যারিয়ারে আপনার প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তি কি?
মানুষ আমাকে চিনে, জানে এবং ভালোবাসে-এটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। আমি কোন বিউটি কনটেস্ট কিংবা কোন প্রতিযোগিতা থেকে আসিনি। এই ইন্ডাস্ট্রিতে আমার কোন আত্মীয়-স্বজন নেই। সবচেয়ে বড় কথা এখানে আমার কোন মেন্টরও ছিল না। আমি একদমই সেলফ মেইড। নিজে নিজে শিখেছি, নিজে নিজে এতদূর পর্যন্ত এসেছি। প্রথমদিকে আমি জানতামই না যে আমি এখানে কাজ করবো। এরপর অভিনয় শুরু করলাম। সেখান থেকেই চেষ্টা করা আর সেই চেষ্টা থেকেই এতদূর আসা। সিনিয়রদের থেকে অনেক কিছু শিখেছি। শেখার জন্য আমি এখনো সবার দিকে তাকিয়ে থাকি যে কেউ কখন আমাকে বুঝিয়ে দিবে বা দেখিয়ে দিবে যে এটা আমি করতে পারবো।
এই সময়ের মধ্যে অনেক উত্থান-পতন দেখেছি। মানুষজন আমাকে এত ভালোবাসা দিচ্ছে যেটা আসলেই আমার শক্তি অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছে। তারা যখন বলে, আপনার ব্যবহার অনেক মিষ্টি, আপনার কাজ ভালো লাগে বা আপনাকে ভালো লাগে- তখন কিন্তু সত্যি মনটা ভরে যায়। এত এত তারকা, সিনিয়র শিল্পীদের ভীড়ে আমাকে যে তারা চিনছে, ভালোবাসা দিচ্ছে এটা আমার কাছে অন্যরকম পাওয়া।
অপ্রাপ্তি তো অবশ্যই আছে। সবকিছু পেলে তো আর কিছু চাওয়ার থাকে না। অপ্রাপ্তি থাকলে সেটা জয় করার জন্য লড়াই করা যায়। শুধু এটুকু বলব, এমন কিছু করতে চাই, মানুষ যেন আমাকে মনে রাখেন।
দীর্ঘ এই সময়টাতে আপনার একটা স্ট্রাগল পিরিয়ড ছিল, একটা খারাপ সময় পার করেছেন। সেটা কীভাবে ওভারকাম করেছেন?
প্রতিটা মানুষের জীবনেই উত্থান-পতন আসে, সেটা কাজের ক্ষেত্রে হোক কিংবা ব্যক্তিগত জীবনে। এটা সত্যি ইন্ডাস্ট্রিতে পড়ে গিয়ে উঠে দাঁড়ানোটা খুবই কঠিন। একটা স্ট্রাগল পিরিয়ড গিয়েছে আমার। এই দুঃসময়টা পার করা আমার জন্য খুবই কঠিন ছিলো। সেই সময়টাতে আমি মানুষ চিনতে পেরেছি, কারা আমার বন্ধু বা শুভাকাঙ্ক্ষী! আমার সেই বন্ধু এবং ভক্ত যারা আমাকে প্রতিটা মুহূর্তে সাপোর্ট করেছেন, তাদের প্রতি আমি অনেক বেশি কৃতজ্ঞ।
আমি অনেক ধৈর্য্যশীল ও ঠান্ডা মাথার মানুষ। এই গুণটা আমি আমার মায়ের কাছ থেকে পেয়েছি। আমি ছোটবেলা থেকেই আমার মাকে দেখেছি কীভাবে ধৈর্য্য ধারণ করে থাকতেন ভালো কিছুর জন্য। আমি সেটাই করেছি। ধৈর্য্য ধারণ করেছি অনেক আর ভেবেছি আমি শুধু মনোযোগ দিয়ে আমার কাজটা করে যেতে চাই। নিজের কাজটা সৎভাবে আর মন দিয়ে করলে হয়তো অনেক ভালো কিছু জীবনে না আসলেও অন্তত খারাপ কিছু আসবে না। সামনে কি হবে জানিনা, তবে খারাপ কিছু না হোক অন্তত।
ঈদে মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে সাফা কবিরের ওয়েব ফিল্ম ‘কুহেলিকা’। এটি পরিচালনা করেছেন সামিউর রহমান।