সাত দশকেও হয়নি পূর্ণাঙ্গ

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিদ্যাপিঠ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি)। তবে ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর প্রায় সাত দশক পেরিয়ে গেলেও এখনো পূর্ণাঙ্গ হয়নি ছাত্র-শিক্ষক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র (টিএসসিসি)। ১৯৮৪ সাল থেকে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো পূর্ণাঙ্গ টিএসসিসির দাবি জানিয়ে এলেও কোনো উপাচার্যের সময়ই তা আমলে নেওয়া হয়নি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বেচ্ছাসেবী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো যেমন এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে, তেমনি ব্যাহত হচ্ছে সাংস্কৃতিক চর্চা।

বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের তৎকালীন অধ্যাপক সুখরঞ্জন সমাদ্দারের নামে যে টিএসসিসি ভবন রয়েছে সেটিও নানান সমস্যায় জর্জরিত। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এই টিএসসিসিতে আসনসংখ্যা খুবই সীমিত এবং অ্যাকুস্টিক সিস্টেম কাজ করে না। এ ছাড়াও না আছে ফ্যান, না এসি এবং ক্ষুদ্র মহড়া কক্ষসহ রয়েছে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার অভাব। সাংস্কৃতিক চর্চার সঙ্গে যুক্ত শিক্ষকরা বলছেন, ছাত্র-শিক্ষকের পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে যেখানে প্রকৃত শিক্ষা পাওয়া যাবে সেটিই হলো টিএসসিসি। কিন্তু সাত দশকেও তা পূর্ণাঙ্গ হয়নি। এ সময়কালে যারা প্রশাসনিক দায়িত্বে এসেছেন তাদের সবারই প্রথম এজেন্ডা ছিল টিএসসিসির উন্নয়ন। কিন্তু কিছুদিন পর সেই প্রতিশ্রুতি ভুলে যান সবাই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্রামা অ্যাসোসিয়েশনের (রুডা) সভাপতি মনির হোসাইন বলেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যে টিএসসিসি আছে তার জায়গা খুব কম। ছোট একটা ভবন। বর্তমানে আমাদের সংগঠনসহ আরও কিছু সংগঠন আছে রাকসু ভবনে। যদি রাকসু নির্বাচন হয় তাহলে খুব স্বাভাবিকভাবে আমাদের বের হতে হবে। তখন আমরা কোথায় যাব?’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে টিএসসিসিভুক্ত সংগঠনগুলোর মধ্যে কেন্দ্রীয় সংস্কৃতিক জোট প্রাচীনতম সংগঠন। এ জোটের সভাপতি ড. অমিত কুমার দত্ত বলেন, ‘বর্তমান যে ভবন আছে সেটা কোনোভাবে টিএসসিসি ভবন হওয়ার উপযুক্ত নয়। যে অডিটরিয়াম আছে সেটাও অনুষ্ঠান করার জন্য একেবারে অনুপযুক্ত। যেকোনো সময় ভেঙে যেতে পারে। তৈরি করার সময় দুবার ভেঙে পড়েছে। যে কারণে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো সেটাকে পুরোপুরি বয়কট করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ মাসের শেষের দিকে আমরা প্রশাসনের সঙ্গে দাবিগুলো নিয়ে আলোচনা করব। দাবি পূরণ না হলে সরাসরি কর্মসূচিতে যাব। প্রথম দাবি থাকবে পূর্ণাঙ্গ টিএসসিসি বাস্তবায়ন।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের অধ্যাপক আতাউর রহমান বলেন, ‘কোনো বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৃত অর্থে বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠতে গেলে টিএসসিসি অনিবার্য। এটি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই সেটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় নয়। এদিক থেকে রাবি খণ্ডিত বিশ্ববিদ্যালয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘দীর্ঘ সাত দশকে এ নিয়ে এক ধরনের সাংস্কৃতিক রাজনীতি হয়েছে। বিভিন্ন সময় যে প্রশাসন আসুক তারা উদ্যোগ নেয়, কিন্তু সেগুলোর মধ্যে রাজনীতি থাকে। যেকোনো প্রশাসনের প্রথম এজেন্ডা থাকে টিএসসিসি নিয়ে। তারপর আর বাস্তবায়নের কোনো ব্যবস্থা নেয় না।’

প্রায় একই ধরনের মতো দিয়ে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাওয়া নাট্যকার, নির্দেশক ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মলয় ভৌমিক বলেন, ‘আমাদের এখানে টিএসসিসি নামে যে ভবনটি তা লোক দেখানো ফাজলামো। এটা দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে ১৯৮৪ সাল থেকে লাগাতার টিএসসিসির জন্য আন্দোলন হচ্ছে। কিন্তু ফলাফল শূন্য।’ এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রাবির উপ-উপাচার্য সুলতান-উল-ইসলাম বলেন, ‘যেকোনো কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হওয়ার জন্য সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। রাতারাতি কিছু করা সম্ভব নয়। কোনোকালে যদি টিএসসিসি পূর্ণাঙ্গ না হয় তবে কি সাংস্কৃতিক সংগঠন সামনে এগিয়ে যাবে না? আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে, বুদ্ধি দিতে হবে। আমরা সে জায়গাটা নিশ্চিত করতে চাচ্ছি। যেকোনো প্রকারে হোক আমরা যেন এক জায়গায় বসতে পারি।’