নতুন শিক্ষাক্রমের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা ২০২১ একটি সম্ভাবনাময়, যুগোপযোগী ও কার্যকরী পদক্ষেপ। জ্ঞান ও দক্ষতার পাশাপাশি প্রযুক্তির উৎকর্ষের কারণে প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে জীবন ও জীবিকা। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব পর্যায়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশ কর্মসংস্থান এবং জীবনযাপন প্রণালিতে পরিবর্তন নিয়ে আসছে। এতে একদিকে যেমন প্রচলিত কর্মসংস্থান কমে যাচ্ছে, তেমনি নতুন নতুন কাজের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। অদূর ভবিষ্যতে এমন অনেক নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হবে যা আমাদের জানা নেই।

পৃথিবী জুড়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটলেও এখনো রয়ে গেছে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অশিক্ষার মতো মৌলিক সমস্যাবলি। যে কারণে জলবায়ু পরিবর্তন, বায়ুদূষণ এবং জাতিগত সহিংসতার মতো সমস্যা আজ প্রকট হয়ে দেখা দিচ্ছে। প্রাত্যহিক জীবনযাত্রায় সংযোজিত হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাবনা।

পরিবর্তনশীল বিশ্বে প্রাত্যহিক জীবনযাত্রায় সংযোজিত বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে তার টেকসই ও কার্যকর সমাধান এবং জনমিতিক সুফলকে সম্পদে রূপান্তর করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশে পদার্পণ করছে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পদার্পণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য মানসম্মত শিক্ষার বিকল্প নেই। এই লক্ষ্যে জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা ২০২১ প্রণীত হয়। এর আলোকে জাতীয় শিক্ষাক্রম বিস্তরণ ২০২২ এবং ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির শিখন সামগ্রী প্রণয়ন করা হয়। যেখানে পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অন্যান্য শিখন সামগ্রী ব্যবহার করে কীভাবে শ্রেণি কার্যক্রমকে যৌক্তিকভাবে আরও বেশি আনন্দময় এবং শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক করা যায় তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখনকে।

আগের শিক্ষাক্রমের পদ্ধতি ছিল জ্ঞাননির্ভর আর বর্তমান কারিকুলামটি হলো যোগ্যতানির্ভর। এই উন্নয়নকৃত যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রমের আলোকে প্রণীত পাঠ্যপুস্তক ব্যবহার করে ২০২৩ সাল থেকেই দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির শিখন-শেখানো কার্যক্রম শুরু হয়েছে। শিক্ষাক্রমের সফল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন শিক্ষাক্রমের সফল বিস্তরণ, এই লক্ষ্যে দেশের মাধ্যমিক পর্যায়ের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকরা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে তাদের পেশাগত জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধি করেন এবং বর্তমানে শ্রেণিকক্ষে তার বাস্তবায়নে সচেষ্ট।

বর্তমান কারিকুলামে পাঠদান হলো শিক্ষক সহায়ক ভূমিকা পালন করবেন এবং শিক্ষার্থীরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে শিখবে। এক্ষেত্রে শিক্ষক একটি শ্রেণিকক্ষের মোট শিক্ষার্থীদের ৫-৭ সদস্যবিশিষ্ট কিছু দলে ভাগ করে দেবেন এবং পাঠদানকৃত বিষয়টি উপস্থাপন করবেন। শিক্ষার্থীরা তখন দলে দলে নিজেদের মধ্যে বিষয়টি আলোচনা করবে এবং একজন আরেকজনের সঙ্গে তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেবে। এক্ষেত্রে তারা নিজেদের দলের বাইরে অন্য দলের সঙ্গেও তাদের অভিজ্ঞতা ও মতামত ভাগ করে নেবে। এর ফলে শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক ও আনন্দময় পড়াশোনার পরিবেশ সৃষ্টি হবে।

এই পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা যখন দলগতভাবে হাতে-কলমে শিখবে তখন তাদের মধ্যে নৈতিকতাবোধ অর্জিত হবে। তাদের মধ্যে একে অপরকে সহযোগিতার মনোভাব তৈরি হবে। সব শিক্ষার্থী একটি নির্দিষ্ট ধারায় এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে।

পরীক্ষা না থাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে মুখস্থনির্ভরতা কমে যাবে বলে আমার বিশ্বাস। তবে অভিজ্ঞতা ও কার্যভিত্তিক শিখনের মাধ্যমে কোনো বিষয় সম্পর্কে তাদের জ্ঞান ও যোগ্যতা অর্জিত হবে দ্রুত। এবং এভাবেই শিক্ষার্থীদের গভীর শিখন বা উববঢ় ষবধৎহরহম হবে।

এই পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা নিজেদের একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে বন্ধু হবে। তাদের মধ্যে সবাই মিলে একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা থাকবে। দলগতভাবে কাজ করার মাধ্যমে তাদের মধ্যে নেতৃত্ববোধ বিকশিত হবে। এবং পাঠ্যপুস্তকগুলো কার্যক্রমভিত্তিক হওয়ার কারণে সবার মধ্যে বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকার প্রবণতা তৈরি হবে।

শ্রেণিকার্যক্রমকে শুধু শ্রেণিকক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে শ্রেণিকক্ষের বাইরেও নিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে, যার মাধ্যমে তারা বাস্তব পরিবেশের মধ্যে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই তাদের শিখন কার্যক্রম শেষ করতে পারবে। বাসায় তাদের হোম ওয়ার্কের চাপ থাকবে না।

এক্ষেত্রে শিক্ষার্থী শুধু তার শিক্ষক বা সহপাঠীই নয়, তাদের অভিভাবকদের সঙ্গেও আলোচনার মাধ্যমে তাদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা অর্জন করতে পারে।

প্রণীত এ শিক্ষাক্রম যোগ্যতাভিত্তিক, যেখানে জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়ে যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে। এবং এতে যে পাঠ্যপুস্তকগুলো তৈরি করা হয়েছে তা বেশ তথ্যবহুল, যা শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে সাহায্য করে।

এই নতুন কারিকুলামে শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক উভয়ই তাদের শিক্ষা, জ্ঞান অর্জন ও মূল্যায়ন নিয়ে সন্দিহান যে, কীভাবে তার মূল্যায়ন হবে বা ফলাফল হবে? এই পদ্ধতিতে মূল্যায়ন কোনো পরীক্ষার মাধ্যমে না হলেও শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন হবে প্রতিদিন।

শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন হবে তিনভাবে।

শিখনকালীন মূল্যায়ন : যা শিক্ষার্থীর শ্রেণিকক্ষে পাঠদানকালে প্রতিটি ক্লাসের কাজে অংশগ্রহণের মাধ্যমে করা হবে। এতে শিক্ষার্থী কতটা সক্রিয় অংশগ্রহণ করে তা দেখা হবে।

সামষ্টিক মূল্যায়ন : একটি নির্দিষ্ট সময় শেষে শিক্ষার্থীর যোগ্যতা কতটুকু অর্জিত হয়েছে তা চিত্রিত করা। এই মূল্যায়ন শিক্ষাব্যবস্থার মাঝামাঝি সময়ে ও শেষে এই দুইবার করা হবে।

আচরণিক মূল্যায়ন : এছাড়া আচরণিক বিষয়ের মাধ্যমেও শিক্ষার্থীকে মূল্যায়ন করা হবে। শ্রেণিকক্ষের ভেতরে, বাইরে, নিজ বাসার পরিবেশে, শিক্ষক, সহপাঠী সবার সঙ্গে শিক্ষার্থীর আচরণের মাধ্যমে এই মূল্যায়ন করা হবে।

নতুন এই কারিকুলামের মাধ্যমে আমাদের শিশুরা পরীক্ষার্থীর পরিবর্তে সত্যিকার শিক্ষার্থী হয়ে উঠবে। আশা করা যায় শিক্ষার্থীরা এ শিখন অভিজ্ঞতার মাধ্যমে কাক্সিক্ষত যোগ্যতা অর্জনে সমর্থ হবে। যেখানে মূল্যায়নের ভিত্তি হবে যোগ্যতা অর্জন। তাই রূপরেখার আলোকে প্রণীত শিক্ষাক্রমের সফল বাস্তবায়নে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে এবং একযোগে সক্রিয় হতে হবে।

এভাবেই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত দেশপ্রেমিক, উৎপাদনমুখী, অভিযোজনে সক্ষম সুখী ও বৈশ্বিক নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে বলে আমি আশা রাখি।

নাজমুন নাহার

প্রভাষক

মনোবিজ্ঞান বিভাগ

বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজ

পিলখানা, ঢাকা