পদক জিততে হাঁটতে হবে সঠিক পথে

চলতি বঙ্গবন্ধু কাপ আন্তর্জাতিক কাবাডিতে অভিজ্ঞতায় কিংবা পারফরম্যান্সে, বাংলাদেশ দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তুহিন তরফদার। অসাধারণ নৈপুণ্যে টানা চার জয়ে স্বাগতিকরা এখন সেমিফাইনালে। হ্যাটট্রিক শিরোপা থেকে আর দুটি জয় দূরে দাঁড়িয়ে দেশ রূপান্তরের সুদীপ্ত আনন্দের কাছে কাবাডি নিয়ে নিজের ভাবনাগুলো তুলে ধরেছেন বাংলাদেশ অধিনায়ক

আসরের প্রথম দল হিসেবে সেমিফাইনালে নাম লেখানোয় আপনি ও আপনার দলকে অভিনন্দন। টানা চার ম্যাচ জিতলেন। তার চেয়েও বড়, প্রতি ম্যাচেই আপনাদের খেলায় উন্নতির ছোঁয়া দেখা যাচ্ছে...

তুহিন তরফদার : আপনাকেও ধন্যবাদ। এই আসরে আমরা প্রথম দুইবারের চ্যাম্পিয়ন। ঘরের মাঠে এবার হ্যাটট্রিক শিরোপার হাতছানি। তাই শুরু থেকেই আমরা একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে খেলছি। চোটের কারণে আমাদের ছয় থেকে সাতজন অভিজ্ঞ খেলোয়াড় এবার খেলতে পারছে না। গত আসরে শিরোপা জিততে যাদের বড় ভূমিকা ছিল। তবে তরুণ যারা এসেছে, তারা পুরনোদের অভাব এখন পর্যন্ত বুঝতে দিচ্ছে না, এটা সবচেয়ে ইতিবাচক ব্যাপার। যদিও আজ (গতকাল) ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আমাদের দুজন মাথায় আঘাত পেয়েছে; যা একটু ভাবাচ্ছে। আশা করছি তারা দ্রুতই সুস্থ হয়ে ফিরবে।

এ বছর এশিয়ান গেমস আছে। তাই এবারের আসরটা নিশ্চয় আপনাদের কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ?

তুহিন তরফদার : ২০০৬ সালের পর থেকে এশিয়ান গেমসে আমরা আর পদক জিততে পারিনি। আট বছরের ক্যারিয়ারে আমি একবারই এশিয়ান গেমস খেলেছি। তবে ফিরতে হয়েছে শূন্য হাতে। অথচ এশিয়ান গেমসে সবচেয়ে বেশি পদক কিন্তু কাবাডির হাত ধরেই এসেছে। ফেডারেশন আমাদের বছরের শুরুতেই আশ্বাস দিয়েছে, এশিয়ান গেমসে পদক জয়ের জন্য যা যা দরকার তার সবকিছুই করবে। বঙ্গবন্ধু কাপে ১২টি দল অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে এশিয়ার দল অনেকগুলো। তাই এই আসর অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তবে এখানেই থেমে গেলে চলবে না। আমাদের এশিয়ান গেমসের আগে নিরবচ্ছিন্ন ট্রেনিং করতে হবে এবং প্রচুর ম্যাচ খেলতে হবে। শুনছি রমজান মাসের পর আমাদের ভারতে পাঠানো হবে। সেখানে প্রশিক্ষণ নিতে পারলে এবং প্রস্তুতিমূলক ম্যাচ খেলতে পারলে, এশিয়ান গেমসে পদক জেতা সম্ভব। মোটা দাগে বললে, পদক জিততে হাঁটতে হবে সঠিক পথে

বঙ্গবন্ধু কাপের সেরা দুটি এশিয়ান দলের তো বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ আছে...

তুহিন তরফদার : ২০১৬ সালের পর আর বিশ্বকাপ হয়নি। এবার আমাদের সামনে সুবর্ণ সুযোগ, সেখানে খেলার। ফাইনালে উঠলেই আমরা বিশ্বকাপ চলে যাব। বিশ্বকাপের মতো আসরে খেলতে পারলে নিজেদের মান সম্পর্কে পুরোপুরি ধারণা পাওয়া যাবে।

একটা সময় বিশ্ব কাবাডিতে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল দ্বিতীয় স্থানে। এখন অনেকগুলো দেশ বাংলাদেশকে পিছিয়ে ফেলেছে। কেন এমনটা হলো?

তুহিন তরফদার : আমাদের পিছিয়ে পড়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বর্তমান কমিটি, বিশেষ করে সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান স্যার দায়িত্ব নেওয়ার আগে যারা কমিটিতে ছিলেন, তারা খেলাটা সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারেননি। ফলে একটা বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এখন কাবাডি যেভাবে হচ্ছে, এটা যদি দশ বছর আগে থেকে হতো, আমরাও আগের অবস্থানে থাকতাম। ভারত প্রো-কাবাডি আয়োজন করছে নিয়মিত। সেখানে ইরান ও কোরিয়ার ছয় থেকে সাতজন করে খেলোয়াড় নিয়মিত খেলছে। আমাদের দেশের বড়জোর এক থেকে দুজন সুযোগ পায়। আসলে জাতীয় দলের বেশির ভাগ খেলোয়াড় বিভিন্ন বাহিনীতে চাকরি করে। অনুমতি মেলে না বলে ভারতের প্রো-কাবাডিতে খেলার সুযোগ পায় না তারা। একমাত্র যারা পুলিশে খেলে, কেবল তারা সেখানে সুযোগ পায়। যদি এই বাধাটা না থাকত বাংলাদেশ থেকেও ৮ থেকে ১০ জন প্রো-কাবাডিতে খেলতে পারত। এতে করে খেলোয়াড়রা যেমন আর্থিকভাবে লাভবান হতো, বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের সঙ্গে নিয়মিত খেলে অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারত। এই তো কিছুদিন আগেও কোরিয়া ছিল আমাদের চেয়ে দুর্বল। তারা ভারতে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ নিয়ে, ভালোমানের কোচের অধীনে খেলে, প্রচুর প্রস্তুতি ম্যাচ খেলে আমাদের পেছনে ফেলেছে। ইরানের ব্যাপারটাও তাই। তারা এতটাই উন্নতি করেছে, গত এশিয়ান গেমসে ভারতকে হারিয়ে স্বর্ণপদক জিতেছে।

আপনারা অনেক দলের চেয়ে শারীরিক দিক থেকে পিছিয়ে। অথচ নিমেষেই তাদের হারিয়ে দিচ্ছেন। এতেই বোঝা যায় কাবাডিটা আমাদের রক্তে। তারপরও বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্য পায় না। এটা নিশ্চয় ভোগায়?

তুহিন তরফদার : বিশ্বের যে কটি দেশ কাবাডি খেলে, তাদের কোনোটারই জাতীয় খেলা কাবাডি নয়। আমাদের জাতীয় খেলা কাবাডি। তাই বিশ্বে আমাদের অবস্থান থাকা উচিত ওপরের সারিতে। সেটা যখন হচ্ছে না, তখন তো কষ্ট পাই। কেন হচ্ছে না, গভীরে প্রবেশ করে সেই কারণটা বের করে আনা উচিত।

আপনার কী মনে হয়, কেন পারছে না বাংলাদেশ?

তুহিন তরফদার : সঠিক পরিকল্পনা না থাকলে আমরা সেরার কাতারে যেতে পারব না। এই টুর্নামেন্টটা আমরা খেলার পর যদি বসে থাকি, সঠিকভাবে প্রস্তুতি না নিই, তবে এশিয়ান গেমসে পদক জেতা অসম্ভব। বর্তমান কমিটি দায়িত্ব নিয়ে উপজেলা, জেলা পর্যায়ে বয়সভিত্তিক কাবাডি আয়োজন করছে। তাদের চেষ্টায় কোনো গলদ নেই। তবে তৃণমূলে বয়সের বাধ্যবাধকতা কেউ মানে না। অনূর্ধ্ব-১৯ টুর্নামেন্টে ৩৫-৪০ বছর বয়সীরা খেলছে দিব্যি। তৃণমূলে যদি খেলাটা ভালোভাবে না হয় এবং সেখান থেকে প্রতিভা তুলে এনে যদি সারা বছর প্রশিক্ষণ ও প্রচুর খেলার ব্যবস্থা না করা যায়, তবে এই খেলার উন্নতি কখনোই হবে না। কাবাডি খেলোয়াড়দের নিজেদের ফিট রাখতে প্রচুর পরিশ্রম যেমন করতে হয়, তেমনি তাদের উন্নতমানের খাওয়াদাওয়া নিয়ম মেনে করতে হয়। আমরা সেটাই তো ঠিকঠাক পাই না। খেলোয়াড়দের প্রস্তুত রাখতে যা যা করা উচিত, তার কিছুই করে না ফেডারেশন। আমরা নিজ নিজ বাহিনীতে চাকরি করি বলে সেখান থেকে সব ধরনের সমর্থন পাই। জাতীয় দলে খেলে আমাদের প্রাপ্তি কী, সেটা না শোনাই ভালো।

বর্তমান কমিটি তো অনেক খেলার সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে আপনাদের?

তুহিন তরফদার : তার জন্য বর্তমান কমিটি, বিশেষ করে সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান স্যারের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। তার কারণেই আমরা বছরব্যপী অনেক ঘরোয়া আসরে খেলতে পারছি। তবে কেবল ঘরে খেললে তো চলবে না। নিজেদের যাচাই করতে হলে, ভেতরের ভয়টা তাড়াতে হলে আমাদের দেশের বাইরে প্রচুর ম্যাচ খেলতে হবে। প্রয়োজনে অনেক বেশি বেশি দ্বিপক্ষীয় সিরিজ খেলতে হবে।

এশিয়ান গেমসের মতো এসএ গেমসেও তো গতবার ফিরতে হয়েছে শূন্য হাতে?

তুহিন তরফদার : ২০১৯ এসএ গেমসে আমার খেলা হয়নি। তারপরও বলছি, সেটা আমাদের জন্য অনেক বড় ধাক্কা। এসএ গেমসে পদক জিততে না পারাটা অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। তবে মনে রাখতে হবে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল এখন নিয়মিত কাবাডি খেলছে। সবকিছুই আসলে নির্ভর করে আপনি নিজেকে কীভাবে এবং কতটা প্রস্তুত করে এসব আসরে খেলতে যাচ্ছেন।

কাবাডিতে কি বাংলাদেশ তবে আগের অবস্থানে আর কখনোই ফিরতে পারবে না?

তুহিন তরফদার : দেখুন, খেলাটা আমাদের রক্তে। তাই এখানে আমাদের ভালো করার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। ভারত, পাকিস্তানের মতো এখানে যদি প্রো-কাবাডির আয়োজন করা হয়, তৃণমূলে ঠিকঠাক খেলা হয় ও প্রতিভা তুলে এনে যদি দীর্ঘমেয়াদে পরিচর্যা করা যায়, তবে আমরাও হারানো জায়গায় ফিরতে পারব।